অসৎ পন্থা নিরসন: সুপরিকল্পিত তদারকি ব্যবস্থা আবশ্যক
ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী । মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:০০
যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-সংঘাত পুরো বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ানের যুদ্ধংদেহি মনোভাব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো জোটের দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নানামুখী তৎপরতায় বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হচ্ছে। বিগত দুই বছরের বেশি সময়ব্যাপী করোনা অতিমারিতে বীভৎস মৃত্যুর মিছিল, অর্থনৈতিক মন্দা দৃশ্যত অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব প্রচণ্ড টালমাটাল। জ্বালানি তেল-গ্যাস-খাদ্যশস্য-নিত্যপণ্যের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকার উদ্ভূত সংকট উত্তরণে বিভিন্ন প্রায়োগিক পরিকল্পনা-উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশে বৃহত্তর জনস্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে।
সামগ্রিক বিষয়ের যথার্থ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী মেধা-প্রজ্ঞার অভাব দৃশ্যমান। ফলে জনমনে বিভ্রান্তির বেড়াজালে দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিতে দেশবিরোধী শক্তির হীন চক্রান্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দুঃসময়ে জনগণকে জিম্মি করে ঘোলাটে রাজনীতির ঘৃণ্য অপকৌশল কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সচেতন জনগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ থাকলেও বহুলাংশে দরিদ্র-নিুবিত্ত-কম শিক্ষিত-অসচেতন নিরীহ জনগণকে উসকে দিয়ে কোনো ধরনের অপতৎপরতা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। যথাসময়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা-গণসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আরেকটু সহনীয়ভাবে করা গেলে ভোক্তা, উৎপাদক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করাটা সহজ হতো। অতিসম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক জনদুর্ভোগ আমলে নিয়ে সত্যের কাঠিন্যে দেশীয় বাজারে এর বৈরী প্রভাব থেকে পরিত্রাণ অপরিহার্য। অন্যথায় বিজ্ঞজনের মতে, অপাঙ্ক্তেয় নষ্ট চরিত্রের অর্থলিপ্সু অনৈতিক মানুষরূপী দানবগুলো অরাজকতা বিস্তারের আড়ালে জনগণের দুর্ভোগকে অধিকতর বাড়িয়ে দিতে পারে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলোয়ও। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিতে পড়া অনেক ধনী-উন্নত দেশেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাখা হয়েছে জরিমানার বিধান। জাপানে বিদ্যুতের চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশাল অঙ্কের টাকা পরিশোধে দেশটিকে বিপাকে পড়তে হয়েছে।
জাপান সরকার জনগণের প্রতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে একাধিক ঘরে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করাসহ নানা আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া গ্যাসের রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে নিপতিত। সংকট মোকাবিলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র আবার সচল করাসহ বার্লিনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বহুবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সেও গ্যাস ও জ্বালানি সংকট তীব্র হচ্ছে। আগামী শীত মৌসুমে বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেদেশের সরকার। তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ফ্রান্সজুড়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত দোকানগুলোকে দরজা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ অমান্যকারীকে দিতে হবে ৭৫ ইউরো জরিমানা। স্পেনে জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসাবে সরকারি কর্মচারীদের এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার না করে যতটা সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করা এবং অফিসে এসি চালালে তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রির বেশি রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আর্দ্রতার পরিপ্রেক্ষিতে তা ৫৪ ডিগ্রির মতো অনুভূত হয়। অস্ট্রেলিয়ার সরকার সিডনি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের বাসিন্দাদের দিনে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার আহ্বান জানান। এছাড়া ইতালি, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কঠিন সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার সূত্রমতে, সম্প্রতি চীনে ৮০টির বেশি শহরে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সতর্কতা জারি করা হয়। ফলে উৎপাদন কারখানাসহ বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরিতে লোড রেশনিং করা হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে এবং কিছু পরিবার ব্ল্যাক আউটের সম্মুখীন হয়েছে।
দেশে বর্তমানে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসাবে বিদ্যুতের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞরা যথার্থ অর্থে যৌক্তিক বলে অবহিত করেছেন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের বিকল্প অন্য কোনো পন্থা আছে বলে তাদের মনে হয় না। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রেখে রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতা বজায় রাখার পরামর্শ এবং শিল্প-কারখানা লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখার মতামত ব্যক্ত করেছেন। আলোচনা-সমালোচনা-গুজব-বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ-সচেতন মহলের আহ্বান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহত্তর জনস্বার্থে সাময়িক দুর্ভোগ জনগণ সহনীয় মনে করলেও স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি-দল-প্রতিষ্ঠান সাশ্রয়ের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর অরাজক পরিস্থিতি পরিহারে দ্রুততার সঙ্গে গণপরিবহণের ভাড়া সমন্বয় প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তেল মজুত, জোরপূর্বক নির্ধারিত ভাড়ার অধিক ভাড়া আদায়, পণ্যবহনে অযাচিত চাঁদাবাজিতে যেন সুযোগসন্ধানীরা তৎপর হতে না পারে, সেজন্য সুপরিকল্পিত তদারকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। দুর্বিষহ জনজীবনকে কঠিনতর করার যে কোনো ধরনের অসৎ পন্থাকে নস্যাৎ করে দেশের মানুষের আস্থা অর্জনে সরকারের আন্তরিকতা দৃশ্যমান হওয়া সময়ের দাবি।
লেখক: সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী
ইউডি/সুস্মিত

