শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য: শহুরে জীবন বেশি শঙ্কার!

শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য: শহুরে জীবন বেশি শঙ্কার!

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । আপডেট ১৩:০০

বাংলাদেশে স্বাস্থ সেবায় গ্রামাঞ্চলের চেয়ে যোজন-যোজন এগিয়ে আছে শহরাঞ্চল। মূলত, শহরগুলিই দেশের চিকিৎসার তীর্থস্থান। কিন্তু দেশে নগরের ২৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায় এমনই তথ্য উটে এসেছে। এছাড়াও দেশে গ্রামের মানুষের চেয়ে শহুরে মানুষের রোগাক্রান্তের হার অনেক বেশি। পর্যাপ্ত উন্নত জীবন ও উন্নত চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও কেন শহরের মানুষের রোগাক্রান্তের হার বেশি? বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল অনিক।

আমাদের দেশে গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষের অসুস্থতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। নাগালের মধ্যে উন্নত ও নিশ্চিত স্বাস্থ্য-চিকিৎসা সেবা থাকা সত্ত্বেও নগরের মানুষ অসুস্থ্য হচ্ছে বেশি। অন্যদিকে, নাগালের মধ্যে উন্নত ও নিশ্চিত স্বাস্থ্য-চিকিৎসা সেবা না থাকার পরেও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে খুবই ভাল অবস্থানে গ্রামীন জনপদ। এক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য থাকতে পারে যা হচ্ছে দূষণমুক্ত প্রকৃতি। গ্রামের মানুষের সুস্থ থাকার কারণের মধ্যে থাকতে পারে স্বাস্থ্যসম্মত খদ্যাভাস, ভেজালমুক্ত খাবার, নিয়মিত পরিশ্রম ও সঠিক জীবনযাত্রা। এদিকে শহরের মানুষের শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে বসে কাজ করা এবং খাদ্যাভ্যাসকেই দায়ী করছেন গবেষকরা।

উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে নগরের ২৩% মানুষ: বাংলাদেশের শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। যা শতকের হিসেবে ২৩ শতাংশ। এছাড়া ১৪ শতাংশ মানুষ ভবিষ্যতে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে ভোগার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই পরিসংখ্যানটি সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়া ফিল্ড এপিডেমিওলোজি এন্ড টেকনোলজি নেটওয়ার্ক (সেফটিনেট) বাংলাদেশের এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায়। বাংলাদেশের নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এই গবেষণায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতা নির্ণয় ও ঝুঁকি যাচাই করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে ভোগার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। পাশাপাশি, ৩৬ শতাংশ মানুষ স্থূলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। চার সিটি করপোরেশনের মধ্যে রংপুরের মানুষদের মধ্যে উচ্চরক্তচাপের রোগীর হার সবচেয়ে বেশি, শতকরা ৩৪ শতাংশ এবং কুমিল্লার মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে কম। অন্যদিকে উচ্চরক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হার সবচেয়ে বেশি কুমিল্লায় (২৩ শতাংশ) এবং সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে (৬ শতাংশ)। খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া, উচ্চরক্তচাপের পারিবারিক ইতিহাস এবং সংযোগ ইত্যাদিকে উচ্চরক্তচাপের কারণ হিসেবে গবেষণায় ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আরবান হেলথে কাজ করা খুব সহজ বিষয় নয়। এ ধরণের উন্নতমানের গবেষণা আরও বেশি দরকার যেন কোনো জায়গাতে কাজ করতে হবে সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। আর সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে, শহরকে বসবাসযোগ্য যেমন করতে হবে, নগরবাসীর স্বাস্থ্যের খেয়ালও রাখতে হবে।’

জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও খাদ্যাভ্যাস দায়ী: মানুষ এখন যে ধরণের খাবার খাচ্ছে- সেটিকেই এই রোগের মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন সেভ দ্য চিলড্রেনের পাবলিক হেলথ কমিউনিকেশন্স এর টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, “দিন দিন নগরায়নের ফলে আমাদের জীবনযাত্রায় যে ধরণের পরিবর্তন আসছে সেটাই আসলে উচ্চ রক্তচাপে ভোগার জন্য দায়ী। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া, দীর্ঘক্ষণ বসে বসে কাজ করা এবং খাদ্যাভ্যাস।”

সংস্থাটির হেলথ এন্ড নিউট্রিশন সেক্টরের পরিচালক লিমা রহমান বলেন, উচ্চরক্তচাপ ও স্থূলতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়া বিভিন্ন রকমের চাপ। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যহীন খাবার গ্রহণও এই রোগের উল্লেখযোগ্য কারণ। তার মতে, উচ্চ রক্তচাপ যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না হয় তাহলে নানা ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্বে উচ্চচাপ এবং স্থূলতা এখন সবচেয়ে মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে কাজ করছে। এটা নিয়ন্ত্রণে না আসলে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

শহরে রোগ বাড়ার অন্যতম কারণ পরিবেশ দূষণ: বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তারা বলছে, দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ দুষণজনিত কারণে বাংলাদেশে যেখানে ২৮ শতাংশ মৃত্যু হয় সেখানে মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ আর ইন্ডিয়াতে ২৬ দশমিক ৫। বাংলাদেশের পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা এবং প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলছেন, পরিবেশ দূষণের বেশ কয়েকটি ভাগ রয়েছে। যেমন বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, খাদ্য দূষণ ইত্যাদি রয়েছে। এর সবগুলোর ফলেই কোন না কোনভাবে মানুষ ক্ষতির শিকার হচ্ছে। পরিবেশ দূষণের জন্য সৃষ্ট রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ১. শিশুদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যাহত এবং স্নায়ুর ক্ষতি, ২. গর্ভবতী মহিলাদের শারীরিক ক্ষতি, ৩. বায়ু দূষণে চোখ, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি, ৪. ক্যান্সার ও হৃদরোগ, ৫. হাইপার টেনশন ইত্যাদি।

প্রকৃত চিকিৎসা সেবা না বোঝাও দায়ী: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা বলতে মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়াকে বুঝলেও, চিকিৎসকরা একে স্বাস্থ্যসেবার একটি মাত্র অংশ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। বাংলাদেশে যেখানে জনসংখ্যার হিসেবে চিকিৎসা সেবা সীমিত সেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি এখনও কাগজে কলমে থেকে গিয়েছে বলে অভিযোগ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। ঢাকার মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা জিনাত শারমিন দুটি সন্তান জন্ম দেয়ার পর থেকে তার ওজন বাড়তে শুরু করেছে এবং করোনাভাইরাস পরবর্তী নানা জটিলতায় ভুগছেন তিনি। এমন অবস্থায় তার চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অর্থাৎ পরিমিত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শ দিয়েছেন। মিসেস শারমিন তার সুস্বাস্থ্যের এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন হলেও সেটি মেনে চলা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমি যে এলাকায় থাকি এখানে হাঁটার তো রাস্তা নাই। ফুটপাথগুলো দখল হয়ে আছে। ফিটনেস সেন্টারগুলো এতো কস্টলি (দামী)। আমাদের মতো মিডেল ইনকাম (মধ্যবিত্ত) মানুষদের জন্য কঠিন, আর ধরেন বাসার কাছে কোন জিমে যদি যাই, একটা ড্রেসকোড থাকে। সেটা পরার পরিবেশও এখানে নাই।” জিনাত শারমিনের মতো এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেকেই। আবার এমনও অনেকে আছেন যারা স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধুমাত্র অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া এবং ওষুধ খাওয়াকেই বুঝে থাকেন।

উত্তরদক্ষিণ । ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

কেউ উন্নত হচ্ছে না গ্রামীণ চিকিৎসা সেবা?
সম্প্রতি স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ ও সেবা নেবার জন্য বাংলাদেশের মানুষদের শতকরা ২৩.৪ ভাগ ওষুধের দোকান বা ফার্মেসিতে যায়, শতকরা ১৯.৭ ভাগ মানুষ পরামর্শ ও ওষুধের জন্য গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, শতকরা ১৬.২ ভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এমবিবিএস বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেন, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ প্রাইভেট ক্লিনিকে যায়। অপরপক্ষে শতকরা ১২.১ ভাগ মানুষ উপজেলা হাসপাতাল, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যায় এবং শতকরা ৪.১ ভাগ মানুষ সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে, শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যায় এবং মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যায়।

অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক, লিভারের বিভিন্ন সমস্যা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণেই হয়ে থাকে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কিডনি জটিলতা, চোখের রক্তনালী ফেটে গিয়ে অন্ধত্ব এবং ব্রেইন স্ট্রোকও উচ্চরক্তচাপের কারণে হতে পারে বলে জানান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। জীবন যাত্রায় নানা ধরণের পরিবর্তন যেমন, দেহ সক্রিয় রাখা, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং প্রয়োজনে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলেও জানান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading