সাইবার ক্রাইম: নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ জরুরি
দয়াল কুমার বড়ুয়া । বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১০:১৫
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ স্মার্ট আগামীর স্বপ্ন দেখছে। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর অন্যতম দেশকে তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে নেওয়া। এরই মধ্যে দেশ এ খাতে যথেষ্ট এগিয়েও গেছে। শহরের সীমা ছাড়িয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তির মোবাইল, ইন্টারনেট গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির নানা সুফল ক্রমেই মানুষের সহজলভ্য হচ্ছে।
প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি ভালোর বিপরীতে মন্দও থাকে। একইভাবে তথ্য-প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ক্রাইম বা তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের পরিমাণও দ্রুত বেড়ে চলেছে। ক্রমেই অধিক হারে নিরীহ মানুষ এ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধের মধ্যে ইন্টারনেটে আপত্তিকর ছবি প্রচার, ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণার ফাঁদ পাতার মতো সামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও সংঘটিত করা পর্যন্ত বহু রকম অপরাধই রয়েছে। দিন দিন বাড়ছে এসব অপরাধের পরিধি। মানব পাচারের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। জঙ্গিবাদ বিস্তারেও তা অবদান রাখছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যৌনতা ও মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কালো হাত ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শান্তির জন্যও ডেকে আনছে বিপদ। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপতৎপরতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের স্বজনরা। ফেসবুক-ইউটিউবে ভিডিও ছড়িয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবার, সরকার, বিচার বিভাগ, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও দেশের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। জবাবদিহি না থাকায় বেপরোয়াভাবে চলছে এসব কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা হয়রানি ও সম্মানের কথা ভেবে এসব বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করে না। সাইবার অপরাধ দমনে সরকার জোরালোভাবে কার্যক্রম শুরু করলেও বিচার ও শাস্তির হার খুবই কম। যার কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে না। এ ছাড়া স্বচ্ছ ধারণা না থাকা ও প্রতিকার পেতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মানুষকে হয়রানি ও প্রতারিত করার ঘটনা করোনা সমাজে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন প্রতিশোধ নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে যেখানে মানুষ মারামারি করে রাগ কমাত এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকজনকে বিব্রত অবস্থায় ফেলে অপরাধী মানসিক তৃপ্তি পায়। সম্প্রতি এ ধরনের অপরাধ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এখনো এমন অবস্থানে পৌঁছেনি যেখানে সচেতনতা দিয়েই সাইবার অপরাধের অপরাধ কমানো যাবে। এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা গেছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, পর্নোগ্রাফি আইন, আইসিটি আইন, টেলিকমিউনিকেশন আইনে সারা দেশে ২০১৫ সালে যেখানে ছয়শ ৩৮টি মামলা হয়েছে, সেখানে ২০২০ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪শ ৫৯টিতে। গত বছরের ডিএমপির সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ১৮ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে সাত শতাংশ, ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ৩৬ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ৫৫ থেকে বেশি বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে তিন শতাংশ তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধে জড়াচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করে মাত্রাহীন হয়রানি ও সাইবার অপরাধ চলছে। হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। নারী, শিশু থেকে শুরু করে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের টার্গেট করে হয়রানি করছে সাইবার অপরাধীরা। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলোকে বেপরোয়াভাবে সাইবার অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, সাইবার অপরাধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ দরকার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সাইবার অপরাধ দমনে সরকার নানা ধরনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগও নিয়েছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিট। ডিজিটাল আইন, সাইবার অপরাধ দমনে নানা ধরনের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবেই কি সাইবার অপরাধ বাড়ছে? শুধু আইন করে বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বসে থাকলে চলবে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগও এ ক্ষেত্রে জরুরি।
লেখক: কলামিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

