তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের রুদ্ধশ্বাস সামরিক মহড়া
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১২ এপ্রিল ২০২৩ । আপডেট ১৬:৪৫
তাইওয়ানকে ঘিরে তিন দিনের সামরিক মহড়া শেষ হওয়ার পরও চীনের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় অবস্থান করছে। এই উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকা। তারা ফিলিপাইনের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। সম্ভাব্য সংঘর্ষ নিয়ে উদ্বিগ্ন জাপানও, এই ইস্যুতে ঘি ঢেলে তোপের মুখে পড়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধনের প্রতিবেদন
যুদ্ধজাহাজ- যুদ্ধবিমান নিয়ে চীনের ‘জয়েন্ট সোর্ড’: তাইওয়ানকে ঘিরে চীন গত সোমবার রাতে তাদের তিন দিনব্যাপী সামরিক মহড়া শেষ করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) চীনের নয়টি যুদ্ধজাহাজ ও জে-১৬ এবং এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমানসহ ২৬টি আকাশযান যুদ্ধ জন্য প্রস্তুত অবস্থায় তাদের দ্বীপের চারপাশে টহল দিয়েছে। মহড়ায় ডজন ডজন যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমান পাঠিয়ে চীন নির্ভুল আক্রমণ ও তাইওয়ানকে অবরোধ করার অনুশীলন করে চীন। গত সোমবার এই অভিযানে দ্বীপটির চারপাশ দিয়ে চীনের ৯১টি সামরিক আকাশযান উড়ে গিয়েছে বলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাইওয়ানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিএনএ জানিয়েছে, এটি একটি রেকর্ড। রয়টার্স বলছে, মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থির সাথে লস অ্যাঞ্জেলেসে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট সাই তাইপেই ফিরে আসার পর গত শনিবার থেকে এই সামরিক মহড়া শুরু করে চীন। তিন দিনের এ মহড়ার নাম দেওয়া হয় ‘জয়েন্ট সোর্ড’ বা যৌথ তরবারি। সামরিক মহড়া নিয়ে চীনের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা সফলভাবে সামরিক মহড়া শেষ করেছে। মহড়ায় প্রকৃত যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিভিন্ন বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
চীনের আচরণ দায়িত্বজ্ঞানহীন, উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ইন্ধন দেবে না তাইওয়ান: বেইজিংয়ের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আচরণের সমালোচনা করেছেন স্বাশাসিত দ্বীপটির প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েন। নিজের ফেসবুক পেজে সাই লিখেন, (প্রেসিডেন্ট হিসেবে) আমি বিশ্বে আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করি। তাই আমেরিকায় যাত্রাবিরতিসহ বিদেশে তার সফর নতুন কিছু নয় এবং তাইওয়ানের জনগণ এটিই আশা করে। তিনি আরও লিখেন, চীন এটিকে সামরিক মহড়া শুরু করার জন্য ব্যবহার করে তাইওয়ান ও অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। এটি এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের জন্য দায়িত্বশীল আচরণ না। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানায়, তাইওয়ানের বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী ও উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্রুরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। তাইওয়ান সরকার বারংবার চীনের এ মহড়ার নিন্দা জানালেও বলেছে, তারা উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ইন্ধন দেওয়ার মতো কোনো কিছু করবে না। তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে আমেরিকা-সহ পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। তাইওয়ান পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ, যা তাইওয়ান প্রণালীর পূর্বে চীনা মূল ভূখøের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। অবশ্য তাইওয়ানকে বরাবরই নিজেদের একটি প্রদেশ বলে মনে করে থাকে বেইজিং। অন্যদিকে চীনের প্রদেশ নয়, বরং নিজেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে মনে করে থাকে তাইওয়ান। তাইওয়ানের ভাষ্য, দেশের ভবিষ্যৎ তার জনগণের হাতেই থাকবে। তবে তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখøের সঙ্গে যুক্ত করতে বেইজিংয়ের চেষ্টার কমতি নেই।
তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো চেষ্টা রুখে দিবে চীন: তাইওয়ান ঘিরে চীনের তিন দিনব্যাপী সামরিক মহড়া সফল বলে দাবি করেছে চীনের সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে মহড়ায় প্রকৃত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশটির বিভিন্ন বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই করে দেখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বেইজিং। দেশটির সেনাবাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এক বিবৃতিতে বলেছে, চীনের সেনা সদস্যরা লড়াইয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত। আর বিচ্ছিন্নতাবাদ বা বিদেশি হস্তক্ষেপÍযেভাবেই তাইওয়ানের স্বাধীনতার চেষ্টা করা হোক না কেন, তা তাঁরা যেকোনো সময় রুখে দেবেন। এর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, তাইওয়ানকে বহু দিক থেকে ঘিরে ফেলে অবরোধ সৃষ্টির মতো অবস্থা তৈরি করতে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এইচ-৬ বোমারু বিমান ও যুদ্ধজাহাজ মহড়া দিয়েছে। মহড়ার সময় বোমারু বিমানগুলোতে সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা ছিল। মহড়ায় চীনের শানডং রণতরিও অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড। গত সপ্তাহ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে রণতরিটির ওপর নজরদারি করছে তাইপে। প্রসঙ্গত, ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করার পর তাইওয়ান দেশটির মূল ভূখø থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদিও তাইওয়ানকে বরাবরই নিজেদের একটি প্রদেশ বলে মনে করে থাকে বেইজিং। এরপর থেকে তাইওয়ান নিজস্ব সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।
চীন-তাইওয়ান ইস্যু জাপানেরও দুশ্চিন্তার বড় কারণ: চীনের সর্বশেষ সামরিক মহড়া জাপানেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে৷ বিশেষ করে সে দেশের দক্ষিণের দ্বীপগুলি তাইওয়ানের কাছে থাকায় সম্ভাব্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে৷ ওকিনাওয়া দ্বীপে মার্কিন বিমানবাহিনীর বিশাল ঘাঁটি রয়েছে৷ গত বছর আগস্ট মাসে তৎকালীন মার্কিন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের সময় চীন যে সামরিক মহড়া চালিয়েছিল, সে সময়ে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকার গøির মধ্যে পড়ে৷ এদিকে গত রবিবার জাপানের ওকিনাওয়ান দ্বীপপুঞ্জের কাছে রণতরি শানডং মহড়া চালিয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত রণতরিটি থেকে ১২০ বার যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ওঠানামা করেছে। এ ছাড়া একটি চীনা নৌযান জাপানের মিয়াকো দ্বীপের ২৩০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে। গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করা হবে বলে চীন খোলাখুলিভাবে জানিয়ে রেখেছে। তাইওয়ানকে নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ মনে করে বেইজিং। তবে তাইওয়ানের সরকার জোরালোভাবে চীনের দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
ফিলিপাইনের সঙ্গে যৌথ মহড়া দিয়ে আমেরিকার পাল্টা বার্তা: আমেরিকান প্রশাসনও তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের কড়া মনোভাবের প্রেক্ষাপটে হাত গুটিয়ে বসে নেই৷ মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) সে দেশ ফিলিপাইনের সঙ্গে সবচেয়ে বড় সামরিক মহড়া শুরু করেছে৷ প্রায় ১৮,০০০ সৈন্য বাৎসরিক এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে৷ অস্ট্রেলিয়ার ১০০ সৈন্যও তাতে যোগ দিচ্ছে৷ এর আওতায় এই প্রথম দক্ষিণ চীন সাগরেও ‘লাইভ ফায়ার ড্রিল’ চালানো হচ্ছে৷ তাইওয়ান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে ফিলিপাইনের লুজোন দ্বীপেও হেলিকপ্টার দিয়ে মহড়া চালানো হচ্ছে৷ সে দেশের প্রেসিডেন্ট হবার পর ফার্দিনান্দ মার্কোস আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তার আওতায় এমন মহড়া বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে৷ গত কয়েক মাসে দুই দেশ আবার যৌথভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে টহলেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ ফিলিপাইন্সে আমেরিকার স্থায়ী সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হচ্ছে৷ চীন এমন সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে৷ এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ম্যানিলার সাথে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি করে ওয়াশিংটন। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জলসীমার কাছাকাছি অবস্থিত ফিলিপাইনের দ্বীপগুলোতে চারটি নতুন নৌ ঘাঁটি স্থাপন করা হবে। বিবিসি বলছে, ফিলিপাইনের চারপাশে ও দক্ষিণ চীন সাগরের জলপথে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বাণিজ্য পথ রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলটি চীনের বিতর্কিত দাবির বিষয় হয়ে উঠেছে। অবশ্য এই অঞ্চলের এক ডজন দেশও বালিকাটান সামরিক মহড়ায় অংশ নেবে। এই মহড়া আগামী ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।

আমেরিকা ও চীনের নীতি নিয়ে তোপের মুখে ম্যাক্রোঁ: তাইওয়ান প্রসঙ্গে আমেরিকা ও চীনের নীতির বাইরে গিয়ে ইউরোপকে স্বাধীন অবস্থান নিতে বলায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এমন মন্তব্যের মাধ্যমে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক মহড়াকে হালকাভাবে দেখার অভিযোগ করছেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতারা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, তাইওয়ান নিয়ে সংকটের তীব্রতা বাড়াতে আগ্রহ নেই ইউরোপের। ব্লকটির উচিত আমেরিকা ও চীনের নীতির বাইরে গিয়ে তাইওয়ান ইস্যুতে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ করা। জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেস্ট্যাগের পররাষ্ট্র কমিটির এমপি নরবার্ট রোয়েটজেন এক টুইট বার্তায় বলেন, বেইজিং সফরকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য একটি জনসংযোগ অভ্যুত্থান এবং ইউরোপের বৈদেশিক নীতির বিপর্যয়ে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন ম্যাক্রোঁ। তিনি আরও বলেন, ইউরোপ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তাইওয়ান ইস্যুতে চীন ও পশ্চিমাদের মধ্যে বরাবরই বিরাজ করছে উত্তাপ। চীন এই ভূখন্ডটিকে দেশের মূল ভূখøের সঙ্গে যুক্ত করতে কার্যত আগ্রাসী মনোভাব পোষণ করছে, অন্যদিকে বেইজিংয়ের আগ্রাসন থেকে তাইওয়ানকে রক্ষায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে আমেরিকা। এ বিষয়ে চীন সফরের সময় ফরাসি সংবাদপত্র লেস ইকোস এবং পলিটিকোতে কথা বলেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তার এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে চলমান সংঘাতকে ত্বরান্বিত করা উচিত নয় ইউরোপের এবং চীন ও আমেরিকার মধ্যে তৃতীয় একটি পক্ষ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরিতে ইউরোপের সময় নেওয়া উচিত। পলিটিকো ফরাসি প্রেসিডেন্টকে উদ্ধৃত করে বলেছে, সবচেয়ে খারাপ জিনিস এটি মনে করা হবে যে, ইউরোপীয়দের অবশ্যই তাইওয়ান বিষয়ে (মার্কিন বা চীনা নীতির) অনুসারী হতে হবে এবং আমেরিকান ছন্দ বা চীনা অত্যধিক প্রতিক্রিয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। দু’টি মিডিয়া আউটলেটই ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে উদ্ধৃত করে বলেছে, ইউরোপকে অবশ্যই তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও ভালোভাবে অর্থায়ন করতে হবে, পারমাণবিক ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির বিকাশ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা সীমিত করতে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

