নো ম্যানস ল্যান্ডে মায়ের দর্শন, পরে শেষবিদায়
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৬:৪৫
দেশভাগ হয়েছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে। ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে যার যার ভূখণ্ডে স্বকীয়তার স্বার্থে। তবে এপারে-ওপারে রয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন আবেগ। সীমান্তের শূন্যরেখার বাসিন্দাদের এ আবেগ সবচেয়ে বেশি তাড়িত করে।
শূন্যরেখার এপারের সঙ্গে ওপারের বসবাসকারী অনেকের সৃষ্টি হয়েছে পারিবারিক বন্ধন। যে বন্ধন ছিন্ন করা যায় না কাঁটাতার কিংবা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে। তেমন এক সত্তোর্ধ্ব নারীকে মৃত্যুর পর নিয়ে আসা হয় এপারে থাকা সন্তানদের কাছে। মাত্র আধা ঘণ্টার এ দর্শন শুধু ওই বৃদ্ধের পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষকে আবেগতাড়িত করেছে। শত নারী-পুরুষ উপস্থিত হয়ে সিক্ত হয়েছেন চোখের জলে।
শুক্রবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের মুন্সীপুর বিওপি এলাকার সীমান্তের প্রধান পিলার ৯৩-এর কাছে সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণভাবে তার মরদেহ দর্শন করে পরিবার।
পরিবার ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ওই বৃদ্ধের নাম ফজিলা খাতুন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হাটখোলা গ্রামের মৃত আবদারের স্ত্রী। শুক্রবার সকাল ৬টায় মারা যান ফজিলা খাতুন। তার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার পীরপুরকুল্লা গ্রামে। মায়ের মৃত্যুর পর এক নজর দেখতে বিজিবির কাছে আবেদন করেন দুই মেয়ে। পরে বিজিবির পক্ষ থেকে ইন্ডিয়ার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সঙ্গে আলোচনা করে ওই বৃদ্ধার মরদেহ শূন্যরেখায় আনা হয়।
দুই মেয়ে ডালিমুন (৫৫) ও রাবেয়া খাতুন (৫৩) বাংলাদেশের দামুড়হুদা উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন। তাদের দুজনেরই জন্ম ইন্ডিয়ার চাপড়া থানাধীন হাটখোলা গ্রামে।
তিন দশকেরও বেশি সময় আগে ডালিমুনের বিয়ে হয় বাংলাদেশের কুতুবপুর গ্রামের হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। কাছাকাছি সময়ে রাবেয়ার বিয়ে হয় একই গ্রামের মজিবুর রহমানের সঙ্গে। তারা দুজনেই বাংলাদেশের নাগরিক।
নদীয়ার হাটখোলা আর চুয়াডাঙ্গার কুতুবপুর গ্রামের অবস্থান একেবারে পাশাপাশি। মাঝে শুধু কাঁটাতারের বেড়া।
ডালিমুনের স্বামী হাফিজুর জানান, তারা শুক্রবার সকালেই ফজিলা খাতুনের মৃত্যুর খবর পান। জানতে পারেন তার শেষ ইচ্ছার কথা। ডালিমুন ও রাবেয়াও মাকে শেষবারের মতো দেখতে চান।
ফজিলা খাতুনের মেয়ে ডালিমুনের স্বামী হাফিজুর জানান, একসময় তারা খুব সহজেই এপার-ওপার যাতায়াত করতে পারতেন। এখন সীমান্তে কড়াকড়ি বেড়ে যাওয়ায় সেটা আর সম্ভব হয় না। গত দুই বছর ধরে তিনি ইন্ডিয়াতে তার শ্বশুরবাড়িতে যাননি।
তাদের বিয়ের বিষয়ে হাফিজুর বলেন, ‘সেমসময় অন্য রকম পরিবেশ ছিল। এপার-ওপারে খুব আত্মীয়তা চলত। এখনো এটা (বিয়ে) হচ্ছে। তবে কম। এপার-ওপার বিয়েটা এখানকার একটা চল (প্রথা)।’
বিজিবির চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহ মো. ইশতিয়াক জানান, বিষয়টি মানবিক। বিএসএফকে জানানো হলে তারা মানবিক উদ্যোগে সাড়া দেয়। শুক্রবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত মুন্সীপুর সীমান্তের শূন্যরেখায় ওই নারীর মরদেহ শেষ দর্শন করে পরিবার।
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সব ধরনের কার্যক্রম করে বিজিবি ও বিএসএফ। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক উন্নয়নে প্রায় মানবাত্মামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এতে সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে সুসম্পর্ক সাধিত হবে। যা ভবিষ্যতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’
ইউডি/এ

