বিশ্ব মঞ্চে অনুকরণীয় সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পদ্মাসেতু
মোতাহার হোসেন । বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ০৯:৪০
পদ্মা সেতু। এশিয়ার ১১তম এবং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সেতু। প্রমত্ত পদ্মার দুই কূল এক করে দিয়েছে বহুল প্রত্যাশিত এই সেতু। নকশা প্রণয়ন, নদীশাসন থেকে শুরু করে এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনা, সব ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এ কারণেই সেতুটি হয়ে উঠেছে নান্দনিক ও টেকসই। অন্যদিকে এমন খরস্রোতা নদীতে এ ধরনের সেতু নির্মাণ বিশ্বের কাছেও রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ এই সেতু নির্মাণে পাঁচটি বিশ্ব রের্কড গড়েছে। যা ইতোপূর্বে কোনো সেতুতে ব্যবহার করা হয়নি। এ ধরনের খবর বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রকাশিত হয়েছে। মূলত প্রমত্ত পদ্মার বুকে অত্যাধুনিক সেতু গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৩ ধরনের প্রযুক্তি। স্মার্ট সেন্সর, স্যাটেলাইট, জিপিএস, পেন্ডুলাম বিয়ারিংসহ সেতু নির্মাণে প্রতিটি পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে নানা প্রযুক্তি ও ডিভাইস। ২৫ জুন উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতুর টোল আদায়েও ব্যবহৃত হয়েছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। মূল অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তায় পদ্মা সেতুতে রয়েছে অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা।
প্রচলিত ব্রিজে কোথাও ফাটল কিংবা অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা তা ম্যানুয়ালি পর্যবেক্ষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণে এ রকম কিছু ধরা পড়লে তা ঠিকঠাক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পদ্মাসেতুকে বলা হচ্ছে, স্মার্ট সেতু। কেননা সেতুটির বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে স্মার্ট সেন্সরভিত্তিক গেজেট। এ সেন্সরগুলো সার্বক্ষণিক সেতুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। একে বলা হচ্ছে, সেতুর ‘হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’। কোনো কারণে সেতুর কোনো অংশে ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক জানিয়ে দেবে এ সেন্সর। সেতু রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরতদের কম্পিউটার সিস্টেমে ভেসে উঠবে তাৎক্ষণিক সর্তক বার্তা। আর এটি দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন প্রকৌশলীরা। বিশেষ করে ভূমিকম্প কিংবা এ ধরনের বড় কোনো দুর্যোগে সেতুর স্টিলের ট্রাস বেঁকে যেতে পারে, ভেতরে ভেঙে যেতে পারে, সাব-স্ট্রাকচার কিংবা সুপার স্ট্রাকচারের ক্ষতি হতে পারে, পিয়ারের ক্ষতি হতে পারে, বিয়ারিংয়ের ক্ষতি হতে পারে, ট্রাসের ক্ষতি হতে পারে, ডেকের ক্ষতি হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এসব ছোট সমস্যা থেকে বড় সমস্যা হওয়ার শঙ্কা থাকলেও সেটি জানিয়ে দেবে এ সেন্সর। এতে ক্ষতি এড়াতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সেতুর এ স্মার্ট ফিচারটি সেতু রক্ষণাবেক্ষণে তাৎক্ষণিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় এ ফিচার সেতুর জীবনকাল নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দেবে।
ভূমিকম্প প্রতিরোধে পদ্মাসেতুতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেন্ডুলার বিয়ারিং (এফপিবি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। স্টিল সুপার স্ট্রাকচার ও কংক্রিটের ফাউন্ডেশনের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের কাজটি করেছে এই ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং। এই বিয়ারিং থাকার ফলে নদীর তলদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পন হলেও এর পুরো মাত্রা সেতুর স্টিলের সুপার স্ট্রাকচারে যাবে না। ফলে ব্রিজটি বর্ধিত মাত্রার ভূমিকম্পও সহ্য করতে পারবে। সেতু কর্তৃপক্ষ বলেছে, পদ্মা সেতুটি নয় মাত্রার ভূমিকম্প হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর ভূমিকম্প প্রতিরোধে অন্যতম ভূমিকা রাখবে এই দোদুল্যমান বিয়ারিং। সাধারণত প্রচলিত কংক্রিটের ব্রিজ জীবনকাল শেষ হয়ে গেলে একে পুনর্ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু পদ্মাসেতু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি স্টিলের ট্রাস ব্রিজ। তবে সড়কে এবং রেলপথেও আছে কংক্রিটের ব্যবহার। ফলে একে বলা হচ্ছে, কম্পোজিট ব্রিজ। এটি শতভাগ ওয়েল্ডেড (ঝালাই করা)। স্টিলের ব্রিজের বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি কংক্রিটের চেয়ে অনেক হালকা ব্রিজ। জীবনকাল শেষ হলে একে পুনর্ব্যবহার করা যাবে এবং এটি পরিবেশবান্ধব।
পদ্মাসেতুর মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত কম খরচে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাবে। কুয়াকাটায় অবস্থিত ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে পদ্মাসেতু হওয়ায় বিকল্প সংযোগ স্থাপন সহজ হবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে পদ্মাসেতুর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ কানেক্টিভিটির দূরত্বও কমে যাবে। এর ফলে ইন্টারনেটের গতি বাড়বে। পাশাপাশি গুগলের ম্যাপিং অ্যাপ্লিকেশন গুগল ম্যাপেও দেখা যাচ্ছে পদ্মাসেতু। পদ্মাসেতু সংলগ্ন রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা চলে এসেছে গুগল ম্যাপে। স্যাটেলাইট ভিউতেও দেখা যাচ্ছে সেতুটি। ফলে সেতুর রুট ম্যাপ, সেতুর ওপর যানবাহনের অবস্থা জানা যাবে।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

