চীন-আমেরিকা উত্তেজনা: বিরোধিতা নিরসনে সংলাপ চায় দুই পরাশক্তি

চীন-আমেরিকা উত্তেজনা: বিরোধিতা নিরসনে সংলাপ চায় দুই পরাশক্তি
চীন-আমেরিকা উত্তেজনা

কিফায়েত সুস্মিত । সোমবার, ০৫ জুন ২০২৩ । আপডেট ১৩:৩৫

চলমান বিবাদ অবসানে চীন আমেরিকা দুই দেশই সংলাপে বসার প্রস্তাব দিয়েছে। সিঙ্গাপুরে শুরু হওয়া তিন দিনের ‘সাংগ্রি-লা-ডায়ালগ’ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে এমন প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে চীন আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বক্তব্যে। গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগরে আঞ্চলিক বিরোধ এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপ রপ্তানির ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক গুরুতরভাবে উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। আর সর্বশেষ সংবেদনশীল তাইওয়ান প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলাচল করায় আমেরিকা এবং কানাডার সমালোচনা করেছে চীন। সিঙ্গাপুরে শুরু হওয়া তিন দিনের ‘সাংগ্রি-লা-ডায়ালগ’ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে লয়েড অস্টিন ও চীনের প্রতিরক্ষাপ্রধান লি শাংফু প্রথমবারের মতো হাত মেলান ও সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা বলেন। সম্মেলনে অস্টিন বলেন, আমেরিকা মনে করে, চীনের সঙ্গে যোগাযোগের উন্মুক্ত পথ থাকা অত্যাবশ্যক। ‘কিছু দেশ’ অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে তীব্র করার এবং অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ এনে আমেরিকা কিছুটা সমালোচনা করেন চীনের প্রতিরক্ষা লি শাংফু। তিনি বলেন, স্নায়ু যুদ্ধের মানসিকতা এখন পুনরুত্থিত হচ্ছে এবং এটি নিরাপত্তা ঝুঁকিকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করছে। হুমকি ও আধিপত্যের ওপর পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সম্মেলনের সাইডলাইনে একান্তে কথা বলার সময় দুই চীনা সামরিক কর্মকর্তা বলেন, সামরিক আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার আগে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে এশিয়ায় কম সংঘাতমূলক মনোভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত চায় বেইজিং।

আমেরিকার সঙ্গে সংঘর্ষে ‘অসহনীয় বিপর্যয়’ চায় না চীন: চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফু এশিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত অসহনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই সংঘাত এড়াতে আমেরিকার সঙ্গে সংলাপ চায় তার দেশ। শুক্রবার থেকে সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে তিনদিনের ‘সাংগ্রি-লা-ডায়ালগ’ প্রতিরক্ষা সম্মেলন। সেখানে লি শাংফু বলেন, চীন এবং আমেরিকার একসঙ্গে গড়ে ওঠার জন্য বিশ্ব যথেষ্ট বড় জায়গা। আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে লি অস্বীকৃতি জানানোর কয়েকদিন পর এমন মন্তব্য করলেন। গত মার্চে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর সিঙ্গাপুরের সম্মেলনে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভাষণে রবিবার (০৪ জুন) তিনি বলেন, চীন এবং আমেরিকার ব্যবস্থাপনা আলাদা। একে অপরের থেকে আরও নানাভাবেও তারা আলাদা। কিন্তু তাই বলে অভিন্ন স্বার্থে দুই পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সহযোগিতা জোরদার করার চেষ্টা করবে না তা হতে পারে না। আমেরিকা এবং চীনের মধ্যে মারাত্মক সংঘাত বিশ্বের জন্য অসহনীয় বিপর্যয় নিয়ে আসবে এটি অনস্বীকার্য। সম্প্রতি তাইওয়ান প্রণালিতে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য আমেরিকা ও কানাডাকে দায়ী করেছে চীন। তবে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন সিঙ্গাপুরের একই সম্মেলনে নিরাপত্তা সভায় দেওয়া বক্তব্যে আমেরিকার সঙ্গে সামরিক বিষয়ে আলোচনা না করার জন্যে চীনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাইওয়ানসহ নানা বিষয় নিয়ে আমেরিকা এবং চীনের সম্পর্কের অনেকটাই অবনতি হয়েছে। গত এপ্রিলে তাইওয়ান ঘিরে তিন দিনের সামরিক মহড়া চালায় চীন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থির সঙ্গে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের বৈঠকের পর এ মহড়া চালিয়েছিল চীন।

ভুল-বোঝাবুঝি এড়ানোর পথ উন্মুক্ত থাকা আবশ্যক: আমেরিকার সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, এমন ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে আমেরিকা এবং চীনের মধ্যে সংলাপ অত্যাবশ্যক। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন শনিবার (০৩ জুন) এ কথা বলেন। চীনের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর লয়েড অস্টিন এ কথা বলেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বর্তমানে এশিয়া সফর করছেন। বেইজিংকে টক্কর দিতে তিনি এর আগে জাপান সফর করেছেন। তিনি ইন্ডিয়া সফরেও যাবেন। তিনি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জোট ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন। সম্মেলনে অস্টিন বলেন, আমেরিকা মনে করে, চীনের সঙ্গে যোগাযোগের উন্মুক্ত পথ থাকা অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে এ যোগাযোগ জরুরি। আমরা যত বেশি আলোচনা করব, তত বেশি ভুল-বোঝাবুঝি ও হিসাবের গরমিল ধরা যাবে। কারণ, এ ধরনের ভুল-বোঝাবুঝি থেকে সংকট বা সংঘর্ষের সূচনা হতে পারে। আমেরিকা ২০১৮ সালে রুশ অস্ত্র কেনার অভিযোগে লির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। পেন্টাগন জানায়, লির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অস্টিনের সঙ্গে তার আলোচনায় কোনো সমস্যা নেই। অস্টিনের বক্তব্যের দ্রুত জবাব দিয়েছেন চীনের প্রতিনিধিরা। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানায় ঝাও বলেন, অস্টিনের সঙ্গে বৈঠকের পূর্বশর্তই হচ্ছে ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। চীন কী করবে, তা বলে দেওয়ার কোনো অধিকার নেই ওয়াশিংটনের। চীনা সেনাবাহিনীতে আমরা যা করি, তা চীনের নিরাপত্তার স্বার্থ বজায় রেখে করা হয়। অস্টিন বলেন, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংকট ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে চীন ইচ্ছুক নয়, সেটি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তবে এ পরিস্থিতি শিগগিরই ঠিক হবে বলে তিনি আশাবাদী।

চীন-আমেরিকাসহ শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের খবর: শাংরি-লা নিরাপত্তা সম্মেলনের মধ্যেই সপ্তাহান্তে সিঙ্গাপুরে বিশ্বের প্রায় দুই ডজন বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তারা গোপনে বৈঠক করেছেন। এ বিষয়ে অবগত পাঁচ ব্যক্তি শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বৈঠকে কী কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে আলোচনায় ইউক্রেইনে রাশিয়ার যুদ্ধ এবং মানবপাচার, চোরাচালানিসহ সীমান্ত টপকে করা অপরাধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সম্বন্ধে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে চীন আমেরিকা সম্পর্ক পুনর্গঠিত করতে বাইডেন প্রশাসনের জোরদার পদক্ষেপের অংশ হতে পারে এই বৈঠক। বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক ও খোলামেলা কূটনীতি যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। বিশেষ করে উত্তেজনার সময় এই ধরনের বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠকে আমেরিকা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান, মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক এভ্রিল হেইনস তার দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দুই পরাশক্তির মধ্যে অনেক বিষয়ে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা চললেও সিঙ্গাপুরে এই গোপন বৈঠকে চীনও উপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

ইউডি/কেএস

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading