আজমত-জায়েদা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী: তবুও লড়াই যেন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০২৩ । আপডেট ১৪:০৫
গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) নির্বাচন আজ। আজই নির্ধারণ হবে কে হচ্ছেন এই সিটির নগরপিতা। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন। তবে ভোটের মাঠে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুখোমুখি হচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. আজমত উল্লা খান এবং সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন। বিশ্লেষকগণ বলছেন, আজমত উল্লা’র বিপরীতে মূল লড়াইটা মূলত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
বহুল আলোচিত গাজীপুর সিটিতে ভোট আজ: গাজীপুর সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর এ নিয়ে তৃতীয়বার নির্বাচন হচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ চলবে। প্রায় ১২ লাখ ভোটারের গাজীপুর সিটি করপোরেশন আয়তনের দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি। এই সিটির ভোট দিয়েই নির্বাচন কমিশনের কঠিন পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খানের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সাবেক মেয়র এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুনের। মূলত জাহাঙ্গীর আলমই মায়ের হয়ে মাঠে লড়ছেন। আজমত উল্লা খান ও জাহাঙ্গীর আলম রাজনীতিতে একই ঘরানার হওয়ায় তাদের নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে কিছুটা হলেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। এ নির্বাচনে আজমত উল্লা খান দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’ এবং জাহাঙ্গীরের মা জায়েদা খাতুন ‘টেবিল ঘড়ি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি নির্বাচনকে অনেকে ইসি’র জন্য এসিড টেস্ট হিসেবে দেখছেন। নির্বাচন কমিশনও বলেছে, সিটির ভোট সুষ্ঠু করে তারা পরীক্ষা দিতে চায়। যদিও গাজীপুরসহ অন্য সিটির ভোটে প্রধান বিরোধী জোট বিএনপি ও সমমনা দল অংশ নিচ্ছে না। এ কারণে ভোটের মাঠে বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে না। দৃশ্যত বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলেও এ সিটির ভোট আসছে জাতীয় নির্বাচনের জন্য বড় বার্তা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ সিটির ভোটকে বিরোধী দলগুলোকে নতুন ইস্যু হিসেবে নিতে পারে। এ ছাড়া দেশে-বিদেশের দৃষ্টি রয়েছে এ নির্বাচনে।
আজমত উল্লাহ’র শক্তি দলীয় নেতাকর্মী ও তৃণমূলের সমর্থন: ভোটের ব্যালটে নৌকা ও টেবিল ঘড়ি প্রতীক থাকলেও নির্বাচনি মাঠে বাস্তবে আজমত উল্লা খান এবং সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যে লড়াই হচ্ছে। জাহাঙ্গীর আলমের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় তিনি মাকে নিয়ে এ নির্বাচনে লড়ছেন। মায়ের মাধ্যমে নিজের জনপ্রিয়তার জানান দিতে চাচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম। যদিও জায়েদা খাতুন জীবনে প্রথমবার নির্বাচন করছেন। রাজনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিল না। অপরদিকে আজমত উল্লা খান সাবেক টঙ্গী পৌরসভার তিনবারের মেয়র ছিলেন। তিনি গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগেরও সভাপতি। আওয়ামী লীগের সিংহভাগ সমর্থকই ভোটের মাঠে আজমত উল্লাহ’র পক্ষে রয়েছেন,নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে এমনটাই উঠে এসেছে। বিশেষ করে দল থেকে জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন না দেয়া এবং এর পরবর্তীতে তার স্বতন্ত্র তথা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দেয়া নিয়ে আওয়ামী লীগে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে ছিলো অসন্তোষ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অশ্রদ্ধা ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করাকে ভালো চোখে দেখেনি তৃণমূল আওয়ামী লীগ। তাই এবারের নির্বাচনে তাদের সিংহভাগেরই সমর্থন দলীয় মনোনীত প্রার্থীর দিকে। ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম ও নির্দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হলেও এবার নৌকা প্রতীকে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আজমত উল্লা খান। অন্য প্রার্থীদের মুখে পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা শোনা গেলেও তিনি নির্বাচন ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ হবে এবং তাতে ভোটার উপস্থিতিও ‘আশানুরূপ’ থাকবে বলে মনে করছেন।

জাহাঙ্গীরের কৌশলী লড়াইয়ে ‘মা’ যখন ট্রামকার্ড: আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে মনোনয়নপত্র ফরম জমা দিলেও প্রার্থিতা টেকেনি মো. জাহাঙ্গীর আলমের। উপরন্তু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় কেন্দ্র স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে তাকে। তবে মায়ের পক্ষে সর্বদা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি। একাধিক বার গণমাধ্যমকে জায়েদা জানিয়েছেন, ছেলের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন তিনি। জায়েদা খাতুন নির্বাচিত হলেও জাহাঙ্গীর আলম সিটি করপোরেশন চালাবেন-বিরোধীদের এমন প্রচারণার বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটিই তো স্বাভাবিক। আমি যেহেতু এই সিটি করপোরেশনে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছি। এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। সেসব থেকে আমার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। মা নির্বাচিত হলে আমি সার্বিকভাবে তার কাজে সহযোগিতা করব। প্রশাসনিকভাবে মা-ই প্রধান থাকবেন। কিন্তু সার্বিকভাবে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তাকে যত রকমের সহযোগিতা করা যায়, তা আমি করব।
বিএনপি ও জোট সমর্থকদের ভোট কোথায় যাবে?
প্রথম দুই নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন নিয়ে গাজীপুরের স্থানীয় জনগণের মধ্যে আছে নানা কৌতূহল। এর কারণ হিসাবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে নানা কারণ। যার মধ্যে রয়েছে, বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়াই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট হচ্ছে, দলটির ২৯ জন নেতা কাউন্সিলর পদে ভোট করায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা তাই প্রকাশ্যে মাঠে নামেননি। অন্যদিকে বিএনপির বর্জনের মধ্যে দলের কর্মী এবং আগের নির্বাচনে দলের প্রার্থী হাসানউদ্দিন সরকারের ভাতিজা রনি সরকার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। রনি বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরকারের ছেলে। বিএনপি’র হাই কমান্ড থেকে নির্বাচন বর্জন করায় রনির পক্ষে বিএনপি’র কোনো সমর্থনও নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে বিএনপি ও তাদের জোট সমর্থকদের ভোট কোথায় পড়বে তাই নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। নির্বাচনে মূল লড়াই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যেই বলছেন স্থানীয়রা। তবে, আওয়ামী লীগ থেকে স্থায়ী বহিস্কার হওয়া সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের মা জায়েদা খাতুনের দিকে বিএনপি’র সমর্থকদের ভোট পড়বে নাকি বিএনপি’র ভোট বর্জন উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র পদে লড়াইয়ে নামা রনির দিকে ঝুঁকবেন তারা তা নিয়ে রয়েছে জল্পনা। রায় যে পক্ষেই যায় তা বিএনপি বা জোট সমর্থকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ কথা বলাই বাহুল্য।
গাজীপুরে নির্বাচনী পরীক্ষায় ইসি চ্যালেঞ্জ: নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা বলেছেন, আমাদের কাছে সব নির্বাচনই সমান গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আলাদা কোনও চ্যালেঞ্জ ও চাপ নেই। যেখানেই নির্বাচন হচ্ছে আমরা তা মনিটরিং করছি। আমাদের পক্ষ থেকেও কারও ওপর চাপ নেই। যে যার মতো নির্বাচনের কাজ করছে। তাতে কোনও অসুবিধা নেই। বুধবার (২৪ মে) গাজীপুর সার্কিট হাউসে নির্বাচন নিয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাই ভোটারদের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ একটা ভোট হোক। এটা নিয়ে কমিশনের ম্যাসেজ হলো- সুষ্ঠু নির্বাচন। এতে কোনও ব্যত্যয়ের সুযোগ নেই। আমরা এটাই করবো, এটা করার জন্যই সচেষ্ট। অবশ্যই আপনারা (ভোটার) কেন্দ্রে নির্ভয়ে আসবেন।

সতর্ক অবস্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী: গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেছেন, নিñিদ্র নিরাপত্তার মাধ্যমে যেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নাগরিকদের সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারি সেটা নিশ্চিত করব। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল ফোর্স, স্ট্রাইকিং ফোর্স, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে। এটা একটা সমন্বিত প্রয়াস। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করব। বুধবার (২৪ মে) শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ব্রিফিং অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন। জিএমপি কমিশনার বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা। জনগণ আসবে, সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে ভোট দিয়ে চলে যাবে। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই। পুরো গাজীপুরসহ সারা বিশ্বের লোকজন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আমরা যেন একটি ভালো ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারি।
কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বুধবার পর্যন্ত সুন্দরভাবে চলে আসছি। আগামীকাল নির্বাচনের দিন আপানারা যাতে সুন্দরভাবে দেশবাসীকে খবর জানাতে পারেন সে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করব। সিটি নির্বাচনে ৪৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫১টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ৩৫১টি কেন্দ্রে আমরা আলাদাভাবে গুরুত্ব দিব। নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে জিএমপি কমিশনার বলেন, প্রিজাইডিং অফিসারের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা আছে। যে কোনো বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসার যোগাযোগ করে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। ভোটকেন্দ্র সঠিকভাবে আছে কিনা, নিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি আছে কিনা, কোথায় নিরাপত্তার ঝুঁকি, এসব বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আমাদের পারস্পারিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা যাতে নির্বাচনটা সঠিকভাবে করতে পারি। যখন ভোট গ্রহণ শুরু হবে, তখন সবাই যাতে লাইনে দাঁড়াতে পারে, কেউ যেন পেশীশক্তি ব্যবহার করতে না পারে, কেউ যাতে ও মাস্তানি করতে না পারে এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। ভোটার ও জনগণের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে হবে। আমাদের অনেক মা-বোনেরা আছেন, তাদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করতে হবে। অনেক ভোটার আসবে হয়তো চোখে দেখে না, হাঁটতে পারে না, যেভাবে সাহায্য করা যায় সাহায্য করবেন।
ইউডি/সুপ্ত/কেএস

