মরণব্যাধি ক্যানসারের চিকিৎসা যুগান্তকারী সাফল্যের পথে
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০
বিশ্বজুড়ে ক্যানসার প্রতিরোধ ও নিমূর্লে প্রতিনিয়তই চলছে নানা গবেষণা। এবার নতুন এক কোষের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। এ নিয়ে আসাদ এফ রহমান’র প্রতিবেদন
প্রাণঘাতি রোগ নিয়ে চলছে নানা পরীক্ষা: মানুষের শরীরের যে গাঠনিক একক রয়েছে, তার নাম সেল বা কোষ। এই কোষগুলো শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত। বিভিন্ন ধরনের বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রভাবকের প্রভাবে দেহকোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি বা পরিবর্তনই হলো ক্যানসার। বিশ্বে প্রতি ছয় জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয় ক্যানসারে। শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধার সঙ্গে সঙ্গেই শনাক্ত করতে পারলে এ মরণব্যাধি থেকে রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা সহজ হবে। ক্যানসারের ব্যায়বহুল চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি ক্যানসার নির্মূলে যুগান্তকারী আবিষ্কারের খবর আসছে নিয়মিত। এর মধ্যে নতুন এক গবেষণা বলছে, মানুষের শরীরে থাকা এক ইমিউন কোষ ক্যানসার নির্মূল করতে সক্ষম। একইসঙ্গে ওই কোষ শরীরের বিভিন্ন ভাইরাসের সঙ্গেও লড়াই করতে পারে। এছাড়াও রোগপ্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সেই কোষ। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘সেলে’ এই গবেষণার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, হিউম্যান টাইপ-২ ইনন্যাট লাইমফোইড সেলস (আইএলসি২এস) নামের এ ইমিউন কোষটি মানবদেহের বাইরেও প্রসারিত করা যায় এবং এটি টিউমারের যে প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে সেটিকে পরাজিত করতে পারে এবং ক্যানসার কোষকে নির্মূল করতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকগণ বলেছেন, তারা এই গবেষণাটির ফলাফল প্রয়োগের স্বপ্ন দেখেন। এমনকি ক্যানসারের বাইরে অন্য রোগের ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা যেতে পারে। আইএলসি২এস কোষ ভাইরাসের বিরুদ্ধেও যেমন কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগী, কারণ কী: ক্যানসার কেন বাড়ছে, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খারাপ খাদ্যাভ্যাস, অ্যালকোহল ও তামাক, শারীরিক সক্রিয়তার অভাব ও স্থূলতাকে অন্যতম কারণ। চিকিৎসা সাময়িকী বিএমজে অনকোলজিতে প্রকাশিত হয়েছে এ গবেষণাটি। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯০ সালে বিশ্বে ক্যানসারে আক্রান্ত হয় ১৮ লাখ ২০ হাজারের মতো। তবে এই সংখ্যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ লাখের কাছাকাছি। এই রোগে ৪০ ও ৩০ বা তার চেয়ে কম বয়সীদের মৃত্যুর হার ২৭ শতাংশ বেড়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এখন ৫০ বছরের নিচে ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রতিবছর ক্যানসারে মারা যান বলেও জানানো হয়েছে। ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা কেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে, সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের ধারণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকেই ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে নাটকীয়ভাবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন, তামাক ও মদ্যপানের ওপর কড়াকড়ি এবং বাইরের কাজকর্ম বাড়ানো হলে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে পারে। এর আগের কিছু গবেষণায় বলা হয় ৫০ বছরের কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যানসারের ঘটনা কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বাড়ছে। গবেষকেরা বলছেন, ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জিনগত বিষয়গুলো কারণ। তবে গরু-শূকর-ছাগলের মাংস বেশি পরিমাণ খাওয়া, ফল ও দুধ কম খাওয়া এবং মদ ও তামাক অতিরিক্ত সেবন করা ৫০ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি শারীরিক কর্মকাÐ কম করা, অতিরিক্ত ওজন এবং উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসও কারণ হিসেবে আছে।
আইএলসি২এস কোষ, চিকিৎসায় নবদিগন্ত: ক্যানসার নির্মূলসহ মানবদেহে সার্স-কোভ-২ এর মতো বিভিন্ন ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে সক্ষম একটি ইমিউন কোষের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। এই কোষটি অ্যালার্জি এবং অন্যান্য রোগপ্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। বৈশি^ক মহামারি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের নেপথ্যের কারণ সার্স-কোভ-২ ভাইরাস। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই তথ্য পেয়েছেন গবেষকরা। এর আগে ইঁদুরের আইএলসি২এস কোষ নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। তবে ইঁদুরের কোষের পরীক্ষায় ক্যানসার নির্মূলের ক্ষেত্রে ওই সময় আশাব্যাঞ্জক কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহের আইএলসি২এস কোষ সরাসরি ক্যানসার নির্মূলে কাজ করে। কিন্তু ইঁদুরের কোষ সেটি করতে পারে না। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সিটি অব হোপের হেমাটোলোজি অ্যান্ড হেমাটোপোয়েটিক সেল ট্রান্সপ্ল্যানটেশন বিভাগের প্রফেসর জিয়ানহুয়া ইউ এ বিষয়ে জানান, কোষ পরিবারে আইএলসি২ কোষকে নতুন সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা , যা যে কোনো ধরনের ক্যানসারকে সরাসরি নির্মূলে সক্ষম। যার মধ্যে রক্তের ক্যানসার এবং সোলিড টিউমারও রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ভবিষ্যতে এই কোষ উৎপাদন, ফ্রিজিংয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা এবং রোগীদের দেহে প্রয়োগ করা যাবে। টি-কোষ ভুক্ত থেরাপি যেমন সিএআর টি কোষ, যেটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে রোগীর নিজস্ব কোষের প্রয়োজন হয়-আইএলসি২এস কোষের ক্ষেত্রে এমনটি প্রয়োজন হবে না। এই কোষ স্বাস্থ্যবান দাতার কাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। যেটি অ্যালোজোনিক হিসেবে আলাদা বিশেষ চিকিৎসাগত পদ্ধতি হবে। যা খুব সহজেই পাওয়া যাবে।

মানবদেহের আইএলসি২এস কোষ পরীক্ষার জন্য প্রফেসর ইউ এবং তার দল প্রথমে একটি রক্তের নমুনা থেকে এই কোষকে আলাদা করেছেন। তারা অভিনব একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। যেটি মানবদেহ থেকে সংগ্রহ করা আইএলসি২এস কোষকে ২০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে। এরপর তারা বাহ্যিকভাবে প্রসারিত করা এই কোষ সোলিড টিউমারে আক্রান্ত ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করিয়েছেন। যারমধ্যে রয়েছে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার ও গিøওবøাস্টোমা। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই প্রসারিত কোষ এসব টিউমারকে নির্মূল করতে পারে। প্রফেসর ইউ বলেছেন, একটি সন্তোষজনক সরাসরি প্রমাণ আমরা পেয়েছি যখন আমরা একটি আইএলসি২ কোষ এবং একটি টিউমার কোষ একসঙ্গে স্থাপন করেছি এবং দেখতে পেয়েছি টিউমার কোষটি নির্মূল হয়ে গেছে, কিন্তু আএলসি২ কোষটি অক্ষত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এটি প্রমাণ করে অন্যান্য কোষের অনুপস্থিতিতে আইএলসি২এস কোষ সরাসরি ক্যানসার কোষটিকে নির্মূল করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার হেমাটোলোজি অ্যান্ড হেমাটোপোয়েটিক সেল ট্রান্সপ্ল্যানটেশন বিভাগের অপর গবেষক প্রফেসর মাইকেল ক্যালিজিউরি বলেছেন, আইএলসি২এস কোষটি মানবদেহে খুবই বিরল। এটি বেশিরভাগ পাওয়া যায় ফুসফুস, নাড়িভুঁড়ি এবং ত্বকে। তবে প্রফেসর ইউ জানিয়েছেন, আইএলসি২এস কোষটি ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর নিজস্ব কোষ থেকে নিতে হবে না। অর্থাৎ ক্যানসার রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এই কোষ অন্য স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির কাছ থেকে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করে রাখা যাবে।
গেমচেঞ্জার হবে ডিএনএ পরীক্ষা: আমেরিকার একটি জৈবপ্রযুক্তি সংস্থার দাবি, তারা ডিএনএ পরীক্ষার সাহায্যে রোগের শুরুতেই ক্যানসার চিহ্নিত করার পথ খুঁজে পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, তাদের আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে ১৮ ধরনের ক্যানসার শুরুতেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সংস্থাটির দাবি, ডিএনএ পরীক্ষাটি ভবিষ্যতে ‘গেমচেঞ্জার’র মতো কাজ করতে পারে। গবেষকেরা দাবি করছেন, রক্তের প্লাজমায় উপস্থিত প্রোটিনগুলোকে পরীক্ষা করে তারা দেখেছেন, ক্যানসার রোগীদের নমুনার সঙ্গে কোনো সুস্থ ব্যক্তির নমুনার পার্থক্য রয়েছে। এমনকি আলাদা আলাদা ক্যানসারের ক্ষেত্রে পৃথক ফল পেয়েছেন তারা। এভাবেই ক্যানসার চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানীদের সন্দেহ, ক্যানসার প্রোটিন সিগন্যালগুলো লিঙ্গ-বিশেষেও আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষা, অর্থাৎ রুটিন চেক আপে এই প্লাজমা পরীক্ষাটি জায়গা করে নিতে পারে। রোগ প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ। সে ক্ষেত্রে কারও শরীরে হয়তো কোনো উপসর্গ নেই, কিন্তু ক্যানসার গোপনেই বাসা বেঁধেছে, এই পরীক্ষায় সেটা ধরা সম্ভব হবে। গবেষণায় ৪৪০ জনের রক্তের প্লাজমার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ১৮ রকমের ক্যানসার-আক্রান্ত ছিলেন। ৪৪ জন সুস্থ ব্যক্তি ছিলেন। বিজ্ঞানীদের দাবি, এমন কিছু প্রোটিন পাওয়া গেছে, যেগুলো আর্লি-স্টেজ ক্যানসার চিহ্নিত করতে পারে এবং ক্যানসারের উৎসও সন্ধান করতে সক্ষম। শুধু তা-ই নয়, বিজ্ঞানীদের দাবি, এই পরীক্ষায় নিখুঁত ফলাফলের হার বেশি। ৯৯ শতাংশ সঠিক। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আরও বেশি সংখ্যক নমুনার ওপরে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রতিরোধ ও শনাক্তকরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা: ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক সনাক্তকরণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল জুড়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দ্রুত চিকিৎসা, উন্নত পরিকাঠামো তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। ২০২০ সালে আনুমানিক ৯.৯ মিলিয়ন মানুষ গোটা বিশ্বে ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন বলে এদিন জানিয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হু’র আঞ্চলিক পরিচালক ডাঃ পুনম ক্ষেত্রপাল সিং। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ২৬ শতাংস বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে ২১ শতাংশ।
কেমোথেরাপির বিকল্প, আসছে পিল: আমেরিকার বৃহত্তম ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিটি অব হোপ স¤প্রতি এওএইচ১৯৯৬ নামে নতুন একটি পিল প্রস্তুত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রচলিত চিকিৎসাকে আমূল বদলে ফেলতে সক্ষম এই এওএইচ১৯৯৬। প্রচলিত চিকিৎসায় ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্রোপচার বা কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। তবে কেমোথেরাপির একটি বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো-উচ্চ মাত্রার রেডিয়েশন ব্যবহারের কারণে অনেক সময় ক্যানসার আক্রান্ত কোষের পাশাপাশি সুস্থ কোষগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এওএইচ১৯৯৬ প্রস্তুতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের সদস্য লিন্ডা মালকাস আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালকে জানিয়েছেন, তাদের তৈরি নতুন এই পিলটি কেবল ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকেই আক্রমণ করে, সুস্থ কোষগুলোতে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব এটি ফেলে না।

লিন্ডা জানান, মানবদেহে ক্যানসারের জন্য দায়ী মূলত প্রোলিফারেটিং সেল নিউক্লিয়ার অ্যান্টিজেন বা পিসিএনএ নামের একটি প্রোটিন। দেহের অভ্যন্তরে উৎপাদিত এই প্রোটিনটির প্রভাবেই মূলত ক্যানসারের আশঙ্কাযুক্ত টিউমার গঠিত হয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের নতুন এই ওষুধটি একদিকে এই প্রোটিনের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আঘাত হানে এবং একই সঙ্গে ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকেও নিষ্ক্রিয় করে দেয়। মার্কিন এই গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক লং গু বলেন, বিশ্বে এ পর্যন্ত ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য যত পিল উদ্ভাবিত হয়েছে, সেগুলোর একটিরও পিসিএনএ’র উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আঘাত হানার সক্ষমতা নেই। এই কারণে এতদিন পিসিএনএকে একটি ‘অনিরাময়যোগ্য’ ক্ষতিকর প্রোটিন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এওএইচ১৯৯৬ হতে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ওষুধ, যেটি ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগটির একেবারে মূলে আঘাত হানতে সক্ষম। অধ্যাপক লং গু জানান, প্রাণীদেহে ইতোমধ্যে এই পিলটি প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন তারা। সেই পরীক্ষার ফল বেশ ইতিবাচক। শিগগরই মানবদেহের ওপরও এই ওষুধটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
আশার আলো দেখাচ্ছে ‘মিরাক্যাল ড্রাগ’: স¤প্রতি ক্যান্সার নির্মূলে যুগান্তকারী এক ওষুধ আবিষ্কারের দাবি করছেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই একটি ওষুধেই নাকি ক্যান্সার পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে ১৮ জন মলদ্বারে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ওপর এই ওষুধের পরীক্ষা করা হয়েছে। আর সেই ট্রায়ালের ফলাফল বিজ্ঞানীদের আশার আলো দেখিয়েছে। ছয়মাস ধরে এই রোগীদের ওপরে গবেষণা চালানো হয়। গবেষকদের দাবি, এই রোগীদের ক্যান্সার সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই ওষুধকে ‘মিরাক্যাল ড্রাগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ওষুধ আগামীদিনে আশার আলো দেখাবে বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৮ জন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর ওপরে ডস্টারলিম্যাব (ব্যান্ড নাম জেমপেরলি) নামে একটি ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এই ওষুধে থাকা একটি জৈব অণুই মানবশরীরে অ্যান্টিবডির বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। ২০১৯ সালে গø্যাক্সো স্মিথক্লাইন অধিগ্রহণ করার আগে, ম্যাসাচুসেটসের একটি বায়োটেক কোম্পানি টেসারো এই ডস্টারলিমাব ওষুধটি তৈরি করে। যা কোলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া রোগিদের শরীরে ছয়মাস এই ওষুধ প্রয়োগের পরেই দেখা যায়, তাদের শরীরে থাকা টিউমার (ক্যানসার) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ডস্টারলিম্যাব হল গবেষণাগারে উৎপাদিত একটি ড্রাগ, যা মানবদেহে বিকল্প অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করে। মলদ্বারে ক্যানসার আক্রান্ত ১৮ জন রোগীদের সকলকে এই ড্রাগ দেওয়া হয়। এর পরই অভ‚তপূর্ব ফলাফল দেখা যায়। এরপর রোগীদের এন্ডোস্কোপি, পজিট্রন নির্গমন টমোগ্রাফি বা পিইটি স্ক্যান বা এমআরআই স্ক্যান করে শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে তাদের প্রত্যেকের শরীর থেকে তাদের মলদ্বারের ক্যান্সার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল ¯েøান কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারের গবেষক চিকিৎসক লুইস এ. ডিয়াজ জে বলেন, ক্যান্সার নির্মূলে এই ড্রাগ একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। ক্যান্সারের চিকিৎসার ইতিহাসে প্রথমবারের মত এই অভাবনীয় ফলাফল পাওয়া গেল।
ক্যানসারের এই ওষুধ চিকিৎসাজগতে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে দাবি করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অ্যালান পি ভেনুক। এই ড্রাগের ট্রায়াল রোগিদের কোনো শারীরিক সমস্যা তৈরি করেনি। তবে আরও ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেনুক। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের কথায়, এই চিকিৎসা আশার আলো দেখাচ্ছে ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। তবে এটি সব ধরনের ক্যান্সার নির্মূল করতে পারবে কিনা তা জানার জন্য আরও বড় মাত্রায় ট্রায়ালের প্রয়োজন। ২০২১ সালের ১৭ আগষ্ট আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্র্যাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জেমপেরলিকে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে কেমোথেরাপির বিকল্প হিসেবে নানা ধরনের নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন। ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে সাধারণ কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই ক্যান্সার আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা। ক্যান্সারের মানবদেহে বিস্তৃতি, এর আক্রমণের বৈচিত্র্য, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনধারা, পরিবেশের দূষণের কারণেও একে জয় করা কঠিন। তবে বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। তারা চেষ্টা করে চলেছেন কীভাবে মানুষকে এই ক্যান্সারের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা যায়।
দেশে বছরে আক্রান্ত দেড় লাখ মানুষ: আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার’র (আইএআরসি) অনুমিত হিসাব বলছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজারই মারা যান। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্য বলছে, দেশে আনুমানিক ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৩ থেকে ১৫ লাখ। গেøাবোক্যান ২০২০-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১.৫৬ লাখ নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে ১.০৮ লাখ রোগী ক্যানসারে মারা যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ মানুষ মত্যুবরণ করেন ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে। চিকিৎসকদের মতে জনসচেতনতার অভাবেই ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়ছে। ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উপদান হলো প্রাথমিক প্রতিরোধ, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সূচনায় ক্যান্সার নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রশমন সেবা বা পেলিয়েটিভ চিকিৎসা। তাই ক্যান্সার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশে ২০৩০ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে যার মূল ভুক্তভোগী হবে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের জনগণ। বর্তমানে দেশের গড়ে প্রায় ৪ কোটি পূর্ণ বয়স্ক মানুষ বিভিন্ন উপায়ে তামাক ব্যবহার করে। শুধু ধূমপান বর্জন করলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৩ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের পুরুষদের মধ্যে প্রধান তিনটি ক্যান্সার হলো ফুসফুসের ক্যান্সার, মুখ ও মুখগহŸর এবং খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর ক্যান্সার। নারীদের প্রধান তিনটি ক্যান্সার হলো-স্তন ক্যান্সার, জরায়ু ও মুখ ও মুখগহŸরের ক্যান্সার।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ প্রথম পৃষ্ঠা
চিকিৎসাসেবার সার্বিক অবস্থা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদÐ অনুযায়ী, ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে মাত্র নয়টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ছয়টি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রতিবছর রোগী বাড়লেও ক্যান্সার চিকিসার পরিধি বাড়ছে না। সরকারি পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়। এগুলোর মধ্যে ক্যান্সার হাসপাতাল ছাড়া অন্যগুলোতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। বেসরকারিভাবে রাজধানীর ইউনাইটেড, স্কয়ার, ডেল্টা, আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরে খাজা ইউনুস, নর্থ-ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা দেওয়া হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দরিদ্র মানুষের পক্ষে এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব। দেশে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। সারা দেশে মাত্র দেড়শ চিকিৎসক রয়েছেন। আটটি বিভাগে ১০০ শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা ছিল বর্তমান সরকারের মেয়াদে। ২০১৯ সালে একনেকে আট বিভাগীয় শহরে একটি করে ১০০ শয্যার ক্যান্সার হাসপাতাল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছরে তা শেষ হবে না বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্র বলছে, সরকারি ৪৬টি বিশেষজ্ঞ এবং ৪২টি শিক্ষানবিশ পদের চিকিৎসক রয়েছেন। অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে ৩২ হাজার ৬০৮ রোগীর বিপরীতে একজন চিকিৎসক রয়েছেন। ক্যান্সার চিকিৎসায় সারা দেশে ৫০০ শয্যা রয়েছে। তার মানে তিন হাজার রোগীর বিপরীতে শয্যা আছে একটি। সরকারি পর্যায়ে কোনো অনকোলজিস্ট নার্স নেই। মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া জনবল নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা চলছে। রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্টদের ৬৫ পদের মধ্যে ৩৯টিই শূন্য পড়ে আছে।
ইউডি/এজেএস

