শহরে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে যত বাধা ও চ্যালেঞ্জ

শহরে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে যত বাধা ও চ্যালেঞ্জ

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০২৩ । আপডেট ১৪:৫৫

শহরে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে বড় বাধা সমন্বয়ের অভাব। সরকারি সব সংস্থার দ্র্রুত সমন্বয় হয় না বলেই অনেক কাজ করা যায় না। মঙ্গলবার (২২ আগস্ট) সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ ইমপ্লিমেন্টেশন প্রোগ্রাম : আরবান এরিয়াস শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম ও পরিকল্পনা সচিব সত্যজিত কর্মকার। জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মো. কাউসার আহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিজিআইএসের সিনিয়র আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল এক্সপার্ট ড. ফারহানা আহমেদ। বক্তব্য দেন জিইডির প্রধান খান মো. নূরুল আমীন।

এমএ মান্নান

চিহ্নিত ৬ হটস্পটের অন্যতম ঢাকা, বলছেন পরিকল্পনামন্ত্রী

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, ডেল্টা প্ল্যানে যে ৬টি হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঢাকা। রাজধানীকে বাঁচাতে হলে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। আতিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা দখল, দূষণ ও দুষ্টলোক। এ ছাড়া কোনো কিছু করতে গেলে সরকারি দপ্তরই সমস্যা হিসেবে দেখা যায়। সবার মধ্যে সমন্বয় দরকার। রাজধানীকে দখলদার মুক্ত করতে সিএস খতিয়ান দেখেই করতে হবে। ড. শামসুল আলম বলেন, নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া দরকার। সব কাজ কেন সরকারি দপ্তরের হাতে থাকবে। মেয়রদের দায়িত্ব দিলে ভালো হয়। সত্যজিত কর্মকার বলেন, হটস্পটগুলোর মধ্যে শহর এরিয়ায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে বিপুল জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সমস্যাও আছে অনেক। ফলে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দূর করতে চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও কোনো ফল আসেনি। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, সেখানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পটির কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। কাজেই সমন্বয় ছাড়া কোনো প্রকল্পেই কাজ হবে না।

শহরাঞ্চলের জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব

মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলের জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের সার্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও শহরে বাড়বে ১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিবছর সারা দেশে বৃষ্টিপাত বাড়বে ৬০ মিলিমিটার। কিন্তু শহরে বাড়বে ১১০ মিলিমিটার। বাড়বে বন্যা এবং জলাবদ্ধতাও। এরকম নানা সমস্যা সমাধানে শহর কেন্দ্রীয় আলাদা প্রকল্প নিতে হবে। জিইডি থেকে জানানো হয়, ডেল্টা প্ল্যানে চিহ্নিত ছয়টি হটস্পটের মধ্যে এর আগে পাঁচটিকে নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার হচ্ছে ঢাকায়। এভাবে পরামর্শ নিয়ে পরিকল্পনায় থাকা উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ মানবসম্পদ এবং অর্থায়ন

২১০০ সালের মধ্যে ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ ও অর্থায়নই বড় চ্যালেঞ্জ বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন। তাদের মতে, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি-বেসরকারি সব পক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুনীল অর্থনীতিতে সুবিশাল হবে দেশের সম্পদ। যা বাস্তবায়নে ৩৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এ অর্থ জোগাড় করা চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যা, নদী ভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে আলোচিত ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ মোট ছয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত ও ব-দ্বীপ সংক্রান্ত অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলা করতে চায় সরকার। দীর্ঘ মেয়াদে পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ শীর্ষক একটি দীর্ঘমেয়াদি (১০০ বছর) সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে বিশাল অর্থায়ন প্রয়োজন। এই অর্থায়ন যোগান দেওয়া ডেল্টা প্ল্যানের সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। এটা বাস্তবায়নের করলে ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য বিরাট মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই শতবর্ষী পরিকল্পনা একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বাস্তবায়ন করবে। তবে এ জন্য সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয় প্রয়োজন।

আগামী ১০ বছরে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা

ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ এর অধীনে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ৩২০০ কোটি ডলার। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি, শিল্প উৎপাদন, সেবা ও লজিস্টিক খাতে সহনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস সরকারের মধ্যে ২০২২-৩২ মেয়াদে একটি সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ডেল্টা প্ল্যানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ২০২৬ এর পরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে। এই দুটি পরিবর্তনকে মাথায় রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া কী হবে, সেটি নির্ধারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করাও এই প্ল্যানের লক্ষ্য। কারণ উৎপাদনশীল খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে বেসরকারি খাত। কৃষি, শিল্প উৎপাদন, সেবা ও লজিস্টিক খাতে সহনশীলতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য ডাচ প্রযুক্তি ব্যবহার করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে আমরা নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা নিচ্ছি। ২০১২ থেকে ২০২২ পর্যন্ত এটির পরিকল্পনা ও বিভিন্ন প্রকল্প চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তারা আমাদের সহায়তা দিয়েছে।

ইউডি/এজেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading