বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি: হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২ । আপডেট ১১:৪৫
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়মের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি। এক দশক অতিবাহিত হলেও মূলহোতাদের সিংহভাগই আইনের আওতায় আসে নি। দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন জমা নিয়ে চলছে টালবাহানা। আর এরই বেড়াজালে নেপথ্যের খলনায়করা পার পেয়ে যাচ্ছে। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
লুটপাটকারীদের শেকড় খুঁজতে বাধা কোথায়: বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মামলাগুলো হয়েছিল ২০১৫ সালে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব মামলার তদন্ত ঝুলেই আছে, যার কোনো নির্দিষ্ট কারন কারো জানা নেই। জনগণের কষ্টের টাকা রক্ষা করা ব্যাংকের দায়িত্ব, সেখানে এতো বড় জঘন্য জালিয়াতি হওয়ার পরও দ্রুত বিচারের আওতায় আসছে না কেউই। বিশ্লেষকগণ বলছেন, দুদকের উচিৎ কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করে দ্রুত মামলার তদন্ত শেষ করা। অর্থ লুটপাটকারী চক্রের শেকড় খুঁজে বের করে জাতির সামনে তা প্রকাশ করা। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্তে¡ও দুদক এখনও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে ধরতে পারছে না। অন্যদিকে, তদন্তের ধীরগতি এ মামলাকে শুধু পেছাচ্ছে। সরকার অর্থ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। তাহলে দেশের অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরার পেছনের এই কারিগরদের ধরতে এতা বাধা কেন প্রশ্ন থেকে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে ভবিষ্যতে এ ধরণের কেলেঙ্কারির হাত থেকে রক্ষা পাবে জাতি।

আবদুল হাই বাচ্চু ধোয়া তুলশি পাতা: বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর। এ ঘটনায় বেশ কয়েক দফা দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে নির্দোষই দাবি করেছেন। দুদকও দালিলিকভাবে বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা পায়নি বলে জানায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের নিয়োগ করা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে অনিয়মিত ঋণ মঞ্জুর, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে পরিচালনা পর্ষদের বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ মেলে। এই কেলেঙ্কারিতে ৫৬টি মামলায় ১২০ জনকে আসামী করা হলেও কোথাও নাম নেই বাচ্চুর। স্পষ্টতই প্রশ্ন থেকে যায় এতো বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতা কিভাবে না থাকে। তাতে মামলার তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই মামলার আরও সূক্ষাতিসূক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। আইনের ঊর্ধ্বে কেউই নয়। বাচ্চু কি তবে ধোঁয়া তুলশি পাতা।

তদন্ত প্রতিবেদন ৩ মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে: বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে দায়ের হওয়া ৫৬টি দুর্নীতি মামলার তদন্ত তিন মাসের মধ্যে শেষ করতে না পারলে দুদকের বিরুদ্ধে ‘যথাযথ আইনি পদক্ষেপ’ নেয়া হবে বলে সতর্ক করেছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) এক রায়ের পর্যবেক্ষণে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার ব্যবস্থাপক আসামি মোহাম্মদ আলীর জামিন আবেদন খারিজ করে এই রায় দেয় আদালত। রায়ে আদালত বলেছে, ‘কোনো ধরনের ব্যর্থতা ছাড়া’ তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। তদন্ত শেষ করে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে প্রতিবেদন দিতে হবে হাইকোর্টে। তদন্ত শেষ করতে না পারলে দুর্নীতি দমনের বিরুদ্ধে ‘যথাযথ আইনি পদক্ষেপ’ নেয়া হবে। আদালতে মোহাম্মদ আলীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম আবুল হোসেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী জোবায়দুর রহমান। দুদকের পক্ষে ছিলেন মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।

এখনও ধরা ছোয়ার বাইরে নেপথ্যের হোতারা: ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠে। এরপরই তদন্তে নামে দুদক। ঋণপত্র যাচাই না করে জামানত ছাড়া, জাল দলিলে ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দানসহ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিধি বহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।
প্রায় চার বছর অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৭ ব্যাংকার, ৮২ ঋণগ্রহীতা এবং ১১ জন ভ‚মি জরিপকারীকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। এদের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে আসামি করা হয় ৪৮টি মামলায়। ডিএমডি ফজলুস সোবহান ৪৭টি, কনক কুমার পুরকায়স্থ ২৩টি, মো. সেলিম ৮টি এবং এ. মোনায়েম খান ৩৫টি মামলার আসামি। তবে কোনো মামলায় ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। দুদকের করা ৫৬টি মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলার আসামি কাজী ফখরুল ইসলামকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। ডিএমডি ফজলুস সোবহান বিদেশে পলাতক। আরেক ডিএমডি মোনায়েম খানও ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন ডিএমডি কনক কুমার পুরকায়স্থ এবং মোহাম্মদ আলী। আর জামিনে আছেন, ডিএমডি মোহাম্মদ সেলিম এবং মোহম্মদ সিফাতউল্লাহ। তবে এত বছর পরও শেষ হয়নি দুদকের তদন্ত। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক গণমাধ্যমকে বলেন বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে প্রায় ২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আছে। এর মধ্যে কেবল ১১৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা উদ্ধার হয়েছে। তবে আসামির তালিকায় বাচ্চু বা ব্যাংকটির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের কেউ না থাকায় দুদকের ওই তদন্ত নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য বাচ্চুকে ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০১২ সালে তার নিয়োগ নবায়নও হয়। কিন্তু ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করার পর চাপের মুখে থাকা বাচ্চু পদত্যাগ করেন।
ইউডি/এজেএস

