আধুনিক সভ্যতার যুগান্তকারী আবিষ্কার: ক্যানসারের ‘টিউমার মরবে’ এক ওষুধেই

আধুনিক সভ্যতার যুগান্তকারী আবিষ্কার: ক্যানসারের ‘টিউমার মরবে’ এক ওষুধেই

কিফায়েত সুস্মিত । শুক্রবার, ০৪ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৩৫

ক্যানসারের টিউমার ‘মেরে ফেলতে’ পারবে- এমন এক ওষুধ আবিষ্কারের কথা জানিয়েছে ‘সিটি অব হোপ’ নামে আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসাকেন্দ্রের একদল গবেষক। তাদের দাবি, এটি এমন একটি ওষুধ যেটির শক্তিতে সলিড ক্যানসার সেরে যেতে পারে নির্দিষ্ট কেমোথেরাপির মাধ্যমে। ‘সিটি অব হোপ স¤প্রতি ‘এওএইচ ১৯৯৬’ নামে নতুন একটি পিল প্রস্তুত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রচলিত চিকিৎসাকে আমূল বদলে ফেলতে সক্ষম এই ‘এওএইচ ১৯৯৬’। গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, ‘এওএইচ ১৯৯৬’ নামের ওষুধটি ক্যানসারজাতীয় প্রোলিফারেটিং সেল নিউক্লিয়ার অ্যান্টিজেন (পিসিএনএ) নামে একটি প্রোটিনের বিরুদ্ধে সরাসরি কাজ করে। এটি এমন একটি প্রোটিন, যা টিউমার বড় হওয়া ও ডিএনএ রেপ্লিকেশনের পথে কাজ করে থাকে৷ পিসিএনএকে আগে অতীতে ‘অনিরাময়যোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই দশক ধরে এটি নিয়ে কাজ চলছে এবং আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে।

ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকেও নিষ্ক্রিয় করে দেয়

‘এওএইচ ১৯৯৬’ প্রস্তুতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের সদস্য লিন্ডা মালকাস আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালকে জানিয়েছেন, তাদের তৈরি নতুন এই পিলটি কেবল ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকেই আক্রমণ করে, সুস্থ কোষগুলোতে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব এটি ফেলে না। লিন্ডা বলেন, মানবদেহে ক্যানসারের জন্য দায়ী মুলত প্রোলিফারেটিং সেল নিউক্লিয়ার অ্যান্টিজেন বা পিসিএনএ নামের একটি প্রোটিন। দেহের অভ্যন্তরে উৎপাদিত এই প্রোটিনটির প্রভাবেই মূলত ক্যানসারের আশঙ্কাযুক্ত টিউমার গঠিত হয়। আমাদের নতুন এই ওষুধটি একদিকে এই প্রোটিনের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আঘাত হানে এবং একই সঙ্গে ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকেও নিষ্ক্রিয় করে দেয়। মার্কিন এই গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক লং গু দ্য ন্যাশনালকে বলেন, ‘বিশ্বে এ পর্যন্ত ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য যত পিল উদ্ভাবিত হয়েছে, সেগুলোর একটিরও পিসিএনএ’র উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আঘাত হানার সক্ষমতা নেই। এই কারণে এতদিন পিসিএনএকে একটি ‘অনিরাময়যোগ্য’ ক্ষতিকর প্রোটিন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এওএইচ১৯৯৬ হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ওষুধ, যেটি ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগটির একেবারে মূলে আঘাত হানতে সক্ষম।

শিগগিরই মানবদেহের ওপর চলবে কার্যকারিতা পরীক্ষা

অধ্যাপক লং গু জানান, প্রাণীদেহে ইতোমধ্যে এই পিলটি প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন তারা। সেই পরীক্ষার ফল বেশ ইতিবাচক। শিগগিরই মানবদেহের ওপরও এই ওষুধটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। ওষুধটি বাজারে এলে স্তন, অগ্নাশয়, মস্তিষ্ক, ডিম্বাশয়, ত্বক ও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীরা এটি সেবন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন গবেষক দলের প্রধান। আনা অলিভিয়া হিলি নামের একটি ৯ বছর বয়সী শিশুর নামে নামকরণ করা হয়েছে এওএইচএস ১৯৯৬ পিলটির। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া আনা মাত্র নিউরোব্লাস্টোমা নামের বিরল এক মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এওএইচ১৯৯৬ উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি ইতোমধ্যে সেল কেমিকেল বায়োলজি নামের একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটির নাম, স্মল মলিকিউল টারগেটিং অব ট্রান্সক্রিপশন-রেপ্লিকেশন কনফ্লিক্ট অপর সিলেক্টেভ কেমোথেরাপি।

দেশে প্রতিদিন ক্যান্সারে মৃত্যু ২৫০ জনের

বাংলাদেশে প্রতিদিন নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন ৩৩৪ জন করে আর মারা যাচ্ছেন প্রায় ২৫০ জন রোগী। সচেতনতা থেকে শুরু করে সরকারের পদক্ষেপ, প্রতিটি উদ্যোগই এই ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করতে পারে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর ক্যান্সার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিসিপিআর)। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) অনুমিত হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার (প্রতিদিন ৩৩৪) মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, মারা যান ৯১ হাজার (প্রতিদিন ২৫০)। যেকোনো দেশে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য দরকার ক্যান্সারের আক্রান্তের হার, মৃত্যুহার, কারা কোন ক্যান্সারে আক্রান্ত সে সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, সরকারের সেক্টর কর্মসূচিতে আমরা এতদিন জনসংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধন অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি।

ক্যানসারে আক্রান্তের কারণে মানুষের কী নিদারুন কষ্ট এবং তার চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষের কী পরিমাণ ভোগান্তি, তা আমরা সবাই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই তা কেবল উপলব্ধি করতে পারে। দেশে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ খুবই অপ্রতুল। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেকটা দুঃসাধ্য। অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসাসুবিধা অপ্রতুল। সরকারিতে খুবই চাপ এবং অত্যধিক ভিড়। প্রয়োজনীয় জনবল এবং অবকাঠামোর বিভিন্ন কারণে রোগীরা আসেন দেরিতে গভীরতর রোগ নিয়ে। চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সারিয়ে তোলা অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অপারেশন পরবর্তী রেডিওথেরাপির অবস্থাও খুবই ভয়াবহ। রোগীর তুলনায় সেন্টারের সংখ্যা অনেক কম। রেডিওথেরাপি শুরু করতে অনেক দেরি হয়ই। এতে করে হয়তো রোগ আবার ফিরে আসে, নয়তো কেমোথেরাপির যন্ত্রণায় পড়ে। অপর দিকে একটু সতর্ক থাকলে এ রোগ একেবারে প্রথমেই ধরা পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ের হেড-নেক ক্যানসারের চিকিৎসা খুবই সহজ। খরচ কম। ফলাফল অত্যন্ত ভালো। এসব কারণে দ্রæত তার চিকিৎসা নেওয়া দরকার।

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই হোক সর্বোত্তম পন্থা

আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে এক কোটির বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজন প্রাথমিক উপসর্গগুলো উপেক্ষা করছেন, যা না করলে তাদের সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। যতই চিকিৎসাসুবিধা থাকুক, ক্যানসার একবার হলে এর অনেক কষ্ট। এ জন্য প্রতিরোধই হলো সর্বোত্তম। সাধারণ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। চর্বি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খাবেন। ফলমূল ও সবজির পরিমাণ বাড়ান। ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করুন। মদপান পরিহার করুন। মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ পরিহার করুন। পান-তামাক বর্জন করুন। যৌনজীবন হতে হবে পরিশীলিত। ক্যান্সারের উপসর্গের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ভালো থাকুন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading