ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নয়া অস্ত্র নাগরিকত্ব
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২০ জুন ২০২৩ । আপডেট ১০:৩০
মে মাসের শেষের দিকে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ জোরদার করেছে। অন্যদিকে রাশিয়া অধিকৃত ভূখণ্ডগুলোর ইউক্রেনের নাগরিক রুশ নাগরিকত্ব দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের স্বাক্ষরিত ২৭ এপ্রিলের এক ডিক্রিতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত ভূখণ্ডগুলোতে (অধিকৃত ভূখণ্ড) বসবাসরত লোকজন রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ না করলে তারা বিদেশি অথবা রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তি গণ্য হবে।
রুশ নাগরিকত্ব না নিয়ে ইউক্রেনীয়রা নিজদেশে পরবাসী হয়ে পড়বে। এমনকি তারা নিজেদের ভিটেমাটিতে বসবাসের অধিকারও হারাতে পারে। তারা বড় জোর সেখানে আগামী বছর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত থাকতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে নিবন্ধীকরণের কোনো সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। রুশ নাগরিক না হলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বিবেচিত হলে তারা বহিষ্কারের ঝুঁকির মুখেও থাকবে।
গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম রাশিয়া নাগরিকত্ব ইস্যুকে একটি কার্যকর অস্ত্র বানাল। মস্কো এর আগে আবখাজিয়া, দক্ষিণ ওশেতিয়া ও ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার পর ইউক্রেন থেকে দখলে নেওয়া ডোনবাস অঞ্চলেও এই কৌশল প্রয়োগ করেছে। রাশিয়ার এই কৌশলটি পাসপোর্টাইজেশন নামে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে। রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিন ৩০ মে বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ইউক্রেনীয় রুশ নাগরিকত্ব নিয়েছে।
লাগবে নতুন নিবন্ধন, পাসপোর্ট
রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় শহরগুলোর একটি হলো মেলিটোপোল। কৌশলগতভাবে শহরটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, এর অবস্থান ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে। শহরটির মেয়র আইভান ফেদোরভ বলেছেন, খুব বেশি সংখ্যক ইউক্রেনীয় অবশ্য রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেনি। এট মস্কোর একটি প্রচারণা। প্রথম পর্যায়ে রুশদের কিছু সহযোগী সেদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে রাশিয়ানরা শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর রুশ পাসপোর্ট থাকার শর্ত দিলে আরো কিছু সংখ্যক লোক রুশ নাগরিকত্ব নেয়।
তার মতে, আগ্রাসনকারী শক্কি পাসপোর্টকে হাতিয়ার বানিয়ে জনসাধারণকে রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণে বাধ্য করছে। পেনশনসহ বিভিন্ন রকম সোশাল সিকিউরিটি ব্যবহার করার জন্য পাসপোর্ট গ্রহণ শর্ত করা হয়েছে। রুশ কর্তৃপক্ষ এই কাজের জন্য মেলিটোপোলকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে বসবাসরত ইউক্রেনীয়দের প্রতি জারি করা নোটিশে বলা হয়েছে, জমিজমাসহ ফ্ল্যাটবাড়ির নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে।
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইলহর সেমিভলোস বলেন, ‘রুশ কর্তৃপক্ষ তথাকথিত গণভোট ও সংযুক্তকরণের পর তারা এখন মানুষের বিষয় সম্পত্তি ও ব্যবসার দিকে নজর দিয়েছে। তারা বুঝতে পারছে সাধারণ মানুষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া ভূখণ্ড দখলের কাজটি সম্পূর্ণ হতে পারে না। সাধারণ মানুষের মনে এখন সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার ভীতি ঢুকেছে। সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়াই নয় শুধু ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়ার আশঙ্কাও তাদের তাড়া করতে শুরু করেছে।’
ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে কত সংখ্যক লোক রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে সে সম্পর্কে পরষ্পর বিরোধী খবর পাওয়া যাচ্ছে। রুশ নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো এ সংখ্যা বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে পদ হারানো ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই সংখ্যা নেহায়েতই নগণ্য বলে জানিয়েছেন। যেমন রুশ অধিকৃত ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শহর জাপোরিজ্জিয়া। এই নগরীর ৭০ হাজারের বেশি বাসিন্দা রুশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছে বলে রুশ মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে। তবে ঐ নগরীর সদ্য চাকরি হারানো কর্মকর্তারা মনে করেন এই সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি হবে না।
মস্কো জানিয়েছে, জাপোরিজ্জিয়া এবং খেরসনে (আরেকটি অধিকৃত এলাকা) জুনে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা আপনা আপনি রুশ নাগরিক গণ্য হবে। তাদের নাগরিকত্বের জন্য পৃথকভাবে আবেদন করতে হবে না। ইউক্রেনের গণমাধ্যমগুলো বলছে, রুশ নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য রাশিয়া জোর জবরদস্তি করছে। এর ফলে অধিকৃত অঞ্চলের ইউক্রেনীয়দের জীবন হয়ে হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা পেতে তাদের যেমন বেগ পেতে হচ্ছে। তেমনি ওসব এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যেতেও তারা চেকপয়েন্টগুলোতে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ইউক্রেনের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো রুশ নাগরিকত্ব পাওয়া ইউক্রেনীয়রা রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারবে। সেরকম হলে এই যুদ্ধে ইউক্রেন আরো বেকায়দায় পড়বে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলায়াক সম্প্রতি বলেছেন, ‘রাশিয়ার কৌশল হচ্ছে ইউক্রেনবাসীর মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ জিইয়ে রাখা। আগ্রাসন যত দীর্ঘায়িত হবে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তত বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে তারা বাধ্য হয়েই রুশ নাগরিকত্ব নিবে।
রণক্ষেত্রের কৌশল পাল্টাচ্ছে রাশিয়া
রুশ সেনাদের কলাম এখন আর এমন স্থানে হামলে পড়ছে না যেখানে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি বা ধ্বংস সাধন করতে পারবে। এখন সেনারা প্রায় সময় ড্রোন ব্যবহার করছে। অনেক সময় পরিখায় ইউক্রেনীয় অবস্থান শনাক্ত করতে চিৎকার করছে। আর ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ ইউক্রেনীয় সেনাদের তুলনায় কৌশল ও লড়াইয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করছে। ইউক্রেনের একটি ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার গ্রাফ বলেন, তারা পেছনে থাকা সেনা কোম্পানি ও ব্রিগেডের কমান্ড পোস্ট খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। পরে তারা দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে তা ধ্বংস করছে বা অন্তত যতটা সম্ভব যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। যুদ্ধের শুরুতে প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকা রুশ বিমানবাহিনী নিজেদের কৌশল পাল্টেছে এবং গোলাবারুদ ব্যবহারে দক্ষতা দেখাচ্ছে। এখন তারা যুদ্ধবিমানকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে ইউক্রেনীয় সেনাদের ওপর হামলা করছে গ্লাইড বোমা দিয়ে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন রুশ সেনাদের কৌশলের উন্নতি হয়েছে। তবে রণক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা বলছেন, বাখমুতে রাশিয়ার সাফল্য এসেছে মূলত ওয়াগনার বন্দিদের রণক্ষেত্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে আগ্রহী থাকায়। তারা মানুষের জীবনের কথা ভাবেনি। কিন্তু রণক্ষেত্রে সেনারা বলছেন, অন্য কিছু ঘটছে। বাখমুতে যেভাবে লড়াই শুরু হয়েছিল তার তুলনায় শেষটা ছিল অন্য রকম। বন্দিদের উপস্থিতি ছিল না শুরুর মতো। ওয়াগনারের পেশাদার যোদ্ধারা পদাতিক ও আর্টিলারি ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় করে ইউক্রেনীয় অবস্থানে হামলা চালিয়েছে, ছোট দল ব্যবহার করে তাদের পিছু হটিয়ে দিয়েছে। ইউক্রেনে যুদ্ধরত এক বিদেশি যোদ্ধা বলেন, ইউক্রেনীয়রা ওয়াগনারের গতির সঙ্গে পেরে ওঠেনি। রাশিয়ার কৌশল মোকাবিলায় ইউক্রেনীয় সেনারা পিছু হটার সময় ভবনগুলোতে বোমার ফাঁদ তৈরি করে। যাতে রুশরা প্রবেশের পর ভবনটি বিস্ফোরিত হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছে, রাশিয়া কৌশল পাল্টালেও তাদের সেনারা খুব বেশি অত্যাধুনিক হচ্ছে না। অভিজ্ঞ রুশ সেনাদের বেশিরভাগ যুদ্ধের শুরুতে মারা গেছে। যারা এখন লড়াই করছে এদের বেশির ভাগ কম প্রশিক্ষিত নতুন সেনারা। তারা আক্রমণ অভিযান পরিচালনায় জটিলতায় পড়ছে। বড় সামরিক ইউনিটের চলাচল নিয়ে সমন্বয়েও সমস্যায়। আর ২০২২ সালজুড়ে বিপুল সংখ্যায় ট্যাংক হারানোর ফলে এখন রুশবাহিনী রণক্ষেত্রের পেছনের সারিতে এগুলোকে রাখছে। সম্মুখে কামানের ব্যবহার করছে বেশি।
ইউডি/এ

