ঋণ-খেলাপির ঝুঁকিতে আমেরিকা!

ঋণ-খেলাপির ঝুঁকিতে আমেরিকা!

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২০ মে ২০২৩ । আপডেট ১২:৫৫

বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ আমেরিকা ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। আইন অনুযায়ী দেশটির সরকারের ঋণ করার সর্বোচ্চ যে সীমা তা গত জানুয়ারি মাসেই স্পর্শ করার ফলে তৈরি হয়েছে বড় সংকট। আগামী পহেলা জুনের মধ্যে যদি ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো না হয় তবে শুধু আমেরিকাই নয় বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই এক মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ। এ নিয়ে বিনয় দাস’র প্রতিবেদন

আলোচনায় ডেট সিলিং, ডেটলাইন পহেলা জুন

আমেরিকায় আইন করে নির্দিষ্ট করা আছে, সরকার সর্বোচ্চ কী পরিমাণ অর্থ ধার করতে পারবে। দেশটির সরকারের ঋণ করার সর্বোচ্চ সীমা (ডেট সিলিং) বর্তমানে বেঁধে দেয়া আছে ৩১ দশমিক চার ট্রিলিয়ন ডলারে। মার্কিন সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে গত কয়েক দশক ধরে এই ডেট সিলিং বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসেই আমেরিকায় সরকারি ঋণ এই সীমায় পৌঁছে যায়। বর্তমানে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে সরকারকে বাড়তি অর্থ জোগান দিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকায় ডেট সিলিং এর বিষয়টি প্রথম চালু করা হয় ১৯১৭ সালে। তখন এর লক্ষ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকারকে অর্থ ধার করার জন্য অনেক বেশি সুযোগ দেয়া। কিন্তু দেশটির সরকারের ব্যয়ের বড় খাতগুলো হচ্ছে ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামরিক ব্যয়, সোশ্যাল সিকিউরিটি, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি।

জো বাইডেন

এর সঙ্গে আছে সরকারের জাতীয় ঋণের কিস্তি এবং এর সুদ পরিশোধ এবং ট্যাক্স রিফান্ড ইত্যাদি। কিন্তু সা¤প্রতিক দশকগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়ে উঠার পর ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নিয়ে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে মারাত্মক বিভেদ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সরকারের ঋণের পরিমাণও বাড়ছে, গত এক দশকে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমেরিকার সরকারের জন্য ঋণের যে সর্বোচ্চ সীমা (ডেট সিলিং) বেঁধে দেয়া আছে, সেটি আরও বাড়ানো হবে কিনা- তা নিয়ে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান- দু’পক্ষই স্ব স্ব অবস্থানে অনড়। যদি এই অচলাবস্থার কোন সমাধান না হয়, তাহলে এর জন্য বিশ্ব অর্থনীতিকে হয়তো এ যাবতকালের সবচেয়ে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।

ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিক দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?

ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা যদি সরকারকে আরও অর্থ ধার করতে দিতে রাজী না হয়, বা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা (ডেট সিলিং) না বাড়ায়, তাহলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশ তাদের ৩১ দশমিক চার ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঋণ খেলাপি হবে। আমেরিকায় সাধারণত রিপাবলিকানরা ছোট আকারের সরকারের পক্ষে, তারা সরকারী ব্যয় টেনে ধরার পক্ষপাতী। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা জনকল্যাণমূলক খাতে বেশি ব্যয়ের পক্ষপাতী। কাজেই যখন কোন সরকার এরকম ঋণের সর্বোচ্চ সীমা আরও বাড়ানোর বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে, তখন দ্ইু পক্ষই এই বিষয়টিকে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১১ সালে ঋণের সীমা নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নিরসন তখনই হয়েছিল, যখন প্রেসিডেন্ট ওবামা সরকারী ব্যয় নয়শো বিলিয়ন ডলার কমাতে রাজী হয়েছিলেন। তখন কংগ্রেস সরকারী ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ঠিক সেই পরিমাণে বাড়িয়েছিলএবারও কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা একইভাবে সরকারের ব্যয় কমানোর দাবি জানাচ্ছে, আর ডেমোক্র্যাটরা তাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানদের প্রতিক

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে একটি জরুরি বৈঠকের পর উভয় পক্ষই মার্কিন ঋণের সীমা বাড়ানোর জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছেন বলে বার্তা সংস্থার খবর। কিন্তু বাইডেন বলেছিলেন, এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। তিনি জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের পর অস্ট্রেলিয়া এবং পাপুয়া নিউ গিনিতে তার পরিকল্পিত সফর বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রয়টার্সের খবর থেকে জানা গেছে, হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায় যে, বৈঠকে সুষ্ঠু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং দু’পক্ষ আন্তরিকভাবে মতবিনিময় করেছে। বৈঠকের পর প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার কেভিন ম্যাককার্থি গণমাধ্যমকে বলেন, ঋণের সীমা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের অনেক মতভেদ আছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই সপ্তাহ শেষ হবার আগেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হবে না। রিপাবলিকানরা বেতনের চ্যানেল বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে চান না, এতে বাইডেন হতাশা প্রকাশ করেছেন। কারণ, সাধারণ মার্কিনদের সাহায্য করার জন্য ধনীদের ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর শুল্ক বাড়ানো- বাইডেনের ২০২৪ সালের বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমেরিকানরা কতটা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে?

আমেরিকার অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়ালেন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি সরকার আরও অর্থ ধার করতে না পারে, তাহলে পহেলা জুনের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে য, সরকার হয়তো আর তার ধার-দেনা-দায় পরিশোধ করতে পারবে না। ইয়েলেন আরও বলেন, এর আগে ঋণের সীমা বাড়াতে হবে বা ঋণগ্রহিতা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা স্থগিত করতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।তিনি বলেন, শেষ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করলে ব্যবসার ক্ষতি হয়, ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট হয়, করাদাতাদের ঋণ নেওয়া কষ্টকর হয় এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের ঋণমানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

জ্যানেট ইয়ালেন

ঋণসীমা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা কয়েক মাস স্থবির থাকার পর ট্রেজারি সেক্রেটারি এই সতর্কবার্তা দেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি আমেরিকা সরকারের ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো না হয়, তখন সরকার আর নতুন করে অর্থ ধার করতে পারবে না। এর ফলে দ্রুত সরকারের হাতে অর্থ ফুরিয়ে যাবে, জনগণকে যেসব সুযোগ-সুবিধা-সেবা দিতে হয়, সেগুলোও অব্যাহত রাখতে পারবে না। সরকার বাধ্য হবে জনগণকে কল্যাণ ভাতা এবং যেসব অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেয়, যে সাহায্য দেয়, তা বন্ধ করতে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে, মানুষ তাদের ব্যয় মেটাতে পারবে না। আর পরিণামে মার্কিন অর্থনীতিতে এর ধাক্কা লাগবে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কতটা শঙ্কার, বিশ্লেষকরা কী বলছেন?

আমেরিকার সরকার ঋণ-খেলাপি হলে এর কী প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে? বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই এক মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্বের সাধারণ মানুষের ওপরই বা কী প্রভাব পড়বে? ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, এর পরিণতি হবে মারাত্মক বিধ্বংসী। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেয়া বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আমেরিকা যতই সংকটে পড়–ক না কেনো তারা ঋণ-খেলাপি হবে না। কিন্তু যদি আমেরিকা ঋণ-খেলাপি হয়েই যায় সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি কেমন হবে? এমন প্রশ্নে ‘প্যানমিউর গর্ডনের’ প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইমন ফ্রেঞ্চ বিবিসিকে বলেন, যদি এরকম কিছু আসলেই ঘটে, তখন এই বিপর্যয়ের কাছে ২০০৮ সালের বিশ্ব ব্যাংকিং এবং আর্থিক সংকটকে অতি সামান্য বিষয় বলে মনে হবে। ব্রিটেনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইন্স কলেজের প্রেসিডেন্ট এবং নামকরা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আল-এরিয়ান বলেন, আমেরিকা যদি ঋণ-খেলাপি হয়, তখন পুরো মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে বাকী বিশ্বে। যেমন ব্রিটেনে, যারা আমেরিকার সঙ্গে বিপুল ব্যবসা-বাণিজ্য করে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২০ মে ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

মন্দায় পড়লে তারা বাকী বিশ্ব থেকে জিনিসপত্রও কিনবে অনেক কম। তবে তিনি মনে করেন না, মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে সেটি ব্রিটিশ অর্থনীতিকেও থমকে দেবে। তার মতে, মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা মানে হচ্ছে ব্রিটিশ অর্থনীতিও নিশ্চিতভাবেই মন্দায় পড়বে।শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যেই মন্দা নয়, এর প্রভাব পড়বে বাড়ি কেনার ঋণ হতে শুরু করে আরও অনেক কিছুর ওপর। ব্রিটেনে এর ফলে বাড়ি কেনার ঋণের খরচ বেড়ে যাবে, বাড়বে বেকারত্ব। এটি হবে রীতিমত এক প্রলয়-কাø। যখন কোন সরকার অর্থ ধার করতে চায়, তারা বন্ড বিক্রি করে। আমেরিকায় এই বন্ডের নাম ‘ট্রেজারি বন্ড’, আর ব্রিটেনে এরকম বন্ডকে বলা হয়, ‘গিল্ট’। একজন বিনিয়োগকারী যখন সরকারের কাছ থেকে এরকম বন্ড বা গিল্ট কেনেন, তখন তিনি বিনিয়োগ করা অর্থের জন্য সরকারের কাছ থেকে সুদ পান। কিন্তু যদি আমেরিকা সরকার তার ঋণ পরিশোধ না করে বা এমনকি সুদের অর্থও পরিশোধ না করে, তখন বিনিয়োগকারীরা ভাববে, যদি আমেরিকা সরকার ঋণ-খেলাপি হতে পারে, তাহলে ব্রিটেনের সরকারও যে হবে না, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তখন বিনিয়োগকারীরা ব্রিটেনে সরকারী বন্ড কেনার জন্য আরও বেশি সুদ দাবি করবে। যে কোন ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয় এই ঋণ দেয়ার ঝুঁকি কতটা তার উপর ভিত্তি করে, সেটি বাড়ি কেনার জন্য দেয়া ঋণই হোক, বা সরকারের ধার করা ঋণই হোক। আমেরিকার সরকার ঋণ-খেলাপি হলে সারা বিশ্বেই এর প্রভাব পড়বে, বাড়ি কেনার ঋণের জন্য সুদের হারও বেড়ে যাবে অনেক দেশে।মার্কিন ডলার হচ্ছে গোটা বিশ্বের জন্য রিজার্ভ মুদ্রা। এর মানে হচ্ছে, সারা বিশ্বে যত ধরণের পণ্যের লেনদেন হয়, যেমন জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে গম-সবকিছুর দাম কিন্তু নির্ধারিত হয় ডলারে। যদি আমেরিকার সরকার ঋণ খেলাপি হয়, সাথে সাথে ডলারের দাম নাটকীয়ভাবে পড়ে যাবে। মনে হতে পারে, এটা তো বাকী বিশ্বের জন্য ভালো খবর। কিন্তু বিশ্লেষক ফ্রেঞ্চ বলছেন, এর মানে হচ্ছে, যারা বিশ্বে পণ্যের বাজারে বিনিয়োগ করে, তারা তখন জানবে না, কীভাবে তাদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। যখন আমেরিকার সরকার এভাবে ঋণ-খেলাপি হবে, তখন কিন্তু হঠাৎ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করবে, এরপর কি জাপান? ব্রিটেনেও কি একই ঘটনা ঘটবে? তারপর কি জার্মানি? তখন হঠাৎ সবকিছুর দাম নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থনীতির পরিভাষায়, এর নাম ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’, অর্থাৎ বাড়তি ঝুঁকি। তখন সব কিছুর দামের মধ্যে এই বাড়তি ঝুঁকির খরচ যুক্ত হবে। কাজেই রুটির দাম পর্যন্ত বেড়ে যাবে। বিশ্বের শেয়ার বাজারের ৬০ শতাংশ কিন্তু আমেরিকার হাতে, কাজেই পেনশন তহবিলের যে অর্থ মার্কিন শেয়ারে বিনিয়োগ করা আছে, সেগুলো কিন্তু ঝুঁকিতে পড়বে। আর যুক্তরাষ্ট্র ঋণ-খেলাপি হলে শেয়ার বাজারে তার বাজে প্রতিক্রিয়া হবেই। ২০১১ সালেও ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নিয়ে এরকম অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন, সেই অচলাবস্থার নিরসন হয়েছিল ঋণ-খেলাপি হওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। তখন মার্কিন শেয়ার বাজারে ধস নেমেছিল। তবে এই আতংক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, নাটকীয়ভাবে পড়ে যাওয়া শেয়ার বাজার আবার পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading