প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ডেকে আনছে ভয়াবহ বিপর্যয়

প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ডেকে আনছে ভয়াবহ বিপর্যয়

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ০৫ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৩:২৫

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘প্লাস্টিক দূষণ সমাধানে সামিল হই সকলে।’ দিবসটির স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে-‘সবাই মিলে করি পণ, বন্ধ হবে প্লাস্টিক দূষণ।’ পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণ ও প্রতিরোধের উদ্যোগ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ: দূষণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে

মানুষের কারণেই পরিবেশ তথা মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পক্ষান্তরে এই দূষণের কারণে প্রকৃতি ও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকৃতি ও মানুষকে বাঁচাতে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করলেও দূষণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, নদী দূষণ ও বর্জ্য দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্লাস্টিক ও পলিথিনে দূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে কথা হলেও এর দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়নি। আর বর্তমান সময়ে এই প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, দেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে সবার অবস্থান থেকে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে সচেষ্ট হতে হবে এবং সরকারকে প্লাস্টিক দূষণের জন্য নির্ধারিত আইন প্রয়োগ সহযোগিতা করতে হবে। পরিবেশই প্রাণের ধারক ও বাহক। পরিবেশ দূষণ রোধে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও জনসাধারণের সহযোগীতা ও অসচেতনতা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহলের স্বদিচ্ছার অভাবে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে দূষণের মাত্রা।

দেশে বছরে তৈরি হচ্ছে ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য, পরিবেশে মিশছে ৬০%

করোনা ভাইরাস মহামারি শুরুর পর পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর কারণে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে গেছে বলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বছরে এখন ৮ লাখ ২১ হাজার ২৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ২ লাখ ২৮ হাজার টনের মত রিসাইকেল বা পুনঃব্যবহার হয়। বাকি বর্জ্য পরিবেশে পড়ে থাকে। সারাদেশের যে বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার ৩০ শতাংশের বেশি হয় রাজধানী ঢাকায়। দেশের প্রধান শহরটিতে বছরে প্রায় আড়াই লাখ টন, অর্থাৎ দিনে ৬৮১ টনের মত বর্জ্য উৎপন্ন হয়। সারা দেশে এর পরিমাণ ২ হাজার ২৫০ টন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশের মানুষ বছরে মাথাপিছু ৯ কেজি বর্জ্য উৎপন্ন করলেও রাজধানীতে এটি দ্বিগুণ বা ১৮ কেজি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের কর্মসূচি জানাতে এসে রবিবার (০৪ জুন) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ।

তিনি জানান, সরকার এমন একটি বিধান করতে যাচ্ছে, যাতে যারা বর্জ্য উৎপাদন করবে তারাই উৎস থেকে সেটি ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করবে।
সচিব বলেন, দেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের ৬০ শতাংশ রাস্তাঘাট ও নদীতে যাচ্ছে। মাছ ও বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে ঢুকে সেগুলো মানুষের জীবনচক্র ও শরীরে চলে আসছে। তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিকের উৎপাদন নিষিদ্ধ করা আছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত নাগরিকদের চাহিদা থাকবে ও তারা সচেতন না হবেন ততক্ষণ পর্যন্ত এটা চলতে থাকবে। নাগরিকদের আমরা বিকল্প ব্যবহার সামগ্রী দিতে সফট লোন ও বিভিন্ন সুবিধা দিতে এনবিআরসহ বিভিন্ন জায়গায় কথা বলছি।

পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্ব আরোপ

প্রকৃতির অক্ষুণ্ণতা বজায় রেখে পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, মানব স¤প্রদায় ও প্রাণিক‚লের অস্তিত্বের জন্য দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশের বিকল্প নেই। রাষ্ট্রপতি ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৩’ উপলক্ষ্যে দেয়া এক বাণীতে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পরিবেশ দূষণকে আরো বেশি সমস্যাসংকুল করে তুলেছে প্লাস্টিকজাত পণ্যের অপরিকল্পিত ব্যবহার। প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, ভোক্তাসাধারণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনে আমাদের সরকার প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপনে যাতে প্রতিবেশ ও পরিবেশসম্মত বিধিব্যবস্থা পরিপালন করা হয় সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৩’ উপলক্ষ্যে দেয়া এক বাণীতে এ কথা বলেন।

মো. শাহাব উদ্দিন

সরকারের নানা উদ্যোগের কথা জানালেন পরিবেশ মন্ত্রী

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, পলিথিন বন্ধে আমরা আইন করেছি। একবার ব্যবহৃত হয় এমন পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহৃত হয় এমন পাস্টিক বন্ধের পরিকল্পনা নিয়েছি। আশা করছি ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যবহার ৮০ শতাংশ কমাতে পারব। ঢাকায়ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধের চেষ্টায় পাট থেকে ব্যাগ তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিন্তু এখনও সেটি বাজারজাত করা যায়নি। আমরা যখন বাজারজাত করতে পারব তখন ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে সক্ষম হব। বড় বড় শপিংমলে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার না করে ক্রেতাদের কাছ থেকে দাম নিয়ে কাগজের ব্যাগ দেওয়ার অনুরোধ জানান পরিবেশমন্ত্রী। হর্নের অপব্যবহার বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাপমাত্রা কমাতে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেই প্রশ্নে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবদুল হামিদ বলেন, ঢাকা শহরের তাপমাত্রা কেন বাড়ছে তা নির্ণয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জলাধার ভরাট, অতিরিক্ত গাড়ি চলাচল, এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেম নাকি গাছপালা কমে যাওয়ায় এমন হচ্ছে সে বিষয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, বেহাত হয়ে যাওয়া ১৮ হাজার একর বনভ‚মি গত দুই বছরে উদ্ধার করা হয়েছে। এ বছর ৫০ শতাংশের বেশি গাছ উপক‚লীয় এলাকায় লাগানো হচ্ছে।পূর্বাচলে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো যায় সেই পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

‘প্লাস্টিক একাধারে মাটি, পানি ও সমুদ্র দূষিত করছে’

প্লাস্টিক দেশের সুন্দর পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। তিনি বলেন, প্লাস্টিক একাধারে মাটি, পানি ও সমুদ্র দূষিত করছে। প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বাতাসও দূষিত হচ্ছে, তাই এখন আর আমরা বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার জন্য নির্মল বাতাস পাই না। রবিবার (০৪ জুন) স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে ‘প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বায়ু দূষণের পরিবেশগত এবং আইনগত প্রেক্ষাপট’ বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), বারসিক-এর যৌথ আয়োজনে এবং বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (বিএনসিএ), পরিবেশ উদ্যোগ ও সিপিআরডির সহযোগিতায় স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। হাবিবুন নাহার বলেন, শুধু সরকার একা কাজ করে এই দূষণ কমাতে পারবে না। ব্যক্তি পর্যায়ে প্লাস্টিক রিসাইকেল সম্ভব না হলেও আমরা চাইলে প্লাস্টিক রিফিউজ এবং রিইউজ করতে পারি। এতে করে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ অনেকাংশে কমে যাবে।

দেশের নগরীগুলোতে সবুজ ভূমি কই?

একটি আদর্শ শহরে ১৫ শতাংশ সবুজ ভ‚মি থাকা প্রয়োজন হলেও রাজধানীসহ দেশের বড় শহর বা নগরী গুলোতে এই পরিমাণ সবুজ ভ‚মি নেই। রাজধানী ঢাকায় তা অর্ধেকেরও কম। বর্তমানে ঢাকায় সবুজ ভ‚মি রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। সা¤প্রতিক এ গবেষণায় দেখা যায়, রাজশাহী নগর স¤প্রসারণে গত ৩০ বছরে ১৭ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন হারিয়েছে। এতে তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দুই দশকে সিলেটে সবুজ কমেছে ৫০ শতাংশ। গত ২১ বছরে সিলেটে বহুতল ভবন দ্বিগুণ হয়েছে; যে কারণে কমেছে উš§ুক্ত জমি ও জলাশয়। স¤প্রতি গুগলের স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে এক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। একই চিত্র দেশের অপর বড় শহর কিংবা নগরীগুলোতেও। যার অন্যতম কারণ সমন্বয়হীন উন্নয়ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্ধারিত এলাকায় উন্নয়নকালে সবুজ ভ‚মি সংরক্ষণ ও বাড়ানোর প্রতি গুরুত্ব না দেওয়াও একটি কারণ। তারা আরও বলছেন, নগরীর উন্নয়নযজ্ঞ তথা পার্কের উন্নয়ন প্রকল্পে কনক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৫ জুন ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা

পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে থাকছে যে সকল কর্মসূচি

আজ সোমবার সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। সকালেই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে হবে পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠান। এতে বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ২০২২, পরিবেশ পদক ২০২২, বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পুরস্কার ২০২১ এবং সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীদের লভ্যাংশের চেক বিতরণ করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন তথ্য ও স¤প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।শেরেবাংলা নগরে ৫ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত পরিবেশ মেলা এবং ৫ থেকে ২৬ জুন ও ১ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বৃক্ষমেলা চলবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে নানা অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে। সব জেলা-উপজেলা ও ঢাকা মহানগরীর এক শটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও দিবসটি উদযাপন করা হবে। শিশু চিত্রাঙ্গন, বিতর্ক ও স্লোগান প্রতিযোগিতা, পরিবেশ বিষয়ক সেমিনারেরও আয়োজন করা হবে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading