ইসরায়েলের নতুন ধান্দা: ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩০
প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন এক ‘ধান্দা’য় লিপ্ত হয়েছে ইসরায়েলি নাগরিক তাল হানানের নেতৃত্বাধীন ‘টিম জর্জ’ নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। প্রায় দুই দশক ধরে হ্যাকিংসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিশ্বের প্রায় ৩৩টি দেশে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে তারা। সম্প্রতি দ্য কনসোর্টিয়াম অব জার্নালিস্টের আট মাসের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই দলটির নানা কর্মকান্ড। এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
নির্বাচনের ফলাফল-প্রযুক্তির কারসাজি: প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্যকে অস্ত্র বানিয়ে ‘টিম জর্জ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান দেশে দেশে নির্বাচনকে প্রভাবিত করে চলেছে। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইসরায়েলের নাগরিক তাল হানান। দলটির মূল কৌশল হচ্ছে নির্বাচনে যে দলের পক্ষে তারা কাজ করছেন তাদের প্রতিপক্ষের প্রচার-প্রচারণাকে ভিন্ন পথে ধাবিত করে নাশকতার সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে তারা এআইএমএস নামের একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন, যার দ্বারা ব্যবহারকারীকে ৫ হাজার পর্যন্ত বট তৈরির সুযোগ করে দেয়, যাতে ‘গণবার্তা’ পাঠানো ও ‘অপপ্রচার’ চালানো যায়। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশের ১৭টি নির্বাচনে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে। গোপনে রেকর্ড করা ভিডিও অনুসারে, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা ক্লায়েন্টের ছদ্মবেশে তাল হানান ও তার দলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এসব বৈঠকে হানানের দল কীভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে সে বিষয়ে বিরল স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এআইএমএসের বট-এর তৎপরতা খুঁজতে গিয়ে যায়, বাণিজ্যিক বিতর্ক নিয়ে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, মেক্সিকো, সেনেগাল, ইন্ডিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় ২০টি দেশে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া প্রচার চালানো হচ্ছে বেশি।
দ্য কনসোর্টিয়াম অব জার্নালিস্টের আট মাসের অনুসন্ধানে ‘টিম জর্জ’ নামে ইসরায়েলি দলটির অনৈতিক কাজের নানা দিক বেরিয়ে এসেছে। ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান, ফ্রান্সের লা মঁদে, দেল স্পিগ্যাল, এল প্যারিসসহ বিশ্বের ৩০টি গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে কাজ করেছেন।

টিম জর্জের কারবার-সফলতা ৮১.৮২%: অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের হানান জানান, জিমেইল ও টেলিগ্রাম হ্যাকিংসহ নানা কৌশলে তারা প্রতিপক্ষের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি কাজ করেন ‘জর্জ’ ছদ্মনামে। তিনি আরও বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে জনমত তৈরিতে তারা কাজ করে থাকেন। আফ্রিকা, আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত তাদের নেটওয়ার্ক। এখন আফ্রিকায় একটি নির্বাচন নিয়ে কাজ করছে। গ্রিস ও আরব আমিরাতেও তাদের দল রয়েছে। ৩৩টি নির্বাচনে কাজ করে ২৭টিতে সফল হয়েছে তার দল। হানান বলেন, আমেরিকায় তারা দুটি ‘বড় প্রকল্পে’ জড়িত হয়েছিলেন। তবে মার্কিন রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত হননি। নিজেদের কর্মকাø নিয়ে তিনি বলেছেন, আমি অন্যায় কিছু করছি না। টিম জর্জের সদস্যরা ছদ্মবেশী অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বলেন, নগদ অর্থ, বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ নানাভাবে তারা পারিশ্রমিক নেন। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো কাজে তারা ৬ মিলিয়ন থেকে ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড নিয়ে থাকেন।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র-উভয় ক্ষেত্রে বিপদ: টিম জর্জের পদ্ধতি আর কৌশল প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর তারা নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য প্রচারকারীদের প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ভুয়া তথ্যের বৈশ্বিক বাজার বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জন্যও বড় অশনিসংকেত। টিম জর্জের এই কর্মকাø ফাঁস ইসরায়েলের জন্য বেশ বিব্রতকর হতে পারে। ইতিমধ্যে দেশে দেশে সাইবার-অস্ত্র বিক্রি নিয়ে ক‚টনৈতিকভাবে বেশ চাপের মধ্যে আছে তারা। বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছে তাদের আড়িপাতার প্রযুক্তি। হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক খবরে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার নির্বাচনে টিম জর্জের ভ‚মিকা নিয়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি তদন্তের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালুর আগেও হানান নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করতেন। তিনি আরও বলেন, আমি জানি না, হানান কীভাবে এই অবস্থানে এলেন। তার কোনো গোয়েন্দা অভিজ্ঞতা নেই।
ইউডি/এজেএস

