ফুলপরী আখ্যান: শিক্ষাঙ্গনের লজ্জা ও বিবেকের দায়

ফুলপরী আখ্যান: শিক্ষাঙ্গনের লজ্জা ও বিবেকের দায়

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ । আপডেট ১২:১৫

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রলীগ নেত্রীদের নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফুলপরী খাতুন। এ ঘটনা সারা দেশেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায়িত্ব ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের ওপর প্রশ্ন উঠেছে। এমন ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে সে জন্য সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে বলছেন বিশ্লেষকগণ। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের বিশ্লেষণ

শিক্ষাঙ্গনে এ কেমন অরাজকতা: সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে কী ধরণের পরিবেশ বিরাজ করছে, তারই যেন এক প্রতিফলন ঘটেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এবারই প্রথম নয়, অতীতেও এ ধরণের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার ফলে এই ধরণের অন্যায়-অত্যাচার-নীপিড়ন বন্ধ হয়নি। অবস্থা এমন জায়গায় চলে গেছে যে রাজনৈতিক সংগঠনের পদের অপব্যবহার করে কেউ কেউ নির্যাতন করতেও দ্বিধাবোধ করছেন না। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়ানোর মতো নৈতিক ক্ষমতা যেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হারিয়ে ফেলেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে নির্যাতনের শিকার প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফুলপরী খাতুন হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করেও সাহস নিয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অত্যাচারের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর পরেই নড়েচড়ে বসে, গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। হাইকোর্টের নির্দেশেও গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। যারা বুধবার (২২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রম চালু রেখেছেন। ইতোমধ্যেই অভিযুক্ত দুই ছাত্রলীগ নেত্রী ও ভুক্তভোগী ছাত্রী ফুরপরী নিজেদের বক্তব্য কমিটির কাছে পেশ করেছেন। আবাসিক হলে এ ধরণের সমস্যাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নেয়ার বিষয়ে প্রশাসন কখনও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এবারও সাময়িক তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমেই যদি এই ঘটনার সমাপ্তি ঘটে তবে হতাশই হতে হবে বলছেন বিশ্লেষকগণ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দেন তারা, যেনস পরবর্তীতে এই ধরণের ঘৃণিত অপকর্ম কখনই কোনো শিক্ষার্থীকে ফেস করতে না হয়।

বাবা-মায়ের প্রশ্ন: ‘বিচার পাবো তো?’: ই ঘটনায় এখনও আতঙ্ক কাটছে না নির্যাতনের শিকার ছাত্রী ফুলপরীর। তিনি বলেন, ক্যাম্পাস নিয়ে যখন নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করি, তখনই এমন আঘাত আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। ফুলপরী বলেন, আমি সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা চাই। কেউ যেন আমার মতো হয়রানির শিকার না হয়। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন, যেন আর কেউ এ ধরনের নোংরা ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়। এদিকে, কঠিন সংগ্রাম করে সংসারের অভাব অনটনের মধ্যে ছেলেমেয়েদের বড় করছেন ফুলপরীর ভ্যানচালক বাবা আতাউর রহমান ও তার মা তাসলিমা খাতুন। তাদের ভাষ্য, আমরা কষ্ট করেছি, কিন্তু ছেলেমেয়েরা যাতে কষ্ট না করে, সে জন্য তাদের লেখাপড়া শেখানো। ফুরপরীর বাবা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা সৎ ও সত্যের পথে চলব, অন্যায় করলে প্রতিবাদ করব। এ জন্যই ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছি। তার মা তাসলিমা খাতুন বলে উঠলেন, ‘আমরা বিচার পাব তো?’

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। প্রথম পৃষ্ঠা

ছাত্রলীগের কঠোর ভূমিকার বিকল্প নেই: রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অপকর্ম ঘটানো বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের দাপটে ভীত-স্বন্তস্ত্র থাকতে হয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের। শুধু যে বর্তমান সময়ের ছাত্রলীগ যে এই রীতি শুরু করেছে তা নয়, অতীতে ছাত্রদলসহ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংহঠনগুলো একই ধরণের অপকর্মে যুক্ত ছিলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, অপরাধী যেই হোক, সে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমবে; যেমনটা হয়েছে, অ্যাসিড-সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাতেও উদাহরণ তৈরি করবে এটাই প্রত্যাশা। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগের কেন্দ্র থেকেই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা। সংগঠনটির ঐতিহ্য-নীতি-আদর্শের যেন ব্যত্যয় না ঘটে এবং দীর্ঘদিনের এই সংগঠনটি যেন সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা না হারায় তার ওপর দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান তারা। এদিকে, অভিযুক্ত নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে জোরালোভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের র্যাগিংও হয়রানি করা ছাত্রলীগ কখনোই সমর্থন করে না। আমরা শিক্ষার্থীদের সুখ-দুঃখে সাথী হতে চাই। এ ঘটনায় ইবি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ইবি ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাত বলেন, ঘটনা যদি সত্য হয় এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে আমরা প্রশাসনের কাছে তার শাস্তির দাবি জানাবো। আমরা সাংগঠনিকভাবেও ব্যবস্থা নেব।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading