অর্থনীতির কঠিন সময়

অর্থনীতির কঠিন সময়

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১২:৫০

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুদ হার বেড়ে যাওয়া ও চীনে নতুন করে করোনাভাইরাসের বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এতে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ দেশের অর্থনীতি চলতি বছর মন্দার কবলে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই আমেরিকা, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা ২০২৩ সাল অর্থনীতির জন্য এক কঠিন সময়। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিয়ে সংস্থাগুলো যা বলছে: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৩ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস করবে না। তিন মাস আগেই তারা বলে দিয়েছিল যে নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২২ সালে যা ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ইউরোপীয় দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডির মতে, প্রবৃদ্ধি হবে আরও কম, ২ দশমিক ২ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতি নিশ্চিত করেই মন্দায় ঢুকে যাবে। সাধারণত পরপর দুটি প্রান্তিকে অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলে তাকে মন্দা বলা হয়। আর এর সঙ্গে যুক্ত হবে উচ্চ পণ্যমূল্য ও উচ্চ সুদহার। মূলত, আমেরিকা ও ইউরো অঞ্চলের পরিস্থিতি এ রকমই থাকবে। তবে চীনের প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। কিছুদিন আগেই বিশ্বব্যাংক বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সেই সঙ্গে শ্রমবাজারও বেশ শক্তিশালী। এই বাস্তবতায় ২০২৩ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস করবে না আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ গত জুন মাসেই সংস্থাটি বলেছিল, ২০২৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ শতাংশ। সম্প্রতি আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফের সদর দপ্তরে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, সবচেয়ে ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে শ্রমবাজারে। মানুষের যত দিন কাজ থাকে, তত দিন তারা ব্যয় করবে, এমনকি দ্রব্যমূল্য বেশি থাকলেও। তিনি মনে করেন, অর্থনীতির শ্লথগতি চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে এবং ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে।

বাংলাদেশকে সামনে যত চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধান পাঁচটি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)৷ প্রথমেই আছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি৷ বাকি যে চারটি ঝুঁকি রয়েছে, তা হলো, ঋণসংকট, উচ্চ পণ্যমূল্যের ধাক্কা, মানবসৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি ও সম্পদের জন্য ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা৷ তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২২ সালের প্রথম ভাগের প্রেক্ষাপটে এই জরিপ৷ কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে রিজার্ভ ও ডলার সংকটই বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নাম্বার ঝুঁকি৷ এখন জরিপ হলে এটাই হবে শীর্ষ ঝুঁকি৷ ডব্লিউইএফ-এর ধারণাগত এই জরিপে মোট ৩৫টি ঝুঁকির কথা বলা হয়৷ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হলে তারা ক্রমানুসারে ওই পাাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেন৷ অন্যান্য দেশেও তারা এই জরিপ করেছে৷ তাদেরও শীর্ষ পাঁচটি ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হয়৷ সার্বিক জরিপ থেকে তারা সারা বিশ্বে আগামী দুই বছরের অর্থনৈতিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে৷ জরিপের ফলাফল থেকে তারা বলছে, বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে৷ বাংলাদেশে ডাব্লিউইএফ-এর অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)৷ পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক, অর্থনীতিবিদ ড.আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতিই ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ ঝুঁকি থাকবে, কিন্তু ঝুঁকি মোকাবেলার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নই আসল কথা৷ ইন্ডিয়া যত সক্ষমতার সঙ্গে এটা করছে, আমরা তা পারছি না৷ আমরা চেষ্টাও করিনি৷ মূল্যস্ফীতি, ডলার ক্রাইসিস- এগুলোর জন্য ব্যাংকরেট বাড়ানো দরকার ছিল৷ মূদ্রানীতিকে আমরা ব্যবহার করিনি৷

উত্তরদক্ষিণ ১ম পৃষ্ঠা ১৫ জানুযারি ২০২৩

উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বড় প্রভাব: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৫ দশমিক ২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বৈশ্বিক পরিবেশে যে পরিবর্তন, এতে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছিল এবং এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। লোডশেডিং, কারখানা বন্ধ, যানবাহন কেনা বন্ধ, বিলাসবহুল পণ্য কেনার কঠিন করার মতো উদ্যোগ নিয়ে সরকার জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। জ্বালানির এই ঘাটতির প্রভাব শিল্পসহ নানা খাতেই পড়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পোশাকের ব্যাপক চাহিদা না থাকলে এই ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পেত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুনের শুরু থেকে বাংলাদেশি টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১৮ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৮ বিলিয়ন ডলার কমেছে, যার ফলে ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জুনে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বললেও চলমান অবস্থায় তা কমে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেয় বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি আরও বলেছে, আগের বছরের ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে নেমে তা ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াবে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি আবার বেড়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাবে।

ইউডি/সুপ্ত/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading