আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩০ হাজার: ডেঙ্গু ভয় বাড়াচ্ছে

আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩০ হাজার: ডেঙ্গু ভয় বাড়াচ্ছে

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ১১:৩০

২০১৯ সালের ন্যায় চলতি বছরও দেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু। ইতোমধ্যেই এডিস মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১২ জনের। ডেঙ্গুর বিস্তৃতি শহর অঞ্চলে থাকলেও তা এখন গ্রামেও ছড়াচ্ছে। চলতি অক্টোবর মাসে দিনকে দিন রেকর্ড ছাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দমন ব্যবস্থা জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী

অতীত রেকর্ড বলছে বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তা থাকে। শীত আসার পূর্বেই এর প্রাদুর্ভাব কমে যায়। কিন্তু চলতি বছর বর্ষা মৌসুম পেরিয়ে গেলেও ডেঙ্গু তার ভয়াল থাবা অব্যাহত রাখছে। যার দরুণ দিনকে দিন রেকর্ড সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার অক্টোবর মাসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। এ বছর দেরিতে এসেছে বর্ষা। থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে বাড়ির আনাচে-কানাচে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বেশি হয়েছে। ফলে দীর্ঘায়ত হয়েছে ডেঙ্গু মৌসুম।

আক্রান্ত ছাড়িয়েছে ৩০ হাজার, রেকর্ড ১১২ জনের মৃত্যু: সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার মধ্যে গত একদিনে রেকর্ড ৯২২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। এসময়ে আরও মৃত্যু হয়েছে দুজনের। শনিবার (২২ অক্টোবর) এডিস মশাবাহী এ রোগে আক্রান্তদের নতুন তথ্য নিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হয়েছে ৩০ হাজার ২৯ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এবছর মৃত্যুর পরিসংখ্যানও দ্বিতীয় সর্বোচ্চের অবস্থানে পৌঁছেছে। এর আগে ডেঙ্গু বিস্তারের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করা ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০২১ সালে যা ছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন। গত এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী ছিলেন বছরের সর্বোচ্চ। এর আগে গত বুধবার একদিনে ৯০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এদিকে, গত একদিনে মারা যাওয়া দুজনকে নিয়ে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত দেশে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়, যা দেশে এক বছরে সর্বোচ্চ মৃত্যু। ২০২১ সালে মৃত্যু হয়েছিল ১০৫ জনের। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৪০৪ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২ হাজার ৩২৮ জন। অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১ হাজার ৭৬ জন।

নতুন ধরণের প্রকোপ শঙ্কা বাড়াচ্ছে : চলতি বছর যেসকল রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন কিংবা নিচ্ছেন তাদের অধিকাংশ ডেন-থ্রি সেরোটাইপ বা ডেঙ্গুর ‘তৃতীয়’ ধরণে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আহমেদুল কবির জানান, এর মধ্যে অনেক জায়গায় ডেন-ফোরের উপস্থিতও পাওয়া যাচ্ছে। মূলত, যারা আগে এক বা একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা ডেন-থ্রি এবং ডেন-ফোরে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল রূপ নেয়ায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগও ডেন-থ্রি ও ডেন-ফোরে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামাল দিতেই হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কোন প্যানিক তৈরি করতে নয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, যেহেতু এটি নিয়মিত বাড়ছে কোনও রোগীকে যেন বিনা চিকিৎসায় বাড়ি ফিরে যেতে না হয় সেজন্য আমরা সরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। তারা প্রয়োজনীয় জনশক্তি, বেড এবং লজিস্টিকস সাপোর্ট তৈরি রাখবে।

প্রবীণ ও শিশুদের নিয়েই ভয় বেশি : বাংলাদেশে সবশেষ ২০১৯ সালে এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, চলতি বছরের ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ২০ বছরের বেশি। মৃত্যু বেশি ৪০-৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে। মারা যাওয়া রোগীদের ৩৫% শিশু অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের নীচে। আক্রান্ত রোগীকে দেরি করে হাসপাতালে নেয়ায় ভর্তির তিনদিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন অনেকে। ঢাকার বাইরেই বেশি মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া নারীদের মৃত্যুহার পুরুষদের তুলনায় বেশি।

তাজুল ইসলাম

‘অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা ভালো’: ডেঙ্গু মোকাবিলায় মেয়রদের চিরুনি অভিযানসহ নিবিড়ভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। সরকার ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য কাজ করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ বছর অন্য সময়ের তুলনায় থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে৷ মূলত আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্যই এবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর অবস্থা বেদনাদায়ক কিন্তু সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসহ অনেক দেশের তুলনায় এখনও অনেক ভালো। শনিবার (২২ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস

দুই সিটির কার্যক্রম যেমন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানিয়েছেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক সিটি করপোরেশনের যে কার্যক্রম চলছে, তাতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি। সম্প্রতি তিনি ডেঙ্গু নির্মূলে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে এ কথা জানান। তিনি বলেন, অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে। ডেঙ্গু পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত, প্রাদুর্ভাব নেমে না আসা পর্যন্ত আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাব।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিযানও পরিচালনা করছে। বাসাবাড়ি-অফিসে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, আইন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা হবে। কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি আসছে মিরপুর, উত্তরা ও মুগদা এলাকা থেকে। সেইসাথে ধানমন্ডি ও যাত্রাবাড়ী এলাকাকেও ডেঙ্গুর হটস্পট বলা হচ্ছে। ঢাকায় এই ডেঙ্গুবাহী এই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ মূলত দুই সিটি করপোরেশনের। এডিস মশা প্রজননের এই সময়কে সামনে রেখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেনের পক্ষ থেকে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোবায়দুর রহমান।

মেয়র আতিকুল ইসলাম।

নেপথ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলছেন, চলতি মাসের শেষের দিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকবে না, এবং নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে না। কারণ, তখন শীতের পাশাপাশি বৃষ্টি থাকে না। তিনি বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। মূলত, এবছর দেরিতে বর্ষা আসার পাশাপাশি থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় এডিস মশার প্রজনন অক্টোবরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে বেড়েছে। ডা. আব্দুল্লাহ আরো বলেন, ডেঙ্গু জ্বর, ডেঙ্গু হ্যামারেজিং ও ফিভার (জ্বর) এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোম, তবে ড্রেন ৩ বেশী জটিল হওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশী। তিনি আরও জানান, সচেতনতার অভাবেই প্রতি বছর এভাবে ডেঙ্গু হানা দেয়। শিশুদের এই সময়ে হাত পা ঢাকা জামা কাপড় পরানো উচিত। তারা দিনে ঘুমালে মশারি টানিয়ে দেয়া উচিত। ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশা দিনে কামড়ায়। তখন অধিকাংশ শিশু স্কুলে থাকে। স্কুল থেকেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এখন করোনাও আছে। তাই করোনার টেস্ট করালে সাথে ডেঙ্গুর টেস্টও করাতে হবে। জ্বর হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত টেস্ট করালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী দ্রুত শনাক্ত করা যায়। ফলে ঝুঁকি কমে যায়। আর জ্বর হলে নিজের চিকিৎসা নিজে না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরার্শ নিতে হবে। আমাদের ডেঙ্গু চিকিৎসায় কোনো সংকট নেই। তবে আবহাওয়া এবং সচেতনতার অভাবের কারণে ডেঙ্গু রোগী আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছি।

উত্তরদক্ষিণ, ২৩ অক্টোবর ২০২২, প্রথম পৃষ্ঠা

কর্মকৌশল শহর ছাড়িয়ে গ্রামে নেয়ার পরামর্শ : ডেঙ্গু আগে শুধু ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী শহর কেন্দ্রিক রোগ হলেও এখন এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেখানে উন্নয়ন কাজ ও নির্মাণ কাজ চলছে। সেক্ষেত্রে দেশজুড়ে সামগ্রিক কর্মকৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই কর্মকৌশল শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয় বরং যেখানে নগরায়নের বৈশিষ্ট্য আছে যেমন দেশটির সাড়ে তিনশ পৌরসভায় এই কার্যক্রম চালাতে হবে। এজন্য প্রতিটি পৌরসভায় কীটতত্ত্ববিদ এবং মশা নিধনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ সরবরাহ করার কথা জানান তিনি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার এবারের ডেঙ্গু বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, যখন কোনো ভেক্টর বর্ন ডিজিজ বেড়ে যায়, যদি তা দ্রুত থামানো না যায় তাহলে রোগটি বাড়তেই থাকবে। যদি কোনো বাসায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়, তাহলে তাকে মশারির ভেতরে রাখতে হবে, না হয় ওই বাসার সব মশা মেরে ফেলতে হবে। তাহলে ডেঙ্গু রোগী কমে আসবে। আর যদি সেই বাসার মশা মারা না হয়, কিংবা রোগীকে মশারির নিচে না রাখা হয়, তাহলে জ্যামিতিক হারে এই রোগটি ছড়াবে। তিনি আরও বলেন আগামীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। অনেকদিন ধরে যখন একটা রোগ একটা দেশে সংক্রমণ হয়, আর সেই ভাইরাসের যদি একাধিক ধরন থাকে, সেই রোগটা তখন ভয়াবহ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এখন তাই হচ্ছে।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading