বঙ্গবন্ধুর পরিবার থেকে বাড়তি সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করেননি ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া

বঙ্গবন্ধুর পরিবার থেকে বাড়তি সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করেননি ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৯ মে ২০২৩ । আপডেট ১০:৩০

বাংলাদেশের কলঙ্কিত এক অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের যখন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তখন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাই ছিলেন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কাছে। বিদেশের মাটিতেও যখন শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে খুনিরা, তখন দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে থেকেছেন ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৭৫ সালের দুঃসহ ও মর্মান্তিক ঘটনার পর তিনি শেখ হাসিনা ও রেহানাকে অভয় ও আশ্রয় দিয়েছেন পরম যত্নে। তখন তাদের জীবন ছিল বিপন্ন। মাস্টার রোলে চাকরি করে তিনি জীবনযাপন করেছেন এবং কারো করুণা নিয়ে বেঁচে থাকেননি। আজ (৯ মে) তার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

সারাবিশ্বে বাংলাদেশ বিজ্ঞান সমৃদ্ধ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত হবে এমন স্বপ্ন দেখতেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। বাংলাদেশ যে পরমাণু শক্তির জগতে প্রবেশ করছে, এ ক্ষেত্রেও দেশে পরমাণু বিষয়ক গবেষণা ও শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন তিনি। তার সেই অবদানের কল্যাণেই আজ দেশে নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

বর্ণাঢ্য শিক্ষা ও কর্মময় জীবনের অধিকারী ড. ওয়াজেদ মিয়া তার সমগ্র জীবনে মেধা, মনন ও অত্যন্ত সৃজনশীলতা দিয়ে দেশ, জাতি ও জনগণের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ক্ষমতার অনেক কাছাকাছি থেকেও খুব সাদামাটা এক জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার পাশে বিপদের সময় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করলেও কখনো বঙ্গবন্ধু পরিবার থেকে বাড়তি সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করেননি তিনি। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এই মানুষটির মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করে কথা বলেছেন সহকর্মী পরমাণু বিজ্ঞানীরা।

কাজের প্রতি তার ছিল অগাধ প্রেম ও ভালোবাসা, সব সময় নতুন কোন কিছু উদ্ভাবন করার চিন্তায় বিভোর থাকতেন তিনি। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মজীবন নিয়ে তার সহকর্মী পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছি। এই কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, তিনি একজন সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষ। তিনি নতুন কোন কিছু তৈরি করে আনন্দ পেতেন। আর তার কাজের বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝার জন্য এবং ঠিকঠাক করার জন্য তিনি আমাকে অনেক বেশি পছন্দ করতেন।

প্রথিতযশা এই পরমাণু বিজ্ঞানী অত্যান্ত মেধাবী ও কাজ পাগল মানুষ ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একবার তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। সবাই তার সঙ্গে দেখা করতে গেছে। আমি যাইনি। আমি আগে থেকেই জানতাম হাসপাতালে গেলে তিনি কাজের কথা আলোচনা করবেন। পরে ঠিকই তিনি আমাকে হাসপাতালে ডাকলেন এবং অসুস্থ্য অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে আবার সেই কাজের আলোচনা শুরু করলেন। তার এমন কর্মকাণ্ড দেখে আমার মনে হয়, তিনি অফিস থেকে বাড়িতে গেলে বা যেখানেই থাকতেন তার কাজকর্ম নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা করতেন। তার উদ্যোগেই আগারগাঁও পরমাণু শক্তি কমিশন এবং সাভারে প্রায় তিনশ একর জমির উপর পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের নিভৃত পল্লী গ্রামে জন্ম নেয়া পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশকে বিজ্ঞান সমৃদ্ধ একটি দেশ গড়ার জন্য নিভৃতেই কাজ করে গেছেন। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার স্বপ্ন ও কাজের পরিধী সম্পর্কে তার সহকর্মী সাবেক পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান পরমাণু শক্তি কর্তৃপক্ষের সদস্য ড. আজিজুল হক বলেন, আমি দশ বছর ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি অত্যতান্ত মেধাবী মানুষ ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপিত হবে। বেঁচে থাকতে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে না যেতে পারলেও তার স্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিদ্যু কেন্দ্র আজ বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে।

ক্ষমতার অনেক কাছাকাছি থেকেও তিনি সব সময় নিয়ম শৃংঙ্খলার মধ্যেই থাকতেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ১৯৭৪ সালে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া জার্মানীর কাছ থেকে একটি পোস্ট ডক্টর ফেলোশিপ লাভ করে। সেখানে যাওয়ার জন্য তখনকার পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে ছুটির আবেদন করেন। কিন্তু সেই সময় চেয়ারম্যান তার ছুটি বাতিল করায় ১৯৭৪ সালে তিনি জার্মানিতে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর জামাতা হয়েও তিনি কোনদিন নিয়ম শৃঙ্খলার বাহিরে কোন কাজ করেননি।

নোবেল বিজয়ী প্রফেসর আব্দুস সালামের সঙ্গেও গবেষণা করেছেন ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তার কাজ নিয়ে পরমাণু শক্তি কমিশন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এফ এম মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে বিজ্ঞান সমৃদ্ধ একটি দেশ তৈরির জন্য পরমানু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া যে মাস্টার প্লান দিয়ে গেছেন সে অনুযায়ী যুগ উপযোগী কাজ করলেই বাংলাদেশকে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ১৯৫৬ সালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শেণিতে দ্বিতীয় স্থান এবং ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরিতে যোগ দেন। প্রথিতযশা এই পরমাণু বিজ্ঞানী কর্মজীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাকর্ম করে।

১৯৬৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি আমেরিকার ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ইতালির ট্রিয়েস্টস’ আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থ কেন্দ্রেও গবেষণা করেন তিনি।

১৯৭২ সালে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া দেশে আনবিক শক্তি কমিশন গঠনের জন্য তখনকার আনবিক শক্তি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ড. আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জোর অনুরোধ করেন। তার অনুরোধের কারণেই পরবর্তী ১৯৭৩ সালে মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশন গঠিত হয়। ড.এম এ ওয়াজেদ মিয়া দেশের অভ্যন্তরে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কমানোর জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ (পানিবিনি) বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণামুলক লেখার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী স্বীকৃতি অর্জন করায় ১৯৯৭ সালে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে বাংলাদেশ সরকার পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন এবং তিনি কমিশনের পঞ্চম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া নিরবে, নিভৃতে নিরলসভাবে গবেষণায় থেকে দেশের উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। স্নাতক পর্যায়ের বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য Fundamentals of Thermodynamics এবং Fundamentals of Electromagnatics দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তার দেখানো পথেই বিজ্ঞানের ছোঁয়া পেয়েছে বাংলাদেশ।

ইউডি/এ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading