এক বছরে ২২ হাজার মানুষের মৃত্যু: ঢাকার বায়ু দূষণ কমবে কবে?
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:১০
বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত বাতাসের শীর্ষ পাঁচ শহরের তালিকায় উঠে এসেছে ঢাকা। আমেরিকা-ভিত্তিক দু’টি সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন এমন তথ্য জানায়। গবেষণা বলছে শুধু ২০১৯ সালেই ঢাকায় বায়ুদূষণের কারণে ২২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৭ আগস্ট) ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদ এফ রহমান
বায়ু দূষণ যেন বাংলাদেশ তথা রাজধানী ঢাকার এক নিত্যসঙ্গী। গত বেশ ক’বছর ধরে উন্নয়নমূলক কাজের কারনে এর ব্যপ্তি বেড়েছে বহুগুণে। তবে, করোনাকালীন সময়ে রাজধানীর বাতাস লকডাউনে কোলাহলমুক্ত পরিবেশে ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছিল। করোনা পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকা যখন তার চেনা পরিবেশ ফিরে পায় তখন থেকে বায়ু দূষণ আগের অবস্থায়ই ফিরে যায়। আর সবশেষ গবেষণা বলছে বিশ্বে পঞ্চম দূষিত বায়ু’র শহর এখন ঢাকা। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বায়ু দূষণ রোধে ৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি বছরও এক দিনের জন্য নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস হচ্ছে ধুলাবালি। নির্মাণকাজের কারণে বাতাসে প্রচুর ধুলা যুক্ত হয়। এরপরে রয়েছে যানবাহনে ব্যবহƒত জ্বালানি। এছাড়া নতুন একটি কারণে বাতাস দূষিত হচ্ছে, তা হলো বর্জ্য পোড়ানো। ঢাকায় এখন নানা ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হয় এবং এটা দিনদিন বাড়ছে। শিল্প কারখানার মধ্যে স্টিল রিরোলিং মিল বায়ু দূষণ করে, এরপরে আছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। এর পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে চলছে চরম দায়িত্বহীনতার প্রতিযোগিতা। ঢাকা শহরের ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় এমন কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে ময়লার স্তূপ নেই। তা থেকে প্রতিনিয়ত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
ঢাকার বায়ু কতটা বিপজ্জনক: ঢাকার বায়ুতে প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম-২.৫) বা বস্তুকণা ২.৫ এর বার্ষিক গড় ৭১ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম এবং এনও২ এর বার্ষিক গড় প্রতি ঘনমিটারে ২৩ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রাম। ‘শহরগুলোতে বায়ুর মান এবং স্বাস্থ্য’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে এমন তথ্যই বলা হয়েছে। বস্তুকণা পিএম-২.৫ হলো বাতাসে থাকা সব ধরনের কঠিন এবং তরল কণার সমষ্টি, যার বেশিরভাগই বিপজ্জনক। মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমনÍ প্রাণঘাতী ক্যান্সার এবং হƒদযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে পিএম-২.৫। এছাড়া বায়ু দূষণকারী এনও২ প্রধানত পুরোনো যানবাহন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প স্থাপনা, আবাসিক এলাকায় রান্না, তাপদাহ এবং জ্বালানি পোড়ানোর কারণে তৈরি হয়। গত বছর ডব্লিউএইচও তার বায়ুমান নির্দেশক গাইডলাইন পরিবর্তনের পর জানায়, পিএম২.৫ নামে পরিচিত ছোট এবং বিপজ্জনক বায়ুকণার গড় বার্ষিক ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে এরচেয়েও কম ঘনত্ব উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। নতুন এই প্রতিবেদনে বিশ্বের ৭ হাজারের বেশি শহরের বায়ু দূষণ এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম কিছু শহর এবং নগরাঞ্চলে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শহরগুলোর ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের বায়ু মানের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন। বায়ুু দূষণকারী প্রধান দুই উপাদান পিএম২.৫ ও এনও২ ভিন্ন ভিন্নভাবে শহরগুলোতে দূষণ সৃষ্টি করেছে।

শীর্ষ পাঁচের তিনটিই দক্ষিণ এশিয়ার: সংস্থা দুটি বলেছে, বিশ্বে শীর্ষ দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ইন্ডিয়ার রাজধানী নয়াদিল্লি। শহরটিতে বায়ুকণা পিএম২.৫ এর গড় বার্ষিক ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১১০ মাইক্রোগ্রাম। এরপরই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেশটির আরেক শহর কলকাতা। এই শহরে বায়ুকণা পিএম২.৫ এর গড় বার্ষিক ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৮৪ মাইক্রোগ্রাম। এছাড়া তৃতীয় স্থানে থাকা নাইজেরিয়ার কানো শহরের ক্ষেত্রে তা ৮৩.৬ মাইক্রোগ্রাম। চতুর্থ স্থানে থাকা পেরুর রাজধানী লিমার বায়ুকণা পিএম২.৫ এর গড় বার্ষিক ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৭৩.২ এবং বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ৭১ দশমিক ৪ মাইক্রোগ্রাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন এবং মধ্যম-আয়ের বিভিন্ন দেশের শহরগুলোর বায়ুতে বস্তুকণা ২.৫ এর উপস্থিতি বেশি। অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর পাশাপাশি নিম্ন এবং মধ্যম-আয়ের দেশের শহরেও এনও২’র উপস্থিতিও বেশি রয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষিত বায়ুর কারণে ২০১৯ সালে রাজধানীতে ২২ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৯ সালে ৭ হাজার শহরের মধ্যে ৮৬ শতাংশ শহরেই ডব্লিউএইচওর বেঁধে দেওয়া প্রতি ঘনমিটারে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি ১০ মাইক্রোগ্রামের সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এতে ২৬০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এতে বলা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বের ৭ হাজারের বেশি শহরের মধ্যে মোট ৮৬ শতাংশ শহরের প্রতি ঘনমিটারে বাতাসে প্রাণঘাতী পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম-২.৫ এর উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া বার্ষিক ১০ মাইক্রোগ্রাম সীমার চেয়ে কয়েক গুন বেশি ছিল। যা বিশ্বের ২৬০ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানি বায়ুদূষণে: জীবাশ্ম জ্বালানি দহন, বায়োমাস পোড়ানো, চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন থেকে নির্গমন, ইটভাটা এবং ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোর দূষিত বায়ুর মান প্রায়ই বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনামে আসে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধুমাত্র বায়ু দূষণের কারণে প্রত্যেক বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
দূষণে মৃত্যুর সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ: দূষণ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ল্যানসেট জার্নাল গত ১৭ মে ‘গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ ও সিসার বিষক্রিয়ায় ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ মারা গেছেন। তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মারা গেছেন বায়ুদূষণে। যুদ্ধ, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি, যক্ষা বা মাদকের কারণে বার্ষিক বৈশ্বিক মৃত্যুর চেয়ে এ হার বেশি। দূষণের কারণে মৃত্যুর হার গত ২ দশকে ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।বায়ু, পানি, সিসা ও কর্মক্ষেত্রে দূষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে মারা গেছে দুই লাখের বেশি। দূষণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বায়ুদূষণে মৃত্যুর দিক থেকে ইন্ডিয়ার পরই রয়েছে যথাক্রমে বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তান। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাই এর সবচেয়ে বড় কারণ।রোগ বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশ্বে বড় ঝুঁকির কারণ পরিবেশ দূষণ।
বায়ুদূষণ কমালে দেশে গড়
আয়ু বাড়বে ৫ বছর
সম্প্রতি আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদন বলছে, নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দূষিত বাতাস গ্রহণ করায় পড়তে হচ্ছে ফুসফুস ও হদরোগের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। এতে বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু কমছে দুই বছর। এই দূষণে দুনিয়ার সব অঞ্চলকে টপকে গেছে বাংলাদেশ। দেশে মানুষের গড় আয়ু কমছে আশঙ্কাজনক হারে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে উল্টো গড় আয়ু অন্তত পাঁচ বছর বাড়বে। তারা আরও বলছে, সব অঞ্চলে বাতাসের মানের অবনতি ঘটলেও পিএম২.৫ দূষণ কমিয়ে বিশ্বে রেকর্ড করেছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীন। ২০১৩ ও ২০২০ সালের মধ্যে দেশটি ৪০ শতাংশ দূষণ হ্রাস করায় সেখানে গড় আয়ু বেড়েছে দুই বছর।

দ্রুতই পরিকল্পিত পদেক্ষপ গ্রহণ করা জরুরি: বিশ্লেষকরা বলছেন, বায়ু দূষণ রোধে দ্রুতই পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে পড়বে। তারা বলছেন, ঢাকার দূষণের প্রধান কারণ নির্মাণকাজের সময় সৃষ্ট দূষণ। রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর নির্মাণের সময় সৃষ্ট ধুলাবালু বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়েছে। এ ছাড়া আছে যানবাহনের দূষণ। যানজট এ দূষণ আরও বাড়িয়ে তোলে। রাজধানীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার হাল করুন। সেটা দূষণের একটি বড় কারণ। বায়ুতে থাকা অক্সিজেন মানুষসহ সব প্রাণীর বেঁচে থাকার মূল শক্তি। পরিবেশ ও বায়ু দূষণের ফলে বাতাসে ধুলিকণার হার বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে অক্সিজেনের গ্রহণযোগ্য মাত্রা কমে যায়। এর ফলে জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে দেখা যায়। বর্তমানে দেশে কোটি কোটি মানুষের নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। চলমান করোনাভাইরাস মহামারিতে বায়ু দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। শীতের আগমনে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় পার্টিকেল মেটার বা সূক্ষ্ম ধুলিকণার হার অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় করোনার সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়ে চলেছে।
ইউডি/সুস্মিত

