পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে

পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৪, আপডেট ১৪:০০

‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ জইশ আল-আদলের আস্তানায় ইরানি বিমান হামলার পাল্টা জবাব দিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানে। এতে ৯জন নিহত হয়েছে। এ নিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সিরাজুল ইসলাম’র প্রতিবেদন

সন্ত্রাস নির্মূলই সবার লক্ষ্য: দুই প্রতিবেশী দুই দেশ ইরান ও পাকিস্তানের ক‚টনৈতিক সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। কিন্তু হঠাৎ ইরান মঙ্গলবার গভীর রাতে দুই দেশের সীমান্তবর্তী শহর পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রদেশের একটি গ্রামে বিমান ও ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের দাবি, জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ আল-আদলের দুটি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এতে দুই শিশু নিহত এবং তিনজন আহত হয়। এর জবাবে বৃস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) ইরানে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে পাকিস্তান। এতে নারী-শিশুসহ ৯জন নিহত হয়েছে। পাকিস্তান বলছে, তাদের হামলা ইরানের সিস্তান-বেলুচেস্তান প্রদেশে ‘সন্ত্রাসী আস্তানায়’ আঘাত করেছে। এদিকে ইয়েমেনের একাংশের নিয়ন্ত্রক হুতিদের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে তাদের উপর চতুর্থ দফা হামলা করেছে আমেরিকা। তারাও আমেরিকার জাহাজে পাল্টা হামলা করেছে। অন্যদিকে সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে জর্ডান। এতে ১০ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আমেরিকার শান্তি চুক্তির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মাঝেমধ্যেই হামলা করছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল। এছাড়া ইসরায়েল গাজায় সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস নির্মূলে নিয়মিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস দমনে ইরান এর আগে ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।

যে বার্তা দিল পাকিস্তান: পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানিয়েছে, সব ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে রক্ষার অংশ হিসেবে ইরানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। হামলার পর তেহরানকে দেওয়া সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারের হামলার জবাবে ইরান যদি ফের পাকিস্তানের ভূখণ্ডে আক্রমণ করে, তাহলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে। বৃহস্পতিবার সকালে পাকিস্তান ইরানের সিস্তান-বালোচিস্তান প্রদেশে খুবই সুসংগঠিত এবং সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান সবসময় তার ভৌগলিক নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং এসব ইস্যুতে কখনও আপস করে না। আজকের হামলার মূল কারণও এটাই। ইরানকে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ দেশ উল্লেখ করে আর ও বলা হয়, ‘ইরান আমাদের প্রতিবেশী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতার প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা পাকিস্তানের রয়েছে। কিন্তু বহু বছর ধরে আমরা বলে আসছি যে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা, যারা নিজেদের ‘সারমাচার’ বলে দাবি করে- ইরানে তাদের নিরাপদ স্বর্গ তৈরি করেছে। দেশটির এমন সব জায়গায় তারা সামরিক স্থাপনা ও আস্তানা তৈরি করেছে, যেসব এলাকায় ইরানের কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য-এই সন্ত্রাসীদের দমনে তেহরানের কোনো পদক্ষেপ আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়নি। আমরা ইরানকে অনুরোধ জানাচ্ছি, আজকের হামলার জবাবে তারা যেন পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পাল্টা কোনো হামলা আর না চালায়। ইরান যদি এ অনুরোধ না রাখে, তাহলে তার ফলাফল খুব খারাপ হবে এবং দুই ভাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাবে। প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইরান রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সেই হামলায় বেলুচিস্তানে দুই শিশু নিহতও হয়। পরে এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, বেলুচিস্তানে ইরানের সরকারবিরোধী ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ আল আদেলের ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। বুধবার সেই হামলার কঠোর নিন্দা জানায় ইসলামাবাদ। এই হামলার কঠোর পরিণতি ইরানকে ভুগতে হবে বলে সতর্কবার্তাও দেয় ইসলামাবাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারপর বৃহস্পতিবার সকালে ইরানের সিস্তান-বালোচিস্তানে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। হামলায় এ পর্যন্ত সিস্তান-বালোচিস্তানে ৩ শিশু, ৪ নারীসহ মোট ৯ জন নিহতের সংবাদ পাওয়া গেছে। ভৌগোলিক বিচারে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান এবং আফগানিস্তানের নিমরুজ, হেলমান্দ ও কান্দাহার প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে। জইশ আল আদেল মূলত সিস্তান-বালুচিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সময়ে কয়েকবার পাকিস্তানের বেলুচিস্তান থেকে ইরানের সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসিকে লক্ষ্য করে হামলার রেকর্ড রয়েছে এই গোষ্ঠীটির। ২০১২ সালে গঠিত এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ইরান।

মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব চীনের: চীন বলছে, তারা পাকিস্তান ও ইরান উত্তেজনায় মধ্যস্থতা করতে চায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) দেশটি এ আগ্রহের কথা জানায়। ইরান পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মঙ্গলবার জঙ্গিদের লক্ষ্য করে সীমান্ত এলাকায় হামলা চালায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন আন্তরিকভাবে আশা করে- উভয়পক্ষ শান্ত থাকবে, সংযম বজায় রাখবে এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়াতে পারবে। তিনি বলেন, উভয়পক্ষ চাইলে পরিস্থিতির উত্তেজনা কমাতে আমরা গঠনমূলক ভ‚মিকা পালন করতে ইচ্ছুক। পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান ও প্রতিবেশী ইরান উভয়ই তাদের সীমান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের সঙ্গে লড়ছে। দুই দেশই বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং সাংহাই কোঅপারেশন অরগানাইজেশনের সদস্য।

ইসরায়েলে ফের বড় হামলা চালাল হামাস: হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা গাজা সীমান্ত থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরে ইসরায়েলি শহর নেটিভোটকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। মঙ্গলবার প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে অর্ধশত রকেট হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল বাহিনীর বিধ্বংসী হামলার পরও হামাসের এ আক্রমণ তাদের অব্যাহত সক্ষমতা তুলে ধরে। অর্থাৎ তেল আবিব অস্ত্রাগার, টানেলসহ হামাসকে চ‚র্ণবিচ‚র্ণ করার যে দাবি করে আসছে, তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির ডানপন্থি রাজনীতিবিদরা।
এর আগে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট জানান, উত্তর গাজায় ‘নিবিড়’ স্থল অভিযান শেষ করা হয়েছে এবং শিগগিরই দক্ষিণেও সেই পর্যায়টিগুটিয়ে নেওয়া হবে বলে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার উত্তর গাজা থেকে সামরিক বাহিনীর একটি ডিভিশন প্রত্যাহার করে তেল আবিব। মঙ্গলবার সকালে হামাসের রকেট হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন সরকারের ডানপন্থি সদস্যরা সেই সিদ্ধান্তের জরুরি পুনঃপরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘হামাস এখনও পরাজিত হয়নি’: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাসি হানেবি জানিয়েছেন, হামাসের পর গাজায় কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনও হয়নি। কেননা, গোষ্ঠীটিকে এখনও পরাজিত করা হয়নি। বুধবার (১৭ জানুয়ারি) প্রতিরক্ষা বিভাগকে তিনি এই তথ্য জানান। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ৭ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় এখন পর্যন্ত মোট ২৪ হাজার ৪৪৮ প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৬১ হাজার ৫০৪ জন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর গাজায় প্যালেস্টাইনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫২৯ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
এর আগে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, হামাসকে ধ্বংস এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত না করা পর্যন্ত গাজা যুদ্ধ বন্ধ করবেন না। গাজায় যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে নেতানিয়াহু সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনার মুখেই এমন মন্তÍব্য করেছিলেন তিনি। গাজা উপত্যকায় হামাসের হাতে ১৩৬ জন ইসরায়েলি জিম্মি রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

আমির আব্দোল্লাহিয়ান

ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিল ইরান: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আব্দোল্লাহিয়ান বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ থামলে ইসরায়েল ও দেশটির স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পক্ষের হামলা বন্ধ হবে। বুধবার (১৭ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এই মন্তÍব্য করেছেন তিনি।
সোমবার ইরাকের এরবিল শহরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার একটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। শহরটিতে ইসরায়েলের কোনও গোয়েন্দা ঘাঁটি থাকার কথা অস্বীকার করেছে ইরাক। এছাড়া সিরিয়ায়ও হামলা করেছে। গাজায় চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করে আমির আব্দোল্লাহিয়ান বলেছেন, গাজায় গণহত্যা থামলে তা অঞ্চলজুড়ে সামরিক পদক্ষেপ ও সংকটের অবসান ঘটাবে। হামাস-ইসরায়েল সংঘাতে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে ইরান। গাজায় ইসরায়েলি অপরাধে আমেরিকা সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, গাজায় অগ্রগতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা। গাজায় ইসরায়েলের অপরাধ না থামলে সবাইকে ভুগতে হবে। প্রতিরোধের সব ক্ষেত্র সক্রিয় থাকবে। শুক্রবার ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এর আগে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন দিয়ে হামলা চালায় আমেরিকা ও ব্রিটেন।
আমির আব্দোল্লাহিয়ান বলেছেন, ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কর্মকাÐ নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বাগদাদের সঙ্গে বিনিময় করা হয়েছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক নৌযানে হামলা করে আসছে হুতিরা। তারা হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেছে, আমেরিকা ব্রিটেনের হামলার শক্তিশালী ও কার্যকর জবাব দেওয়া হবে।

ইয়েমেনে হুতি স্থাপনায় আমেরিকার অভিযান: আমেরিকার সামরিক বাহিনী ইয়েমেনে হুতি-নিয়ন্ত্রিত স্থাপনাগুলোতে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বুধবার (১৭ জানুয়ারি) জাহাজ এবং সাবমেরিন-চালিত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করেছে তারা। একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো হুতি গোষ্ঠীটিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেছে তারা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলাগুলো লোহিত সাগর থেকে চালানো হয়েছিল এবং সেগুলো এক ডজনেরও বেশি জায়গায় আঘাত হানে। বুধবার হুতিদের বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের তালিকায় পুনরায় তালিকাভুক্ত করার একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এই হামলা চালায় আমেরিকা। হুতি-চালিত আল-মাসিরাহ টিভি মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে জানিয়েছে, ধামার, হোদিদা, তাইজ, আল-বায়দা এবং সাদা অঞ্চলকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে, শুক্রবার ইয়েমেনজুড়ে ৬০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে মার্কিন এবং ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী। তখন তারা যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে হুতিদের ওপর একটি ব্যাপক পরিসরের অভিযান চালায়। মার্কিন ও ব্রিটিশদের নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হামলা সত্তে¡ও বাণিজ্যিক এবং সামরিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রেখেছে হুতিরা। সর্বশেষ ঘটনাটি বুধবার ঘটেছে। তখন ইয়েমেনের একটি হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে একমুখী হামলার ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সেটি এডেন উপসাগরে মার্কিন মালিকানাধীন এবং পরিচালিত এম/ভি জেনকো পিকার্ডিতে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ-পতাকাবাহী একটি জাহাজে আঘাত হানে।

আমেরিকান জাহাজে ফের হুতির হামলা: ইয়েমেনের ক্ষমতাসীন হুতিরা লোহিত সাগর অঞ্চলে মার্কিন পরিচালনাধীন দ্বিতীয় আরেকটি জাহাজে বুধবার (১৭ জানুয়ারি) হামলা চালিয়েছে। এই নিয়ে চলতি সপ্তাহে মার্কিন পরিচালনাধীন জাহাজে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালালো হুতিরা।
নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া তাদের হামলার কারণে লোহিত সাগরের জলপথে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের গতি ধীর হয়ে পড়েছে। এতে উদ্বিগ্ন পশ্চিমা শক্তিগুলো হুতিদের দমাতে তাদের সামরিক লক্ষ্যস্থলগুলোতে হামলা শুরু করেছে। ফলে গাজায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে চলা যুদ্ধের আরও বিস্তৃতি ঘটেছে।হুতিরা জানিয়েছে, তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত ও ইসরায়েলগামী সব জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। তাদের অবস্থানগুলো আমেরিকা ও ব্রিটেনের হামলার জবাবে এসব দেশের সামরিক-বেসামরিক সব জাহাজ লক্ষ্যস্থল করার হুমকি দিয়েছে হুতিরা।
বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হয়েও দমে যাওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না হুতিরা। বরং বুধবার তারা যুক্তরাষ্ট্রের মালবাহী জাহাজ জেঙ্কো পিকার্ডিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি জাহাজটিতে ‘সরাসরি আঘাত হেনেছে’ বলে দাবি করে তারা। শিপিং অপারেটর জেঙ্কো হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, তাদের জাহাজটি ফসফেট শিলা নিয়ে এডেন উপসাগর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে জাহাজটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ওই এলাকার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়। হামলায় কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে তারা। এর কয়েক ঘণ্টা পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে হুতিদের ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর জন্য অনিবার্য হুমকি ছিল’ বলে এক বিবৃতিতে বলেছে তারা।
হুতিদের বার্তা সংস্থা সাবা জানিয়েছে, ইয়েমেনের বেশ কয়েকটি এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ব্রিটেন। এরপরও তারা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন হুতিদের এক মুখপাত্র। ওই হামলার পর হুতিরা হুমকি দেয়, তাদের হামলার লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং গাজায় যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাবে তারা। লোহিত সাগরে এখন থেকে মার্কিন ও ব্রিটিশ জাহাজকেও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে। হুতিদের হামলার ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মালিকানাধীন সব ধরনের জাহাজকে লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে বুধবার হুতিদের পুনরায় সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপ নেয় বাইডেন প্রশাসন।
হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান এক বিবৃতিতে বলেছেন, হুতিরা ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। এর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘আনসারুল্লাহ’ নামে পরিচিত হুতি গোষ্ঠীকে বিশেষভাবে ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

সিরিয়ায় জর্ডানের হামলায় নিহত ১০: সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে জর্ডানের বিমান হামলায় বৃহস্পতিবার (১৮ জানুয়ারি) সকালে শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছে বলে ধারণা প্রকাশ করেছে সিরিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যম এবং সংঘাত পযর্বেক্ষকরা। তবে জর্ডান কর্তৃপক্ষ এই হামলার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। জর্ডানের সেনাবাহিনী স¤প্রতি কয়েক সপ্তাহে মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। গতমাসে ইরানপন্থি কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গির সঙ্গে সংঘাতের পর এ অভিযান শুরু হয়েছে। এই জঙ্গিরা জর্ডানের সিরিয়া সীমান্তে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ বিপুল পরিমাণ মাদক বহন করছিল। স্থানীয় পত্রিকা শাম এফএম বলেছে, জর্ডানের বিমান হামলা হয়েছে দক্ষিণ সিরিয়ার সুওয়াইদা প্রদেশের আরমান শহরের দুটো বাড়িতে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়ার নিউজ পোর্টাল সুওয়াইদাটোয়েন্টিফোর প্রদেশটিতে ঘটা সবকিছু দেখভাল করে। তারা বলেছে, রাতভর অবিরাম বিমান হামলা জর্ডান সীমান্তের কাছে প্রদেশটির দক্ষিণ-পূর্বে আরমানের আবাসিক ভবনগুলোতে আঘাত হেনেছে। খবরে বলা হয়েছে, দুই শিশু, পাঁচ নারী এবং তিন পুরুষ নিয়ে মোট ১০ জন নিহত হয়েছে। তবে হামলাটি জর্ডানের বলে শনাক্ত করা হয়নি। সিরিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষক সংগঠন ‘দ্য সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’ বলেছে, সুওয়াইদায় জর্ডানের বিমান হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছে। জর্ডান এবং এর পশ্চিমা মিত্রদেশগুলো চোরকারবার বেড়ে যাওয়ার জন্য লেবানন ভিত্তিক, ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের বেশিভাগ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখা অন্যান্য ইরান-পন্থি গোষ্ঠীগুলোকে দোষারোপ করেছে। তবে ইরান এবং হিজবুল্লাহ এইসব অভিযোগ সিরিয়ার তাদের মিত্রর বিরুদ্ধে পশ্চিমা চক্রান্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা মাদক উৎপাদন এবং চোরাচালানে জড়িত থাকার কথাও অস্বীকার করেছে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ, ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, প্রথম পৃষ্ঠা

যা আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা: ইসলামাবাদ-ভিত্তিক থিংকট্যাংক তাবাদলাবের মোশাররফ জাইদি বলেন, ইরানিরা অপ্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে চাইছে। এই মুহূর্তে আসল ঝুঁকি হলো পাকিস্তানের বৃহত্তর বিপদগুলো এমন একটি সংঘাতে আটকে যেতে পারে।
ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটিজি অ্যান্ড পলিসির জ্যেষ্ঠ পরিচালক কামরান বোখারি বলেন, পাকিস্তান হামলার মাধ্যমে জবাব দিতে পারে। যদিও এর অর্থ পাকিস্তানের জন্য একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইহসানউল্লাহ টিপু বলেন, পাকিস্তান কূটনৈতিক ও সামরিক উভয় প্রতিক্রিয়ার জন্য সম্ভাব্য বিকল্প দেখবে। পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য ন্যয্যতা ও চাপ- দুই-ই রয়েছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অব্যাহত সংঘাত সত্ত্বেও ইরানের কর্মকাণ্ডে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। গেল ডিসেম্বরে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তান যেন ইরানে হামলা থেকে যেন জইশ-আল-আদিলকে থামায়। ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের রাস্ক শহরে হামলায় ১১ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর এ সতর্কতা দেন তিনি। ২০২৩ সালের মে মাসে পাকিস্তান সীমান্তে ইরানি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হন। এক মাস আগে চার পাকিস্তানি সেনা বেলুচিস্তান প্রদেশে আন্তঃসীমান্ত গোলাগুলিতে নিহত হন। ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দেশ দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয় বলে একে অন্যকে দোষারোপ করে। ইরানের দাবি, পাকিস্তান যেন জইশ আল-আদিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সুন্নি গোষ্ঠীটি ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন সময়ে হামলা চালিয়েছে।

ইউডি/সিরাজ/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading