রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনিরাপদ ঢাকার ফ্লাইওভার
সাদেকুর রহমান । বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট ২০২২ । আপডেট ১১:৩০
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও পরিবহন সেবায় স্বস্তি আনতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও পুরোপুরি স্বস্তি মেলেনি। বর্তমানে ফ্লাইওভারগুলো এক আজানা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ফ্লাইওভারের উপরের অংশ ভেঙে একাকার হয়ে আছে। নোংরা ময়লা আবর্জনায় পরিবেশ হয়ে আছে কলুষিত। বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়শঃ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। এ ছাড়া ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখল করে মাদকের আখড়া, হাট-বাজার, গাড়ির স্ট্যান্ড, অবৈধ পার্কিংসহ ঘোড়ার আস্তাবল গড়ে তুলেছে দুর্বৃত্তরা। ফ্লাইওভার উপর দিয়ে ভারী মালামালবহনকারী লরি, পাথরবোঝাই ট্রাক ও ট্রেইলর চলাচলের কারণে এগুলোর স্থায়িত্বও হুমকির মুখে। ভুক্তভোগী ও নগর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় ফ্লাইওভারগুলো অরক্ষিত ও অপরাধের কেন্দ্র হয়ে পড়েছে।
যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীতে সাতটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। দিনের বেলায় যাতায়াত কিছুটা নির্বিঘ্ন হলেও সমস্যা বাধে রাতে। এসব ফ্লাইওভারের অধিকাংশ সড়কবাতি নষ্ট। বিভিন্ন সময় বাতিগুলো পুনঃস্থাপন করলেও কিছুদিন পর পর নষ্ট হচ্ছে। ফলে চুরি-ছিনতাই ও হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। আর ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক নিয়মিত পরিষ্কার করা হলেও ওপরের অবস্থা খুবই নাজুক। ফ্লাইওভারের দুই পাশে বালি ও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যায়। এতে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা।
সরেজমিন মগবাজার, মৌচাক ও মালিবাগ ফ্লাইওভারের তেজগাঁও, সাতরাস্তা, হলি ফ্যামিলি, ওয়্যারলেস, রাজারবাগ, শান্তিনগর, আবুল হোটেল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফ্লাইওভারের একাধিক এলাকায় পিচ ঢালাই করা রাস্তায় ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত দূর থেকে আন্দাজ করা যায় না। তেজগাঁও অংশ থেকে হলি ফ্যামিলি ও মগবাজার ওয়্যারলেসের দিকে ওঠার ঢালের আগে সড়কের সঙ্গে ফ্লাইওভারের ডিভাইডার ভেঙে যাওয়ায় যানবাহন উঠতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ফ্লাইওভারে বাতি জটিলতা ছিল উদ্বোধনের পর থেকেই। কয়েক বছর বাতি ছাড়াই অন্ধকারে ভুতুড়ে পরিবেশে যানবাহন চলাচল করেছে। ওই সময় রাতের বেলা ফ্লাইওভারে অপরাধীরা নানা রকম অপরাধ করে বেড়াত। মাদকসেবীরা মাদক সেবন করত। পরে চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ফ্লাইওভারে বাতি জ্বালিয়ে আলোকিত করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পর থেকে বাতিগুলো নষ্ট হওয়া শুরু হয়। বর্তমানে ফ্লাইওভারের ২০-৩০টি বাতি অকেজো হয়ে আছে। সর্বশেষ জুলাই মাসে কিছু বাতি লাগিয়েছে সিটি করপোরেশন। ভারী যানবাহন চলার কারণে যে খানাখন্দের সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলোও মেরামত করা হচ্ছে না। ফলে ছোট গর্ত থেকে বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া দ্রুতগতির ছোট ছোট গাড়ির চাকা হঠাৎ করে গর্তে পড়ে স্বাভাবিক চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়। পেছন থেকে আসা অন্যান্য যানবাহনও এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কবলে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বৃষ্টি হলে ফ্লাইওভারের একাধিক স্থানে জমে থাকে পানি। যানবাহন চলাচলের সময় পানি উড়ে অন্য যানবাহনের ওপর গিয়ে পড়ে। বৃষ্টি থেমে গেলেও দু-এক দিন পানি জমে থাকে। ফ্লাইওভারে পুরো অংশের রেলিংয়ের দুই পাশে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পানি জমে নোংরা পরিবেশ তৈরি হয়। একই অবস্থা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা আবুল হোটেল থেকে মৌচাক পর্যন্ত উড়াল সড়কটির। ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন এলইডি বাতি লাগালেও কয়েকটি অকেজো হয়ে রয়েছে। এ ছাড়া এ উড়াল সড়কটির দুই পাশে বালির স্তূপ দেখা গেছে। অনেক দিন ধরে পরিষ্কার করা হয় না।
জানা যায়, যানজট নিরসনসহ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের জন্য রাজধানীতে সাতটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। এগুলো হচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, মগবাজার-মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার, বনানী জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভার ও বিজয় সরণি ফ্লাইওভার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে এসব ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেকাংশেই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে ফ্লাইওভারগুলো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

