চালের বাজারের অস্থিরতা বন্ধে সব উদ্যোগই ব্যর্থ
নাজমুল কবির । বুধবার, ১৭ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:৩০
চালের কষ্ট আর দূর হলো না দেশের ভোক্তার। গত তিন বছর ধরে প্রধান এ খাদ্যপণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় কষ্টের শেষ নেই মানুষের। চালের দাম কমাতে আমদানির অনুমতি দেওয়া, শুল্ক কমানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। তবে সব উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়ে চালের মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়া ছুটেই চলেছে। কিছু দিন স্থিতিশীল থাকার পর এ সপ্তাহে আবার নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার।
চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৫২ থকে ৫৫ টাকায়। আর মাঝারি মানের মোটা পাইজাম কিংবা স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগের দিনও এ দুই ধরনের চাল বিক্রি হয়েছে ৪৬ টাকা ও ৫২ টাকা কেজিতে। বিআর ২৮ ও ২৯ জাতীয় চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৬৫ টাকা কেজিতে। মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮০ এবং নাজিরশাইল ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ১০ দিন আগেও বিআর ২৮ জাতীয় চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মিনিকেট চাল বিক্রি হয়েছিল ৬৮ থেকে ৭২ এবং নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এসব চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১৫ টাকা করে। এ ছাড়া সব ধরনের পোলাও চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা।
বিক্রেতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে চাল উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি যাতায়াত ভাড়া বেড়েছে। মিলাররা চালের দাম বাড়িয়েছে। তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা মনে করি, চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এটা অতি মুনাফাখোর ও লোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি। তারা একেক সময় একেক অজুহাত তুলে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তারা কখনোই ক্রেতাদের স্বার্থ বিবেচনা করে না। বিক্রেতাদের অভিমত ‘আমরা বেশি মূল্য দিয়ে কিনলে কম মূল্যে বিক্রি করব কীভাবে?’ বেশি মূল্য দিয়ে কিনেছে নাকি কম মূল্য দিয়ে তাদের এই বক্তব্য কি প্রমাণ সাপেক্ষ। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে ভাতপ্রধান বাঙালি যদি তাদের চাহিদামতো চাল কিনতে না পারে তবে, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী হতে পারে। বিশেষ করে মোটা চালের দামবৃদ্ধি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ দেশের স্বল্প আয়ের মানুষ মোটা চালনির্ভর। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে এ দেশে তেলের দাম বেড়ে গেলে সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। সুতরাং যে করেই হোক চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
আসলে পণ্যের সরবরাহ বা সংকটের সঙ্গে দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা হচ্ছে অসৎ ব্যবসায়ীদের হীনমানসিকতা। অতীতেও আমরা লক্ষ্য করেছি, তারা একেক সময় একেক পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের পকেট কেটেছে। তেল চালের দাম তো নানা অজুহাতে কয়েক দফা বাড়ল। এটা তাদের ব্যবসায়িক অসুস্থ সংস্কৃতি। এটা হচ্ছে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি। এরা জনগণের স্বার্থের দিকে নজর দেয় না। এরা বাজার সন্ত্রাসী। কীভাবে অসৎ উপায় অবলম্বন করে দ্রম্নত ধনী হবে এটাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে তাদের কাছে দেশের অসহায় জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারও তাদের কাছে জিম্মি। বাজার নিয়ে অতীতে অনেক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, কোনো কাজ হয়নি। বিক্রেতাদের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। বিক্রেতাদের মানসিকতার পরিবর্তন যতদিন না ঘটবে ততদিন চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির থাকবেই এবং দেশের জনগণও তাদের কাছে জিম্মি থাকবে।
দেশের বাজারে বাড়তে থাকা চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি উদ্যোগ কাজে আসছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিদফতরের অভিযান, আমদানির অনুমতি, শুল্ক হ্রাসসহ সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন চালের বাজার। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের আমদানিতে আগ্রহ কম। দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এরই মধ্যে ভারত থেকে ১২ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে চালের দাম না কমে উল্টো বাড়তে শুরু করেছে।
লেখক: সমাজ গবেষক।
ইউডি/সুস্মিত

