দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রেকর্ড : দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, আপডেট ১৫:৩০
দেশে গত কয়েক বছর ধরে দাবদাহ বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন নতুন রেকর্ড হয়েই চলেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। এ নিয়ে আরেফিন বাঁধন’র প্রতিবেদন
নেপথ্যের বড় কারণ জলবায়ু পরিবর্তন : দেশের ওপর দিয়ে চলমান মৃদু থেকে তীব্র ধরনের তাপ প্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে এবং জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। মূলত ১৯শে এপ্রিল থেকে এ ধরণের উচ্চ তাপমাত্রা অর্থাৎ দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে জনজীবনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। দুর্ভোগ এড়াতে স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ এবং নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক বছরে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রার এমন বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। আর তার ফলে বিপর্যয়কর অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে এমন আশংকা আছে তাদের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান ভূমিকা রেখেছে। সেই সাথে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে তাপমাত্রার এমন বৈরি আচরণের জন্য অপরিকল্পিত নগরায়নেরও বিশেষ ভ‚মিকা রয়েছে। দেশি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু ঢাকাতেই বছরে অসহনীয় গরম দিনের সংখ্যা গত ছয় দশকে অন্তত তিনগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্লানার্স এই গরম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বলছে – গত ২৮ বছরে ঢাকা থেকে ২৪ বর্গকিলোমিটারের সমআয়তনের জলাধার ও ১০ বর্গকিলোমিটারের সমপরিমাণ সবুজ কমে গেছে। ইন্সটিটিউট অব প্লানার্সের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ আদিল খান মনে করেন, এটা শুধু ঢাকার চিত্র নয়। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, এখন জেলা উপজেলা পর্যায়েও পুকুর বা জলাধার ভরাট করে পরিকল্পনাহীন ভবন উঠেই চলেছে। নগরগুলোর প্রতিটি ভবন পরিকল্পিত না হলে এবং এলাকাগুলোতে সবুজের ভারসাম্য আনা না হলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
দেশে তাপমাত্রায় নতুন রেকর্ড: দেশে গত কয়েক বছর ধরে দাবদাহ বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন নতুন রেকর্ড হয়েই চলেছে। এর আগে ২০২১ সালের ২৫শে এপ্রিল আগের ২৬ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রার ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড হয়েছিলো। ওইদিন দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০১৪ সালে চুয়াডাঙ্গায় ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিলো। এবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছে গত ২০শে এপ্রিল যশোরে ৪২ দশমিক ছয় ডিগ্রি। যদিও এক সাথে অনেকগুলো জায়গায় ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে এবার। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে একটি জায়গার দৈনিক যে গড় তাপমাত্রা তা থেকে পাঁচ ডিগ্রি বেড়ে গেলে এবং সেটি পরপর পাঁচদিন চলমান থাকলে তাকে হিটওয়েভ বলা হয়।
তবে অনেক দেশ এটিকে নিজের মতো করেও সংজ্ঞায়িত করেছে। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেছেন, বাংলাদেশে দাবদাহ আগে এপ্রিল-মে মাসে অনুভ‚ত হতো এবং জুনে বৃষ্টি শুরু হলে ধীরে ধীরে তা কমে যেতো।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে অগাস্ট পর্যন্ত তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এমনকি শীতকাল বা শীতের দিনের সংখ্যাই কমে গেছে গত ১০/১২ বছরে ।
সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নেবিশেষজ্ঞদের তাগিদ : আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, তাপমাত্রা ক্রমশঃ বৃদ্ধির প্রধান কারণ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, যার জন্য উন্নত বিশ্বের বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই দায়ী করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক কারণ ছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং পরিবেশের অযৌক্তিক ক্ষতি করাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞেরা। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে জলবায়ু নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, বিশেষ করে মেট্রো রেলের মতো বিদ্যুৎ চালিত গণপরিবহন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ বান্ধব ভবন নির্মাণ করতেই হবে। তিনি আরও বলেন, খাল, পুকুর-সব ভরাট হয়ে গেছে। জলাধার নেই। এগুলোই তো সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমাতে দরকার হয় । তবে, নগরায়নের পাশাপাশি শহরগুলোকে কীভাবে আরো বেশি পরিবেশবান্ধব করা যায়, সে পরিকল্পনার ওপর জোর দেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক মো. শাখাওয়াত হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হবার সাথে সাথে নগরায়ন বাড়বে। কিন্তু শহরগুলোকে একটি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় এনে, গ্রিনারি বা সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান
কংক্রিটের পরিমাণ কমাতে হবে: ইন্সটিটিউট অব প্লানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য কংক্রিটের পরিমাণ কমাতে হবে এবং বনায়ন করতেই হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে সেটা হলো ধ্বংসাত্মক নগরায়ন। ঢাকার এমন ওয়ার্ড আছে যেখানে ৯০ ভাগই কংক্রিট। গরম বেশী অনুভ‚ত হয়, কারণ নগর এলাকায় গাছপালা, জলাধার ধ্বংস করা হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত ওপেন স্পেস রাখতেই হবে। তার মতে নগরায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে সবুজের পরিমাণ বাড়িয়ে নগরের ২৫-৩০ ভাগ সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ভবনগুলোর চারদিকে স্পেস বা খালি জায়গা রাখতে হবে এবং এলাকা ভিত্তিক পুকুর বা জলাধার রাখতে পারলে তাপমাত্রা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গত, স¤প্রতি রাজউক একটি নীতি প্রণয়ন করেছে – যেখানে প্লটের আকার ভিত্তিক গাছের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। যত বেশি সবুজায়ন হবে ততই তাপমাত্রা সহনীয় হবে। জলাধার থাকতেই হবে। পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যকার দূরত্ব এবং প্রতিটি ভবনের পরিবেশ বান্ধব ডিজাইন করতে হবে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শীতাতপ যন্ত্র ব্যবহার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত।
তাপপ্রবাহ থাকবে আরও কয়েকদিন, অস্বস্তি চরমে : দেশের বেশিরভাগ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ। রোদের তেজ ও ভ্যাপসা গরমে নাকাল মানুষ। তাপমাত্রা কিছুটা কমবেশি হলেও বাতাসে জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি অনুভ‚ত হচ্ছে বেশি। তবে এ অবস্থা থেকে সহজে মুক্তি মিলছে না। আগামী কয়েকদিন চলমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রবিবার (২১ এপ্রিল) দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। তবে তা আগের দিন শনিবারের (২০ এপ্রিল) তুলনায় ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। এদিন রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা শনিবারের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি কমেছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রবিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে চুয়াডাঙ্গা তাপমাত্রা কমেছে ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় রবিবার ৩৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা শনিবার ছিল ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীতে তাপমাত্রা ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমেছে জানিয়ে এ আবহাওয়াবিদ বলেন, বাতাসের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে। কিন্তু হিটওয়েভ কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামী কয়েকদিন চলমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা/ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, পাবনা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। রাজশাহী জেলাসহ খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং ঢাকা বিভাগের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, ফেনী, কক্সবাজার, চাঁদপুর ও রাঙ্গামাটি জেলাসহ বরিশাল বিভাগ এবং রাজশাহী বিভাগের অবশিষ্টাংশ ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে এবং অন্যত্র তা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বিরাজ করতে পারে।
প্রসঙ্গত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নাভিশ্বাস ওঠা দাবদাহকে। শুধু মানুষই নয় পুরো জীবজগতকেই এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকগণ বলছেন, এই দাবদাহ বা হিট ওয়েভ মোকাবিলার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি সবুজ পরিকল্পনা। না করার চেয়ে দেরিতে করাটাও এখন সময়ের দাবি। এই পরিকল্পনায় সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে।

সামন্ত লাল সেন।
হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর : তীব্র দাবদাহের কারণে প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে সারা দেশের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন। রবিবার (২১ এপ্রিল) সচিবালয়ে এক সভা শেষে এই নির্দেশনার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, দাবদাহের কারণে কোল্ড কেস (যাদের এখন ভর্তি হওয়ার দরকার নেই) রোগীদের এই মুহূর্তে হাসপাতালে ভর্তি না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলো প্রতিক‚ল পরিবেশের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বয়স্ক ও বাচ্চারা যেন প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে না যায় সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে বলেন মন্ত্রী।

বুশরা আফরিন
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেসব পরামর্শ দিলেন চিফ হিট অফিসার : তীব্র তাপপ্রবাহের এই সময়ে অতিরিক্ত গরম মোকাবিলায় সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ‘চিফ হিট অফিসার’ বুশরা আফরিন। তিনি বলেন, পরিবার ও সমাজের সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি সম্ভব। খুব সাধারণ কিছু পন্থা অবলম্বন করে আমরা নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে পারি। যেমন, বেশি বেশি পানি পান করা, ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা, যথাসম্ভব ছায়ার মধ্যে থাকার চেষ্টা করা এবং অসুস্থ বোধ করলে বিশ্রাম নেওয়া বা বেশি খারাপ বোধ করলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
রবিবার (২১ এপ্রিল) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে সাধারণ মানুষের জন্য এসব পরামর্শ তুলে ধরেন বুশরা আফরিন। খাবার পানির সুব্যবস্থা ও ছায়াযুক্ত স্থান বাড়াতে সিটি কর্পোরেশন যথাসাধ্য চেষ্টা করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কুলিং স্পেস’-এর ব্যবস্থা করার জন্য, যেন পথচারীরা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায়, চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই আরও বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে। গত এক বছরে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বুশরা আফরিন বলেন, এর মধ্যে অন্যতম হলো বস্তি এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। কারণ তারা অন্যতম প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। সেসব জায়গায় গাছ লাগানোর মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে, সেসব গাছের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও সচেতন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এছাড়া, আবহাওয়া অধিদপ্তরসহ আরও বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি ও এনজিওর সঙ্গে আমরা যুক্ত হয়ে বেশ কিছু কার্যক্রম শিগগিরই চালু করতে যাচ্ছি। এগুলো সম্পর্কে আপনাদের বিশদভাবে অবহিত করা হবে। কল্যাণপুর ও বনানীতে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে আমরা নগর বন তৈরি করতে যাচ্ছি, যা একই সঙ্গে শীতলকরণ, বায়ু দূষণ রোধ ও মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করবে।
প্রতিনিয়ত কমছে সবুজের অংশ: দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভ‚মি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মোট বনভ‚মি এখন ১০ শতাংশেরও কম বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। একইভাবে ইট-সুরকির শহরে প্রতিনিয়ত কমছে সবুজের অংশ। তারা বলছেন, হিট ওয়েভে আক্রান্ত বাংলাদেশকে এখনই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে ১০ শতাংশ বনভ‚মিকে সঠিকভাবে বনায়ন এবং পুনরায় বনায়নের মাধ্যমে কমপক্ষে ২০ শতাংশ বনভ‚মিতে উন্নীত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে কাজ করতে হবে। বনায়ন হলো পতিত ভ‚মি বা অব্যবহৃত স্থানে একটি বন তৈরি করা। অন্যদিকে পুনঃবনায়ন হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আগুন, ঝড় ইত্যাদির কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া বনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া সামাজিক বনায়ন, উপক‚লীয় বনায়ন, কৃষি বনায়ন এবং নাগরিক বনায়নকে প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান বনভ‚মিকে সংরক্ষণ এবং পরিচর্যার মাধ্যমে জীবন্ত সবুজ আচ্ছাদনের বনভ‚মিতে পরিণত করতে হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২২ এপ্রিল ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
বনায়নের নানা সুবিধা রয়েছে। যেমন-বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কার্বন সিকোস্ট্রেশন (ঈধৎনড়হ ঝবয়ঁবংঃৎধঃরড়হ)-এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের জন্য বন প্রধান ভ‚মিকা রাখতে পারে। ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে, গ্রিস, ইসরায়েল, ইতালি, স্পেন এবং উত্তর আফ্রিকার মাগরিব দেশগুলো অতীতের অপব্যবহারের দ্বারা খালি ঢালে বন পুনরুদ্ধার করার জন্য বিশাল ভ‚মি পুনরুদ্ধার করেছিল। অর্থনীতির শীর্ষে থাকা চীনে যেখানে বনভ‚মি একসময় ৩০ শতাংশেরও বেশি জমিতে বিস্তৃত ছিল। নানাবিধ কারণে এটি প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। সেই চীনে জলাধার নির্মাণ এবং একটি বিশাল বন রোপণ কর্মসূচিসহ ভ‚মির সঠিক ব্যবহারের বড় পদক্ষেপের মাধ্যমে ২০১৫ সালের মধ্যে বনভ‚মির পরিমাণ ২০ শতাংশে উন্নীত করেছে। আমরাও এই মডেল অনুসরণ করতে পারি। বনায়নের ক্ষেত্রে মাটি, পরিবেশ এবং বনের উপযোগী দ্রæত বর্ধনশীল দেশীয় গাছ নির্বাচনে গুরুত্ব দিতে হবে। দালানকোঠার শহরের ফাঁকা স্থানগুলো গাছের আবরণের প্রভাব অনস্বীকার্য। একটি জরিপে বলা হয়েছে যে, ৩০ শতাংশ গাছের সবুজ আচ্ছাদন প্রায় ০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পারদের লেভেল কমিয়ে আনতে পারে। এখনই নগর পরিকল্পনাবিদদের সবুজ অবকাঠামো সৃষ্টিতে ফোকাসসহ নগর পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবুজ গাছপালার সাথে শহরাঞ্চলে জলাধারের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবেশকে ঠান্ডা রাখতে গাছপালার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ জলাধার বা জলাভ‚মির গুরুত্ব রয়েছে। একটি বাসযোগ্য শহরে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা দরকার হলেও ঢাকার তা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। রাজধানীর জলাধারগুলো নির্বিচার দখলের শিকার। ড্যাপ (ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা), নগর উন্নয়ন আইন, জলাধার সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশসংক্রান্ত আইনকে অমান্য করে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর দখলসহ এই নগরীর আরও বিভিন্ন পুকুর-জলাধার দখল ও ভরাট হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগের বলে উল্লেখ করেছেন পরিবেশবাদী ও সংরক্ষণকর্মীরা।
দাবদাহের কথা আসলেই জলাধারের বিষয়টি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই দাবদাহ বা হিট ওয়েভের কথা মাথায় রেখে সার্বিক বিবেচনায় ঢাকা শহরকে একটি বাসযোগ্য শহর করতে হলে দেরি না করে জলাধার সংরক্ষণ এবং দ্রæত সবুজায়নের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের জন্য এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ শীতল দেশ গড়ে তুলি।
ইউডি/এজেএস

