দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কতটা বদলে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড?
সুমন ভট্টাচার্য । বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর ২০২২ । আপডেট ০৯:২০
একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যু গোটা মহাদেশকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে? কতটা প্রভাবিত করেছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে? ১৯৭৫ এর পরবর্তী সময়ে মার্কিন কনসুলেটের বিভিন্ন ইন্টারনাল মেমো, যা পরবর্তীকালে উইকিলিকসের মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে, সেগুলো দেখলে পরে বোঝা যায় যে, মুজিবের নিষ্ঠুর হত্যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কতটা আলোড়িত করতে পারে তা নিয়ে চিন্তিত ছিল ওয়াশিংটন।
বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর কলকাতায় সাংবাদিক সম্মেলন করে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং চীনাদের বিঁধে ছিলেন কংগ্রেসের তৎকালীন দাপুটে নেতা এবং যুব কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি ও সাংসদ প্রিয় রঞ্জন দাশমুন্সি। আবার ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে, এই খবর কলকাতার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়া নিয়ে কলকাতায় মার্কিন আধিকারিকদের কাছে জানতে চায় দিল্লির মার্কিন কনস্যুলেট। এবং কলকাতার যুগান্তর পত্রিকার এই খবর, অর্থাৎ ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ নিয়ে প্রতিবেদন ভুয়ো বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রকে কড়া প্রতিবাদপত্র পাঠাতে বলে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস।
কেন ভারতবর্ষে মুজিব হত্যা নিয়ে কি ধরনের খবর প্রচারিত হচ্ছে বা কি ধরনের জনমত তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে এতটা সংবেদনশীল ছিল ওয়াশিংটন? একটা অবশ্যম্ভাবী কারণ যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যেভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল এই বঙ্গ এবং কলকাতা, তা ততদিনে মার্কিন প্রশাসনের নজরে এসে গিয়েছিল। আমাদের মাথায় রাখতে হবে গত শতকের ছয় এবং সাতের দশকে যে দুটি ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিকে আলোড়িত করেছিল এবং আমেরিকার জন্য বড় ধাক্কা ছিল, সেই দুটি ঘটনারই অভিঘাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গণআন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কলকাতায় টের পাওয়া যেত।
প্রথমটি অবশ্যই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ছোট্ট দেশ ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তারপরে কমিউনিস্টশাসিত উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে আমেরিকার লাগাতার যুদ্ধ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলকাতার নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, রুখে দাঁড়ানো এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন যদি সেই সময় মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত গণআন্দোলন এবং জনমত তৈরির অন্যতম সার্থক উদাহরণ হয়, তাহলে তারপরে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তারই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গেও কলকাতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
একদিকে এই দুটি ঘটনাই যেমন তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির চরম বহিঃপ্রকাশ ছিল, তেমনই তার বিরুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কিভাবে মানুষ সংগঠিত হচ্ছে বা গণআন্দোলন তৈরি হচ্ছে, তা ঢাকা এবং কলকাতা হাতে হাত মিলিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। প্রথমে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তারপরে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ, দুটিই ওয়াশিংটনের বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলকাতা যেভাবে উত্তাল হয়েছিল, জনমত তৈরি হয়েছিল, কলকাতার জনমত যেভাবে সামগ্রিক ভারতবর্ষের কূটনীতি এবং রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল, তা ইতিহাসে আলাদা করে উল্লেখ করার মতো।
সেই জন্যেই মুজিব হত্যার পরে কলকাতায় কিভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে বা ভারতবর্ষে জনমত কোন দিকে যাচ্ছে তাই নিয়ে গভীর চিন্তিত ছিল মার্কিন প্রশাসন। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া কেবল বা অন্য আদান-প্রদান দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ওয়াশিংটন ভাবছিল ভারতবর্ষের সেই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস প্রভাবিত সংবাদমাধ্যমগুলো কিভাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করছে, তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সেই জন্যেই মুজিব হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে, কলকাতার যুগান্তর পত্রিকায় এই খবর প্রকাশের পরে কলকাতা, দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মার্কিন বিদেশ দফতরের আধিকারিকদের মধ্যে ক্রমাগত বার্তার আদান-প্রদান হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর হত্যা গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিকে কতটা আলোড়িত করেছিল এবং পৃথিবীর দুই শক্তিকেন্দ্র ওয়াশিংটন এবং মস্কো কিভাবে সমস্ত ঘটনাপ্রবাহকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিল। গত শতকের সাতের দশকে কংগ্রেসের তরুণ তুর্কি নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি যেভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকে কেন্দ্র করে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইয়ের দিকে আঙুল তুলেছিলেন, তা যে ভারত তথা দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ায় আমেরিকার ভাবমূর্তিকে আরো খারাপ করবে, তা নিয়ে অন্তত ওয়াশিংটনের কোনও সংশয় ছিল না। কলকাতা এবং ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়া, ভারতবর্ষের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কিভাবে মুজিব হত্যাকে দেখছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ এবং মার্কিন সরকারের শশব্যস্ততা নিয়ে এত শব্দ ব্যয় করলাম কেন? আসলে বোঝানোর জন্য যে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশ হলেও ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি, গোটা পৃথিবীতে কতটা আলোড়ন তুলেছিল।
একজন রাষ্ট্রনায়কের হত্যা, যিনি আবার সেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাও বটে, আসলে সেই ভূখণ্ডকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা বোধ হয় তার মৃত্যুর ৪৭ বছর বাদেও বাংলাদেশকে দেখলে অনুধাবন করা যায়। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, পৃথিবীতে বিভিন্ন সদ্যোজাত গণতন্ত্রে বিভিন্ন জননেতাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে বা হত্যা করানো হয়েছে। কারণ তা না হলে হয়তো সেই রাষ্ট্রনায়ক যেভাবে তার মহাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতেন, আলোড়িত করতেন, তা বৃহৎ শক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইউডি/সুস্মিত

