আবার ফিরে এলো পোলিও : নতুন দুর্ভোগ শুরুর বার্তা নয়তো?
শামিম আনসারি । শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১৪:০০
ছয় দশকেরও বেশি সময় পর এখন কল্পনা করাও কঠিন তৎকালীন সময়ে পোলিও টিকার কার্যকারিতার সংবাদটি কতটা আনন্দ ও স্বস্তি বয়ে এনেছিল। তখন সংবাদটি প্রচারিত হওয়ার পরপরই আমেরিকার গির্জাগুলোর ঘণ্টা বেজে উঠেছিল, শিশুদের স্কুলে ছুটি দেওয়া হয়েছিল, মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিল। এতটা আনন্দিত হওয়ার কারণ ছিল, পোলিও এমন একটি ভাইরাস, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে, এমনকি কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত থাকায় একে নির্মূল করার কাজটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যায়।
এটাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সাফল্যের অন্যতম গল্প মনে করা হয়। এখন এটা ভাবাও যায় না যে ৩০ বছর আগে বিশ্বে প্রতিবছর তিন লাখ ৫০ হাজার শিশু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতো। এরই মধ্যে তিনটি বন্য পোলিও প্রজন্মের মধ্যে দুটি নির্মূল করা হয়ে গেছে। আর দুই বছর আগে আফ্রিকাকে বন্য পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যে এই সাফল্য পাওয়ার পর সম্প্রতি লন্ডনে নর্দমার পানিতে পোলিও ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেল। এর পরপরই কর্তৃপক্ষ লন্ডনের এক থেকে ৯ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা কিংবা টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার অভিযান শুরু করেছে। একই ধরনের পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নগরেও। সেখানে নগরের উত্তরাংশে বসবাসকারী এক ব্যক্তি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
সারা পৃথিবীতেই গত শতাব্দী থেকে বেশ কয়েক দশক জুড়ে পোলিও দূরীকরণের জন্য জোরদার ভাবে কাজ করে চলেছে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকার। একদিকে যেমন জোর দেওয়া হয়েছে পরিবেশ এবং সচেতনতায়, তার সঙ্গে শিশুদের পোলিও টিকা বাধ্যতামূলক ভাবে খাওয়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। আফ্রিকার মালাউই দেশে গত পাঁচ বছরে প্রথমবার পোলিও আক্রান্তের খবরে চিন্তায় পড়েছে স্বাস্থ্যমহল। আফ্রিকার মালাউই দেশের রাজধানী লিলংওয়েতে একটি শিশুর শরীরে ধরা পড়েছে পোলিও ভাইরাস। ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর মাসে তিন বছরের এই মেয়েটির শরীরে অসাড়তা দেখা গিয়েছিল। এর পরে বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানা যায় যে, মেয়েটি পোলিওতে আক্রান্ত। শিশুটির শরীরে পোলিওর যেই স্ট্রেন পাওয়া গিয়েছে, সেটি সম্ভবত পাকিস্তান থেকে গিয়েছে। কারণ পাকিস্তানে পোলিওর ঘটনায় একইরকম স্ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল। স্বস্তির কথা যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনই একে মহামারি হিসাবে ভাবছে না। ওই এলাকায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দেখা হচ্ছে, কোনওভাবেই যেন এই ভাইরাস ছড়াতে না পারে।
এরই মধ্যে গ্লোবাল পোলিও ইরাডিকেশন ইনিসিয়েটিভের কুইক রেসপন্স টিম পৌঁছে গেছে ওখানে। এর আগে আফ্রিকা মহাদেশে পোলিও আক্রান্ত হওয়ার কথা শোনা গিয়েছিল ২০১৬ সালে উত্তর নাইজেরিয়ায়। বলাই বাহুল্য পোলিও একটি ছোঁয়াচে রোগ যেটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। সারা শরীর অসাড় করে দিতে পারে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। বর্তমানে পৃথিবীতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পোলিও নিয়ে যথেষ্ট দুশ্চিন্তা রয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে পাকিস্তানে ১২৯ জন পোলিও আক্রান্তের কথা জানা গিয়েছিল। তবে আশার কথা হল যে ১৯৮৮ থেকে সারা পৃথিবীতে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৯৯ শতাংশ।
মনে রাখতে হবে, পোলিও এমন একটি ভাইরাস, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে, এমনকি কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত থাকায় একে নির্মূল করার কাজটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যায়। বর্তমানে পোলিও সংক্রমণের সিংহভাগই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে। এই দু’টি দেশের প্রধান সমস্যা হল তৃণমূল স্তরে পোলিওর টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। যুদ্ধ ও সংঘর্ষ কবলিত আফগানিস্তানে আবার সমগ্র স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে এবং অগুনতি শিশু তাই চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে। তবে ভীতি বা এড়িয়ে যাওয়া নয়, পোলিওর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন হল সতর্কতা। সমাজের প্রতিটি স্তরেই বিজ্ঞান নির্ভর স্বাস্থ্য সচেতনতা, বাধ্যতামূলক টিকাকরণ এবং সুরক্ষাই পারে পোলিও মহামারি আটকাতে।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/অনিক

