পরিবহণ খাতে ই-টিকিটিং সিস্টেম: ভাড়া নৈরাজ্যের সমাধান মেলেনি
শারমিন সুলতানা । রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ০৮:৩০
রাজধানীর গণপরিবহণে ভাড়া নৈরাজ্য রোধে সম্প্রতি কিছুসংখ্যক পরিবহণের বাস-মিনিবাসে চালু করা হয়েছে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা। পর্যায়ক্রমে সব পরিবহণের বাসেই এ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন ঢাকা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ।
শুরুতে এ ব্যবস্থায় স্বস্তিবোধ করেছিলেন যাত্রীরা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিবহণ খাতের অন্য অনেক ব্যবস্থার মতো এ উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উদ্যোগটি চালু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো রুটে ই-টিকিটিংয়েও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। উদাহরণস্বরূপ, যে দূরত্বে ভাড়া ছিল ১৫ টাকা, সেই একই দূরত্বে এখন আদায় করা হচ্ছে ২০ টাকা, অর্থাৎ এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
আবার যেসব রুটে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেসব রুটে বাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। যাত্রীরা মনে করছেন, বাসের এ সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্য ভাড়া বাড়ানো। এসব দেখে আমাদের আশঙ্কা, পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের লোভ ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে নগর পরিবহণে ই-টিকিটিং সিস্টেমও কার্যত ব্যর্থ হতে চলেছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এদিকে দৃষ্টি দেওয়া।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে প্রতিদিন যাত্রীদের সাথে পরিবহন শ্রমিকদের বচসা হচ্ছে, কোথাও কোথাও মারামারিও হচ্ছে। তবে আমার ধারণা, এই অস্থিরতা থাকবে না। একটা স্থিতিশীলতা আসবে। কীভাবে আসবে? আপনাদের কি ধারণা বাস মালিকরা জনগণের দাবির মুখে সরকার-নির্ধারিত ভাড়া আদায় করবে। তেমন আশা যদি কেউ করে থাকেন, আপনাদের আশার গুড়ে কঙ্কর পড়বে। অসংগঠিত মানুষের ক্ষোভ দুয়েকদিন পর প্রশমিত হয়ে যাবে। আরও সব অন্যায়ের মতো এটাও তারা মুখ বুজে সয়ে যাবেন। সুসংগঠিত পরিবহন মাফিয়াদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ কখনোই পারেনি, পারবেও না। না পারার মূল কারণ, পরিবহন খাত যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা সবাই সরকারি দলের বিশাল বিশাল নেতা। শাজাহান খান যখন মন্ত্রী ছিলেন, তখন তার সরকারি বাসায় বসে পরিবহন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সেখান থেকে ফোনে সবাইকে জানানো হয়েছে। এই যদি হয় অবস্থা, আপনি কখনও তাদের সাথে পারবেন না।
ভাড়া বাড়ানোর যে বৈঠক হয়, কখনও সেই বৈঠকে যাত্রী প্রতিনিধি থাকে না। পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্য বা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করুন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তিনি বাসে চড়েছিলেন। তাকেও বাড়তি ভাড়া দিতে হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নেওয়ার পরও তারা যদি একটু ভালো সেবা দিতো, তাহলেও যাত্রীরা নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশের আরও সব খাতের মতো পরিবহন খাতেও সেবার কোনও ধারণাই নেই। বাড়তি ভাড়া দিয়ে আপনাকে বাদুড়ঝোলা হয়ে অফিসে যেতে হবে। বসার সুযোগ যদি আপনার ভাগ্যে জোটেও বাসের আসনে ঠিকমতো পা মেলতে পারবেন না। আর নিজের মানসম্মান নিয়ে বাসায় ফিরতে চাইলে পরিবহন শ্রমিকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ না করাই ভালো।
বস্তুত গণপরিবহণে এখনো ভাড়া নৈরাজ্য চলছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গণপরিবহণের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বেশি ভাড়া। এ নিয়ে পরিবহণকর্মী ও যাত্রীদের মধ্যে বচসা লেগেই থাকে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো কাজ হয় না। পরিবহণকর্মীদের কথামতো অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে যাত্রীদের হেনস্তা করা হয়। প্রতিটি বাস-মিনিবাসে ভাড়ার চার্ট টানানোর কথা থাকলেও অনেক বাসেই তা দেখা যায় না। আবার যেসব বাসে তা দেখা যায়, সেখানেও রয়েছে ফাঁকি। তাছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও অনেক বাসে আদায় করা হচ্ছে ১২-১৩ টাকা। সড়কে প্রকাশ্যে এমন ‘ভাড়া সন্ত্রাস’ চললেও এর বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। প্রশ্ন হলো, গণপরিবহণে এ ভাড়া নৈরাজ্যের অবসান হবে কবে? গণপরিবহণে এমন নৈরাজ্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ নৈরাজ্যের অবসানে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে, এটাই কাম্য।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক।
ইউডি/সিফাত/সুপ্ত

