ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : বাস্তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪৫
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ইতোমধ্যে চলতি বছরের শুরু থেকে আগস্ট ২১ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও সচেতনায় রয়েছে ঘাটতি। তবে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মশা নিধন কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন
আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ
ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যায় অতীতের সব রেকর্ড মুছে দিল ২০২৩ সাল। গত একদিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো ২১৯৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাতে দেশে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ১৯১ জনে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর এই সংখ্যা এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৯ সালে সারাদেশে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এতদিন সেটাই ছিল রেকর্ড।
বাংলাদেশে আর কোনো বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়ায়নি। ২০২২ সালে সারাদেশে ৬২ হাজার ৩৮২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। গত একদিনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯ জনের। তাতে এ বছর মশাবাহিত এ রোগে মোট ৪৮৫ জনের মৃত্যু হল। ডেঙ্গুতে এক বছরে এত মৃত্যু আর কখনও দেখেনি বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকার ৮৭২ জন এবং ঢাকার বাইরের ১৩২৫ জন। মৃত ৯ জনের মধ্যে ৬ জন ঢাকার এবং ৩ জন ঢাকার বাইরের। বর্তমানে সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৭ হাজার ৬৮৬ জন ডেঙ্গু রোগী । তাদের মধ্যে ঢাকায় ৩৬০৭ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৪০৭৯ জন।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্বেগ
দেশে ডেঙ্গু ‘প্যান্ডেমিক’ কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত শুরু হওয়ার পর ২৯-৩০তম সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে। এরপর থেকে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। তবে ৩১-৩২তম সপ্তাহে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দেখা গেছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, যেকোনো ‘প্যান্ডেমিক’ই একটি নির্দিষ্ট সময় শুরু হয়, একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয়। তবে এ বছর ডেঙ্গুর গন্তব্য কোথায় গিয়ে থামবে, সেটি স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।ডা. শাহাদাত বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২৬ শ’র বেশি ডেডিকেটেড শয্যা রয়েছে। কিন্তু সবমিলিয়ে রাজধানীতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে ১৯৭৪ জনের মতো। তার মানে হলো এখনো বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ছয় শতাধিক ডেঙ্গু শয্যা ফাঁকা আছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে ঢাকা মেডিকেলে, ৩১৫ জন। এরপরই মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থান। ডা. শাহাদাত বলেন, আমরা দেখছি, নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে। ডেঙ্গুতে পুরুষদের আক্রান্তের হার ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও নারীদের আক্রান্তের হার ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আক্রান্তের দিক থেকে পুরুষরা এগিয়ে থাকলেও ডেঙ্গুতে পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান যদি আমরা দেখি, ৪৬ জন নারীর বিপরীতে পুরুষ মারা গিয়েছে ৩৩ জন। তার মানে ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীদের প্রতি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।
মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন কীটতত্ত্ববিদদের
এ বছর এডিস মশা শনাক্তে চালানো জরিপে ঢাকায় মশার যে উপস্থিতি দেখা গেছে, তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় সামনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করেছেন তারা। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ বছর যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভুগছিলেন এবং শক সিনড্রোমে মারা গেছেন। কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সেই সঙ্গে ডেঙ্গু তথা মশা নিয়ন্ত্রণের নামে দেশে তামাশা চলছে। সম্প্রতি ‘কেন এই ডেঙ্গু মহামারি? পরিত্রাণ কোন পথে?’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের কয়েকজন শীর্ষ কীটতত্ত্ববিদ এমন মন্তব্য করেন। কীটতত্ত্ববিদ মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশে মশা নিয়ন্ত্রণের নামে তামাশা চলছে। ব্যাঙ, হরিণ আর হাঁস দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। পৃথিবীর আর কোথাও এমনটা দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, মশা ও মানুষের সংযোগের বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। তা না হলে, ডেঙ্গু কমবে না। এ জন্য মশারি ব্যবহার করতে হবে, মশা নিয়ন্ত্রণের স্প্রে ব্যবহার, ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট পরা, নিয়মিত বিরতিতে জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়াসহ পূর্ণাঙ্গ মশা মারতে হবে। মশার লার্ভা নিধনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বিদেশ থেকে যে ব্যাকটেরিয়া (বিটিআই-বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) আমদানি করেছে, তা আদতে বিটিআই কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন কীটতত্ত¡বিদেরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল কীটতত্ত¡বিদ তাহমিনা আক্তার বলেন, এডিস, নালা-নর্দমায় এডিস মশার অস্তিত্বের যে কথা বলা হচ্ছে, তা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন। এ নিয়ে কেউ পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করেনি। মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশে মশা নিধনে যেসব কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো তেমন কাজ করছে না। মশা সেসব কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। মশা নিধনে ব্যবহƒত কীটনাশকের মান বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণার দরকার হলে সেটিও করতে হবে।‘ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি, সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলা ও প্রতিরোধ, আমাদের দায়িত্ব ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
গবেষণার পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতায় গুরুত্বারোপ
প্রতি বছর, মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মশাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য; বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শীর্ষ হুমকির তালিকায় রেখেছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানোর জন্য গবেষণায় গুরুত্বারোপ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জোলোজি বিভাগের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু ফয়েজ মো. আসলাম বলেন, আমাদের এমনকিছু লোক থাকতে হবে, যারা সবসময় এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করবে। কারণ মশা প্রতিনিয়ত তার ধরন পাল্টাচ্ছে। আমরা যে ওষুধগুলো ব্যবহার করছি, সেগুলো কি নতুন ধরনেও কার্যকর হচ্ছে কিনা, সেগুলোও গবেষণা করতে হবে।
ব্যক্তি সচেতনতায় গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে কি প্রটেকশন নিয়েছি, সেটা আমাদের ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার আমার জন্য কী করছে সেটা পরের বিষয়। কারণ আমি যদি ফুল হাতা জামা পড়ি, আমি যদি দরজা-জানালাটা সময়মতো বন্ধ করে দেই বা স্ক্রীণ ব্যবহার করি, দিনে ঘুমানোর সময় আমি যদি মশারী ব্যবহার করি, এসব ক্ষেত্রে আমাকে মশা কামড়ানোর সম্ভাবনাটা অনেকাংশেই কমে যাবে।
আলোচনায় টিকা প্রসঙ্গ: কী বলছেন বিশেষজ্ঞগণ
সরকার মহামারি ঘোষণা না করলেও সারা দেশে মহামারির রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকারসহ সবার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ। এমন অবস্থায় আলোচনায় আসছে ডেঙ্গুর টিকা প্রসঙ্গ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রায়ালে থাকলেও সব বয়সীদের জন্য কার্যকর কোনো টিকা এখনও আবিষ্কার হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘ডেংভাক্সিয়া’ টিকার অনুমোদন দিলেও এতে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্টরা টিকার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর টিকা আমাদের দেশের মানুষের দেহে ব্যবহার করা যাবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তাই, করোনা টিকার মতো ডেঙ্গুর টিকা গণহারে প্রয়োগের ব্যাপারে আরও অপেক্ষা করতে হবে। দেশের সার্বিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং ডেঙ্গুর টিকা বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক শাহাদাৎ হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গুর টিকার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আছে। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে কয়েকটি দেশে ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন পেয়েছে। সেই দেশগুলোর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দিলে আমাদের দেশেও এর প্রয়োগ শুরু করা হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২২ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শুধু ‘ডেংভাক্সিয়া’ টিকা অনুমোদন পেয়েছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগ প্রতিরোধে ট্রায়ালে আছে আরও পাঁচটি টিকা। এর মধ্যে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে আছে জাপানের তাকিদা কোম্পানির ‘কিউডেঙ্গা’।
তবে বৈশ্বিক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এফএমআই জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ‘ডেংভাক্সিয়া’ ও ‘কিউডেঙ্গা’ অন্তত ২০টি দেশে ডেঙ্গুর টিকা হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে। এই ২০টি দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আমেরিকা, ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, পেরু ও এল সালভাদর।আমেরিকায় গত বছর সানোফি এবং লুই পাস্তুর ইনস্টিটিউটের ‘ডেংভাক্সিয়া’ টিকার অনুমোদন দিয়েছে। যদিও এই টিকা ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।এছাড়া, যে রোগীর ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস আছে, যারা ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছেন, কেবল তারাই এই টিকা নিতে পারবেন বলেও জানানো হয়েছে। ফলে, অনুমোদন পাওয়া একমাত্র ডেঙ্গু টিকা ‘ডেংভাক্সিয়া’ সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
ইউডি/এজেএস

