উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিযুদ্ধ: শূন্য থাকবে ১৬ লাখ আসন, নজরে ২৫০ কলেজ

উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিযুদ্ধ: শূন্য থাকবে ১৬ লাখ আসন, নজরে ২৫০ কলেজ

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ২৯ জুলাই ২০২৩ । আপডেট ২০:৪৫

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল শুক্রবার (২৮ জুলাই) প্রকাশিত হয়েছে। এতে পাস করেছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৮৪ হাজারের বেশি। এখন শিক্ষার্থীদের চিন্তা একাদশ শ্রেণিতে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে। যদিও সারা দেশে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ভর্তিযোগ্য প্রতিষ্ঠানে আসন আছে ৩৩ লাখের বেশি। ফলে সব শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পরও প্রায় ১৬ লাখ আসন ফাঁকা থাকবে।

এত কলেজ ও আসন থাকার পরও প্রতি বছর ভালো কলেজে ভর্তির সংকট দেখা যায়। কারণ, দেশে নামকরা ও ভালো মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হওয়ায় নামিদামি আড়াইশ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীরা বেশি ভিড় করে থাকে। অন্যদিকে অখ্যাত, নামসর্বস্ব কলেজ ও মাদ্রাসা যথারীতি শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবারের মতো এবারও জিপিএ-৫ সহ ভালো ও মধ্যম মানের ফল করা শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানে তুমুল ভর্তিযুদ্ধ নামবে।

জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর তপন কুমার সরকার বলেন, একাদশের আসন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। পর্যাপ্ত ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ভালো কলেজে ভর্তির জন্য যুদ্ধ হবে। তবে শিক্ষার্থীরা যেন নিজ ফল ও নম্বরের দিকে নজর রেখে আবেদন করে, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। আগামী ৩১ জুলাই সোমবার শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে এ নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। নীতিমালায় বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও কলেজে ফি-তে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে তপন কুমার সরকার বলেন, একাদশে ভর্তির নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যা আগামী ৩১ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে চূড়ান্ত হবে। তিনি জানান, খসড়া নীতিমালায় আগামী ১০ আগস্ট থেকে ভর্তির জন্য প্রথম ধাপে আবেদন শুরুর তারিখ প্রস্তাব করেছি। ভর্তি ফি ওই বৈঠকে চূড়ান্ত হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির কলেজ শাখা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড একাদশ শ্রেণি এবং বিভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে কলেজে একাদশ ও মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হবে। অন্যদিকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে ক্লাস শুরু হবে এক সপ্তাহ পরে ৭ অক্টোবর।

নীতিমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, ১০ আগস্ট থেকে শুরু হবে ভর্তির আবেদন। তিন ধাপে চলবে আবেদন প্রক্রিয়া। ২০ সেপ্টেম্বরে মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করে ভর্তির জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। ১ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যারা আবেদন করতে পারবে

২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে দেশের যেকোনো শিক্ষা বোর্ড এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি বা সমমান পরীক্ষা পাস করা শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্যান্য বছরে পাস করা শিক্ষার্থীরাও ম্যানুয়ালি আবেদন করতে পারবে। বিদেশি কোনো বোর্ড বা অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা সনদের মান নির্ধারণের পর ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে।

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেকোনো (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা) বিভাগে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। মানবিক বিভাগ থেকে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে আবেদন করা যাবে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকেও এ দুই বিভাগের একটিতে আবেদন করা যাবে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হবে।

প্রাপ্ত নম্বর মাথায় রেখে কলেজ পছন্দ করতে হবে

ভালো কলেজগুলোতে একই জিপিএ পেয়ে ভর্তির সুযোগ পেল, আমি কেন পাইনি– প্রতি বছর এমন অভিযোগ আসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। তাদের দাবি, আমিও জিপিএ-৫ পেয়েছি, যে ভর্তি সুযোগ পেয়েছে সেও জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাহলে আমি কেন ভর্তির সুযোগ পাইনি? এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক্ষেত্রে এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি ভোকেশনালে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে (জিপিএ নয়) ভর্তির মেধাক্রম তৈরি করা হবে। প্রার্থী যেন তার প্রাপ্ত নম্বর মাথায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পছন্দের তালিকা দেন। নয়তো জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও অনেকেই প্রথম ও দ্বিতীয় তালিকায় জায়গা পাবে না।

উদাহরণ দিয়ে তারা বলেছেন, ধরা যাক ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজে আসন আছে আড়াই হাজার। সেখানে প্রথমেই ভিকারুননিসা থেকে পাস করা ছাত্রীরা অগ্রাধিকার পাবে। এরপর যে সিট ফাঁকা থাকবে তাতে বাইরে থেকে ভর্তি করানো হবে। সেখানে যদি পাঁচশ আসনে বাইরে থেকে ছাত্রী নেওয়া হয়, সেই আসনের বিপরীতে ২০ হাজার আবেদন পড়লে সাড়ে ১৯ হাজারই বাদ পড়বে।

ভর্তিতে ৭ শতাংশ কোটা বহাল থাকছে

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে মোট শূন্য আসনের ৯৩ শতাংশ মেধা কোটা হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব শূন্য আসন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাকি ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর/সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারী সন্তানদের জন্য রাখা হয়েছে। এসব আসনে শিক্ষার্থী না থাকলে তা মেধা কোটায় বিবেচিত হবে। কোটার ক্ষেত্রে আবেদনকারী সংখ্যা বেশি হলে মেধার ভিত্তিতে তালিকা করতে হবে।

যারা ম্যানুয়ালি আবেদন করতে পারবে

পুরো ভর্তি প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হলেও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট বোর্ডে ম্যানুয়ালি ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবে। প্রবাসীদের সন্তান বা বিকেএসপি থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী বা খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভাগীয় বা জাতীয় পর্যায়ে অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বোর্ডে ম্যানুয়ালি আবেদন করতে পারবে। এক্ষেত্রে বোর্ড উপযুক্ত প্রমাণপত্র যাচাই-বাছাই করে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করে দেবে।

ভর্তি বাবদ ফি

২০২৩ সালে একাদশে ভর্তির খসড়া নীতিমালায় ভর্তি ফি গত বছরের মতোই নির্ধারণ করা হয়েছে। একাদশের ভর্তির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেশন চার্জ ও ভর্তি বাবদ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটনে বাংলা ভার্সনে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, ইংরেজিতে ৫ হাজার টাকা; ঢাকার বাইরের মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলা ভার্সনে ৩ হাজার, ইংরেজিতে ৩ হাজার টাকা; জেলা শহরে বাংলায় ২ হাজার, ইংরেজিতে ২ হাজার টাকা এবং উপজেলা/মফস্বল পর্যায়ে বাংলায় ১ হাজার ৫০০ ও ইংরেজিতে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন ফি গ্রহণ করা যাবে না।

নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটনে বাংলা ভার্সনে ৭ হাজার ৫০০, ইংরেজিতে ৮ হাজার ৫০০; ঢাকার বাইরে মেট্রোপলিটন এলাকায় বাংলায় ৫ হাজার, ইংরেজিতে ৬ হাজার; জেলা শহরে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা এবং উপজেলা/মফস্বলে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফি আদায়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে রসিদ দিতে হবে। দরিদ্র, মেধাবী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে উল্লিখিত সব ফি যতদূর সম্ভব মওকুফ করতে বলা হয়েছে। সব ফি’র বিবরণ স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বোর্ডে ঝুলিয়ে দিতে হবে। কোনোভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা যাবে না।

নির্ধারিত ফি’র বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থ নিলে বোর্ডে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার। তিনি জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রাথমিক সত্যতা পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতে অনেক প্রতিষ্ঠানের ভর্তির সার্ভার বন্ধ করে রাখা হয়। এবারও তাই হবে।

শূন্য থাকবে প্রায় ১৬ লাখ আসন

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, সারা দেশে ৯ হাজার ১৮১টি কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে পাঠদান করানোর অনুমতি আছে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে ৫৬৫টি। ডিপ্লোমা ইন কমার্স প্রতিষ্ঠান সাতটি এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (ভোকেশনাল, ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি) পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান আছে ১৮শর বেশি। সব মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন আছে ২৪ লাখ ৪০ হাজার ২৪৯টি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিকে আছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি। এছাড়া কারিগরি বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পর্যায়ে প্রায় ৯ লাখ আসন রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, এ বছর পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তির পরও আসন শূন্য থাকবে প্রায় ১৬ লাখ।

সব নজর থাকবে আড়াইশ কলেজে

সারা দেশে ভর্তিযোগ্য প্রায় সাড়ে ১১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাদশে ভর্তির আবেদন নেওয়া হলেও মূলত লড়াই হবে আড়াইশ কলেজ, মাদ্রাসা ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড থেকে জানা যায়, দেশে সাড়ে ১১ হাজার প্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণিতে পাঠদান হলেও মূলত আড়াইশ কলেজে ভর্তির আগ্রহ থাকে সবার। এর মধ্যে প্রায় দুইশ কলেজ ও মাদ্রাসা এবং ৪৭টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, একটি গ্রাফিক্স আর্ট ইনস্টিটিউট ও একটি গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকস ইনস্টিটিউট রয়েছে।

এছাড়া ৫১৫টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থাকলেও হাতেগোনা ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। ডিপ্লোমা ইন কমার্সের সাত প্রতিষ্ঠান ও বিএমটি এবং ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানেও কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি হয়।

নিজস্ব পদ্ধতি ভর্তি করবে নটর ডেম, হলিক্রস, সেন্ট যোসেফ

২০১৫ সাল থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। তবে চার্চ পরিচালিত তিনটি কলেজ– হলিক্রস, সেন্ট যোসেফ এবং নটর ডেম কলেজ নিজের মতো করে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের শিক্ষার্থী নির্বাচিত করে। প্রতি বছরের মতো এবারও এ তিন কলেজ নিজস্ব পদ্ধতিতে ভর্তি করাবে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ হেমন্ত পিউস রোজারিও বলেন, হাইকোর্ট থেকে অনুমতি নিয়ে প্রতি বছর আমরা নিজস্ব পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র নির্বাচিত করি। এবারও একই পদ্ধতিতে ভর্তি করানো হবে।

ইউডি/সিফাত

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading