ব্রিকস কী পারবে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৪৫
দক্ষিণ আফ্রিকায় মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) থেকে তিন দিনের শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছে বিশ্বের পাঁচটি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের জোট ব্রিকস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বে নতুন মেরুকরণ শুরু হওয়ায় এবারের সম্মেলনে বিশ্বের নজর থাকবে। ব্রিকস কি পারবে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে? এ নিয়ে মিলন গাজী’র প্রতিবেদন
ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন-২০২৩
এজেন্ডা বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় শুরু হয়েছে ১৫তম ব্রিকস সম্মেলন। এবারের আয়োজনে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জোটটির রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা। সেক্ষেত্রে বাড়ানো হতে পারে ব্রিকসের পরিধিও। যার মূল লক্ষ্য থাকবে, ব্রিকসের পশ্চিমা বিরোধী অবস্থানকে আরও সংহত করা। মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) বিজনেস ফোরামের সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় ব্রিকসের এবারের শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকতা, যা চলবে আগামী ২৪ তারিখ পর্যন্ত। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার এ জোটের ১৫তম সম্মেলন ঘিরে গোটা বিশ্বের নজর এখন জোহানেসবার্গে। করোনা মহামারির পর প্রথমবারের মতো এক মঞ্চে সশরীরে হাজির হচ্ছেন অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের নেতারা। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২২ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ সম্মেলন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের আয়োজনে থাকবে নানা চমক। আন্তর্জাতিক আদালতে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় সশরীরে এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হলেও সম্মেলনের মূল আয়োজনে রুশ প্রেসিডেন্ট নেবেন নেবেন ভার্চুয়ালি। সীমান্ত ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা চীন-ইন্ডিয়াও বসতে পারে আলোচনার টেবিলে। মূলত, এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং লক্ষ্য অর্জনই এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। সেক্ষেত্রে প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে জোটের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণের প্লাটফর্ম মডার্ন ডিপ্লোমেসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো- সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন মুদ্রা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য হ্রাস করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপের ফলে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংস্কারের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এই পদক্ষেপ আমেরিকান আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার লাগাম টানতে কি প্রস্তুত ?
ইউক্রেনের সংঘাত এবং আমেরিকা ও চীনের মধ্যে গভীরতর ভ‚-রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভ‚মিতে এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন আয়োজিত হলেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি শক্তি হিসেবে ক্রমবর্ধমান অবস্থানকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে পারে ব্রিকস। এবারের সম্মেলনে জোট স¤প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই জোটের সদস্য ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। আলজেরিয়া থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত অন্তত ৪০টি দেশ এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবণতা। ব্রিকস কি আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিকল্প অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে? অথবা তাদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ কি তাদের সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস দেশগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে নাটকীয়ভাবে প্রতিস্থাপনের চেয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্প প্রস্তাব করার সম্ভাবনা বেশি। এটিও পশ্চিমাদের সঙ্গে বøকটির উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ ব্রিকস নেতারা বিশ্বে নিজেদের স্বাধীন পথ তৈরি করতে চান। কিন্তু কার্যকর হিসেবে বহাল থাকার জন্য ব্রিকসকে তার দেশগুলোর বৈষম্যপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো মোকাবিলা করতে হবে। যা গ্রুপটির জন্য সহজ কাজ হবে না।

ব্রিকস জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ/ ফাইল ছবি
গুরুত্ব পাবে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো
এবারে সম্মেলনে ব্রিকস নেতারা ডলার নির্ভরতা কমানোর ওপরেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেবেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পল মাশাটাইল জানিয়েছেন, কীভাবে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায় তা নিয়েই প্রথম দিন আলোচনা করবেন ব্রিকস নেতারা। এদিকে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ডলার নির্ভরতা কমাতে বড় ধরনের পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকটি দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মুদ্রায় ঋণ প্রদান করবে। এনডিবির বর্তমান প্রধান দিলমা রোসেফ। তিনি ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট। তিনিই নতুন দুই মুদ্রায় ঋণ প্রদানের কথা নিশ্চিত করেছেন। মূলত বহু মেরুর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সিস্টেমকে প্রসারিত করতেই এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দিলমা রোসেফ বলেন, এনডিবি’র টার্গেট হচ্ছে ব্যাংকের প্রদান করা ঋণের মোট ৩০ শতাংশ স্থানীয় মুদ্রায় দেয়া হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের ক্ষেত্রে দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় এসব ঋণ প্রদান করা হবে।
ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যে একটি নতুন মুদ্রা চালুর পরিকল্পনাও করছে। যদিও এই পরিকল্পনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। ব্রিকস দেশগুলোতে বাস করে বিশ্বের ৪০ শতাংশ মানুষ। বিশ্ব অর্থনীতির এক তৃতীয়াংশই এই জোটভুক্ত দেশের। তাছাড়া এবারের সম্মেলনে নতুন সদস্য রাষ্ট্রের নামও ঘোষিত হতে পারে। ব্লুমবার্গ ভবিষ্যৎবাণী করেছে যে, ২০৪০ সালের মধ্যেই বিশ্বের অর্ধেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে ব্রিকস। বিশ্বের সবথেকে উন্নত দেশগুলোর জোট জি সেভেনের দ্বিগুণ হবে ব্রিকস জোটের অর্থনীতি। প্রসঙ্গত, পশ্চিমা বিশ্বের একতরফা ব্যবস্থার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার জন্য ব্রিকস ২০১৫ সালে এনডিবি প্রতিষ্ঠা করে। ২০২১ সালে বাংলাদেশকে এনডিবিতে নতুন সদস্যপদ দিয়েছে যা দেশের উন্নয়নে অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ হবে। এনডিবির বর্তমান প্রধান ব্যাংকটির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে মার্কিন ডলার থেকে সরে আসার কথা বলেন। সদস্য দেশগুলোকে দেয়া ঋণের অন্তত ৩০ শতাংশ স্থানীয় মুদ্রায় দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বাংলাদেশ কি এবার সদস্যপদ হবে ?
বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিকসের ব্যাংক-এনডিবির শেয়ারহোল্ডার। এটি কোনো বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংকে বাংলাদেশের জন্য প্রথম মালিকানা। ২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করে। অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিকসে যোগদান বাংলাদেশকে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন বাড়াতে ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সাহায্য করবে। এ ধরনের একটি কার্যকর জোটে যোগদান বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার অংশীদারত্ব বাড়াতেও সাহায্য করবে। সাধারণ মুদ্রার ব্যবহার বাংলাদেশকে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতেও সাহায্য করতে পারে। এ ফোরামের মাধ্যমে বাংলাদেশও বহুপক্ষীয়ভাবে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হয়নি। তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেন, ইন্ডিয়া আর ব্রাজিল বলছে নতুন সদস্য নেওয়ার আগে একটা নতুন নিয়মকানুন হোক। এটা তাদের ব্যাপার। উদ্যোক্তারা বাদে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রথম সদস্য হয়েছিল বাংলাদেশ। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এ ধরনের জোটের সঙ্গে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সবাই। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেছেন, কিছু ইস্যু আছে। সেগুলো সব সময় সবখানে একই রকমের গুরুত্ব পায় না। আপনি কিছু বিষয় সেখানে সহযোগী হিসাবে উত্থাপন করতে পারেন। আমার কাছে মনে হয়, সহযোগী হিসাবে থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২৩ আগস্ট ২০২৩ । প্রথম পৃষ্ঠা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জোটের ভবিষ্যৎ
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ব্রিকসের প্রভাব আরও প্রশস্ত করা এবং বৈশ্বিক ভ‚-রাজনীতিতে পরিবর্তনের দিকে নজর থাকবে জোটভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনটি মহাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রতিনিধি করা ব্রিকসের দেশগুলোর একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, আর তা হলো, ধনী পশ্চিমা শক্তির হয়ে কাজ করা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি অনীহা। এ বিষয়ে এশিয়া ও ব্রিকস বিষয়ক দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ অনিল সুকলাল গত এএফপিকে বলেন, এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আগ্রহ বাড়ছে কোনো কোনো দেশের। এর অন্যতম কারণ, মেরুকৃত বিশ্বের আরও মেরুকরণ হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে। তাই দেশগুলোকে বাধ্য হয়ে কোনো এক পক্ষে যেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণের দেশগুলো কাকে সমর্থন করবে, কীভাবে আচরণ করবে এবং কীভাবে তাদের সার্বভৌম বিষয়গুলো পরিচালনা করবে, তা বলতে চায় না। তারা এখন তাদের নিজ নিজ অবস্থান জাহির করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী।’ ফলে ‘বিশ্বকাঠামো’ পুনর্গঠন করতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য ব্রিকস আশা জাগিয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। লিম্পোপো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক লেবোগং লেগোডি এ বিষয়ে একমত যে, বর্তমান বিশ্বে কর্তৃত্বের বিকল্প হিসেবে অনেক দেশই এখন ব্রিকসে যোগদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু ব্রিকসের প্রতি নজর রাখা বিশ্লেষকেরা এই সম্মেলনের ফলাফল নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন। কেননা, বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ক্ষমতা এখনো পশ্চিমা দেশগুলোর হাতেই রয়েছে এবং চীন এখনো প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠেনি।
ইউডি/এজেএস

