ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা: উন্নয়নের জন্য কিছু সুপারিশ
নাজমুল আবেদিন । রবিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২২। আপডেট ০৯:০০
স্বাধীনতা-পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে ক্রীড়াক্ষেত্রে সবচেয়ে লক্ষণীয় যে পরিবর্তনটি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা হচ্ছে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের আগ্রহ, যুবসমাজের খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করার মানসিকতা এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। দেশের মানুষ এখন কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করাকে কিংবা জাতীয় দলের তুলনামূলক ভালো খেলার সক্ষমতাকে যথেষ্ট মনে করে না।
এখন সবাই সফলতা চায়, চায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতীয় পতাকার সগৌরব উপস্থিতি। আর তাই আমরা দেখতে পাই বাবা-মার হাত ধরে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠে সরব উপস্থিতি; ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পাশাপাশি সন্তান খেলাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে চাইলে তাতেও অভিভাবকের সস্নেহ সম্মতি। আমাদের অগোচরেই ধীরে ধীরে খেলাধুলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে, দৈনিক পত্রিকার দুই পাতাজুড়ে থাকছে এর খবর, এমনকি শুধু খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে স্পোর্টস চ্যানেল।
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির এ পরিবর্তনের কারণে বর্তমান সময়ের একজন সফল ক্রীড়াবিদের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের সামাজিক অবস্থানও এখন অন্য যে কোনো পেশায় সফল মানুষের সমতুল্য বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশিও। আর তাই একজন সাকিব আল হাসান, একজন সাবিনা খাতুন, একজন রোমান সানা কিংবা একজন সিদ্দিকুর রহমান আজ সমাজে এতটা সমাদৃত, সম্মানিত। একথা সত্যি, ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি যতটা সহজ ছিল, মেয়েদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। কিন্তু দিন শেষে মেয়েরাও পিছিয়ে থাকেনি।
ক্রিকেটে আমাদের মেয়েদের এশিয়া কাপ জয় কিংবা নারী ফুটবলে নিজেদের যোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়ে সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং এ সফলতাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা এ কথাই প্রমাণ করে। ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তারের এসএ গেমসে অশ্রুসজল চোখে স্বর্ণপদক গ্রহণের সেই দৃশ্য আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি কিংবা অতিসম্প্রতি আরচারিতে দিয়া সিদ্দিকীর বিশ্ব অলিম্পিকে অত্যন্ত সম্মানজনক অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের আরও সুন্দর ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত বহন করে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের যত অর্জন, তার পেছনে ক্রীড়াবিদ, সংগঠক বা সমর্থকদের অবদান অনস্বীকার্য। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও স্পন্সর হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু তারপরও এর অন্যতম চালিকাশক্তি হিসাবে আমরা সরকারকেই দেখতে পাই। কয়েকটি খেলা বাদ দিলে বাকি প্রায় সব খেলাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন ফেডারেশন এবং সংগঠনের মাধ্যমে আয়োজিত প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড় বাছাই, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ সংক্রান্ত সব ব্যয়ভার সরকারই বহন করে থাকে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও সুনাম অর্জনের স্বপ্ন দেখতেই পারে। তবে এজন্য যেটি প্রয়োজন, তা হচ্ছে দীর্ঘ পরিকল্পনা। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই সম্ভাবনাময় খেলাগুলোকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। দু-একটি খেলা বাদ দিলে নিকট ভবিষ্যতে দলীয় খেলায় সফলতার সম্ভাবনা খুব একটা নেই বললেই চলে আর সে কারণেই সম্ভাবনাময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কয়েকটি খেলাকে ঘিরে পরিকল্পনা সাজানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ আর তাই নির্দিষ্ট কয়েকটি খেলায় মনোযোগী হওয়াই যুক্তিসংগত এবং সেই অনুযায়ী বিনিয়োগ হওয়া জরুরি। এ বিনিয়োগ অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত খেলাগুলোর ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণ থেকে শুরু করে মানসম্পন্ন অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশে খাপ খাওয়ানোসহ সব ব্যাপারেই হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সর্বোপরি, ক্রীড়াসামগ্রীর সহজলভ্যতা শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তোলার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমদানিনির্ভর হওয়ায় আমাদের দেশে ক্রীড়াসামগ্রীর মূল্য আশপাশের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। জনপ্রিয় খেলাগুলোর ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। এ জন্য ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক কারণে খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হওয়া অথবা তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের এবং নিুমানের ক্রীড়াসামগ্রী ব্যবহার-এটিই হচ্ছে আমাদের খেলার মাঠের দৈনন্দিন চিত্র। এতে ‘বেইস ক্রিয়েশন কনসেপ্ট’টি ভীষণভাবে বিঘ্নিত হয়। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে প্রথমত আমদানিকৃত ক্রীড়াসামগ্রীর ওপর থেকে ট্যাক্স কমানোর ব্যাপারটি ভেবে দেখা যেতে পারে এবং এর পাশাপাশি সাধারণ মানের ক্রীড়া উপকরণ আমরা দেশীয়ভাবে প্রস্তুত করতে পারি কিনা, তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন।
লেখক- ক্রিকেট প্রশিক্ষক ও মেন্টর।
ইউডি/সুস্মিত

