একের পর এক গণহত্যা: মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কতবার পার পাবে ?
কিফায়েত সুস্মিত । শনিবার, ১৫ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ১৭:৩০
মিয়ানমারের সেনারা এখন সংঘাত-কবলিত এলাকায় নিয়মিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করছে। সেসব কাটা মাথা তারা জনসম্মুখে প্রদর্শন করছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নয়, অভ্যুত্থানবিরোধী সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানোর জন্য তারা সেসব বিচ্ছিন্ন মাথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমানাসংলগ্ন কারেননি ও কারেন অঞ্চলের জাতিগত সংখ্যালঘুদের গ্রামগুলোতে খবার পানির কুয়াগুলোতে বিষও মিশিয়ে দিয়েছে তারা। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ৩৯ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। কিন্তু অন্যান্য বেসামরিক ও ধর্মীয় স্থাপনা যেমন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বৌদ্ধমঠ, চার্চ, মসজিদ, খাদ্য ও ধান সংরক্ষণের গুদাম ও হাটবাজার তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেগুলো এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে ধরনের জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়েছিল, তার সঙ্গেই কেবল চলমান ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা চলে। কিন্তু নানা পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর (গণতন্ত্রকামী ও ভিন্নমতালম্বী এবং তাদের জাতিগোষ্ঠী এবং অভ্যুত্থানবিরোধী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি চলছেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা জানে যে গণহত্যা সনদ অনুসারে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন।
২৩ হাজার ৮০০ ব্যক্তিক রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আটক: মিয়ামনমারের ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দিকে হত্যা করার অভিযোগ করেছে বেসামরিক মৃত্যু, গ্রেপ্তার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নথিভুক্তকারী আন্তর্জাতিক দল অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস (এএপিপি)। চলতি সপ্তাহেই এক বিবৃতিতে এএপিপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বাগো অঞ্চলের ডাইক-ইউ টাউনশিপের কাইকসাকাও কারাগার থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্থানান্তরের ভান করে ৩৭ জন রাজনৈতিক বন্দিকে কারাগার থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। এর পর থেকে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেই রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলে কারা কর্তৃপক্ষ বারবারই বন্দিদের অবস্থান জানাতে অস্বীকার করে। নিখোঁজ বন্দিদের মধ্যে দুইজনের পরিবারকে পরে মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, নিহতরা স্থানান্তরের সময় একটি পরিবহন দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সে সময় তারা পালিয়ে যেতে চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তারা নিহত হন। তবে বাকি ৩৫ জনের একেবারে কোনো হদিস নেই। এএপিপি বলছে, তারা মৃত না জীবিত, কিছুই জানা যাচ্ছে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আসিয়ান মানবাধিকার কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর আগে ২০২১ সালের প্রথম দিকে নির্বাচনে কারচুপিতে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে অং সান সুচিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে ক্ষমতায় বসেন সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং। এরপর থেকেই গণতন্ত্রপন্থীদের ধরপাকড় শুরু হয়। অভ্যুত্থানের বিরোধিতার জন্য ২৩ হাজার ৮০০ জন ব্যক্তিকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছর, ৪ জন গণতন্ত্রপন্থী নেতাকে নজিরবিহীনভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং আরও কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রয়েছে।
মিয়ানমার জান্তাকে গণতন্ত্রে ফিরতে চাপ দিতে হবে: আমেরিকা মিয়ানমার জান্তাকে সহিংসতা বন্ধ করে গণতন্ত্রে ফিরতে সম্মিলিত চাপ তৈরি করতে হবে। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন শুক্রবার (১৪ জুলাই) এ মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিপুঞ্জের সংস্থার (আসিয়ান) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মিয়ানমার ছাড়া বাকি সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি আমেরিকা ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও যোগ দেন। অবশ্য চীনের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবর্তে যোগ দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ কূটনৈতিক ওয়াং ই। ব্লিনকেন বলেন, মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের সহিংসতা বন্ধে বাধ্য করতে হবে। আমেরিকা ও আঞ্চলিক জোটকে তাদের ওপর এই চাপ তৈরি করতে হবে। জান্তা আসিয়ানের দেওয়া পাঁচ দফা যেন বাস্তবায়ন করে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশের বাধা অপসারণ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রধান অং সান সু চিকে বন্দি করা হয়। বিভিন্ন মামলায় তার ৩৩ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। মিয়ানমারে এবারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তার বিরুদ্ধে নতুন ধরনের প্রতিরোধ দেখা গেছে। এনএলডির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য সরকারে (নাগ) স্থান হয়েছে দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের নেতাদের। নাগের সশস্ত্র শাখা গণপ্রতিরক্ষা বাহিনী (পিডিএফ) দেশটির পুরনো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তারা এক হয়ে জান্তার বিরোধী গেরিলা যুদ্ধ করছে। এতে জান্তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তবে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে অর্থনৈতিক দুরাবস্থা।
মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিক সমাধান চায় আসিয়ান: মিয়ানমার সংকটের রাজনৈতিকভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান। গত ১২ জুলাই জোটের সভাপতি ইন্দোনেশিয়া এই আহ্বান জানায়। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি বলেন, কেবল একটি রাজনৈতিক সমাধানই টেকসই শান্তি নিয়ে আসতে পারে। দুই বছরের বেশি সময় আগে মিয়ানমারে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। নির্বাচিত সরকারপ্রধান অং সান সু চিকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। এরপর বিরোধী মত দমনে জান্তা কর্তৃপক্ষের সাঁড়াশি অভিযানে শত শত প্রাণহানি হয়েছে। সংকট কাটিয়ে মিয়ানমারে শান্তি ফেরাতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আসিয়ান। তবে এসব তৎপরতা এখনো সফলতার মুখ দেখেনি। বলা হচ্ছে, মিয়ানমার সংকট সমাধানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে ১০ দেশের এই জোটে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। তাই জোটের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া যায়নি। সম্মেলনে রেতনো মারসুদি বলেন, মিয়ানমারে অব্যাহত সহিংসতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা। এ নিয়ে আমরা অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। আমরা সব অংশীজনকে দৃঢ়ভাবে এ সহিংসতার নিন্দা জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি, কারণ আস্থা তৈরি করার জন্য এটিই সর্বোত্তম উপায়। জোটের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে রেতনো মারসুদি বলেন, জোট চায় মিয়ানমারের বিবদমান পক্ষের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরু হোক, যাতে করে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় আসা যায়। তবে মিয়ানমারে শান্তি ফেরাতে আসিয়ানের পক্ষ থেকে যে পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কেননা মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং জোটের শান্তি প্রস্তাব মেনে বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অনাগ্রহ জানিয়ে আসছেন।

