গুগলের নতুন এআই মডেল ‘আলফাফোল্ড৩’: বদলে দিতে পারে জীববিজ্ঞান নিয়ে প্রচলিত ধারণা

গুগলের নতুন এআই মডেল ‘আলফাফোল্ড৩’: বদলে দিতে পারে জীববিজ্ঞান নিয়ে প্রচলিত ধারণা

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১২ মে, ২০২৪, আপডেট ১৫:১০

জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগ ‘ডিপমাইন্ড’র নতুন এআই মডেল ‘আলফাফোল্ড৩’। গবেষকরা এই সাফল্যকে এক নতুন যুগের সূচনা বলে মনে করছে। এ নিয়ে আরাফাত রহমান’র প্রতিবেদন

সম্ভাবনা দেখাচ্ছে নয়া আবিষ্কার: গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগ ‘ডিপমাইন্ড’ এমন এক নতুন এআই মডেল প্রকাশ করেছে, যা জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে দাবি গবেষকদের। এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রতিক‚ল পরিবেশে ফসল ফলানো, সকল ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা দেখাচ্ছে নতুন আবিষ্কারটি। এদিকে, জীবনের সকল অণু কীভাবে একে অপরের সঙ্গে ‘খুবই নির্ভুলভাবে’ মিথস্ক্রিয়া করে থাকে, সে বিষয়েও ভবিষ্যদ্বাণী দিতে সক্ষম ‘আলফাফোল্ড৩’ নামের এআই মডেলটি। ফলে, মানবতার সবচেয়ে বিধ্বংসী কয়েকটি রোগের জন্য নতুন ওষুধ এমনকি চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে এর হাত ধরে।

অবাণিজ্যিক গবেষকদের জন্য বিনামূল্যেই এ টুল ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে ডিপমাইন্ড। এর লক্ষ্য, তারা যেন নতুন কোনও ওষুধ বা চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করেন। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুসারে, প্রতিটি জীবন্ত কোষ যেসব ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, তার মধ্যে রয়েছে প্রোটিনের তৈরি ‘মলিকুলার মেশিন’, ‘ডিএনএ’, ‘লিগান্ড’ নামে পরিচিত ছোট অনু’সহ আরও অনেক কিছুই। এগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটায়, যেখানে এমন লাখ লাখ সমন্বয়ক ব্যবস্থা আছে, সেগুলো দেখে আমরা জীবনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সত্যিকার অর্থেই বুঝতে শুরু করতে পারি, নিজস্ব বøগ পোস্টে লিখেছে ডিপমাইন্ড। মডেলটিকে বিভিন্ন অণুর তালিকা দেওয়া হলে এটি এর সমন্বিত ৩ডি কাঠামো বানিয়ে অনুমান করে, অণুগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে এটে থাকবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বলতে ঠিক কী বোঝায়? বুদ্ধি হল এমন কিছু, যা মানুষের আছে, কিন্তু যন্ত্রের নেই। একটা কম্পিউটার খুব কম সময়ে প্রচুর পরিমাণ যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করতে পারে। তার মনে রাখার ক্ষমতাও অপরিসীম। তবে সে মনে রাখতে পারে ঠিক যেমনটি শেখানো হয়েছিল। একটুও এ দিক-ও দিক নয়। এখানেই সে মানুষের কাছে হেরে যায়। যা সে আগে দেখেনি, সেটা সে কখনও অনুমান করতে পারবে না। না-দেখা জিনিস অনুমান করার পদ্ধতিও শেখানো যায়। মুখস্থ-মাস্টার কম্পিউটারকে অনুমান করতে শেখানোর জন্য নানা রকম অ্যালগরিদম আছে, যার মধ্যে মুখ্য হল আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক বা এএনএন। ডিপ লার্নিং নামের এক বিশেষ এএনএন দিয়ে তৈরি আলফা ফোল্ডকে প্রায় দেড় লক্ষ প্রোটিনের প্রাথমিক গঠন ও তাদের প্রকৃত ত্রিমাত্রিক গঠন বার বার দেখিয়ে শেখানো হয়েছে, কী করে শুধুমাত্র প্রাথমিক গঠন দেখেই কোনও অজানা প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন অনুমান করা যায়। অবিশ্বাস্য সাফল্য দেখিয়েছে এএনএ। বিজ্ঞানীরা মহল এই অপ্রত্যাশিত সাফল্যকে এক নতুন যুগের সূচনা বলে মনে করছে। অদূর ভবিষ্যতে আলফা ফোল্ডের এই সাফল্য হয়তো নতুন ওষুধ আবিষ্কারের পথ সুগম করবে।

ডেমিস হাসাবিস

গুগলের ডিপমাইন্ড যা জানাচ্ছে : লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্যার ডেমিস হাসাবিস বলেছেন, এ প্রোগ্রামে গবেষকরা এমন এক ‘টুলসেট’ পাবেন, যেটি ওষুধ আবিষ্কারের যে প্রক্রিয়া, তার গতি ব্যপক বাড়িয়ে দিতে এবং বৈশ্বিক জীববিজ্ঞান নিয়ে প্রচলিত ধারণা একেবারে বদলে দিতে পারে। ডিপমাইন্ডের দল বলেছে, অ্যালফাফোল্ড ৩’কে শক্তি দেয় ‘আলফাফোল্ড সার্ভার’ নামে পরিচিত বিনামূল্যের টুল, যা প্রচলিত সেরা উপায়গুলোর চেয়েও ৫০ শতাংশ বেশি নির্ভুল। এ ছাড়া, বিভিন্ন এমন অনুমান যা স্বাভাবিক উপায়ে বের করতে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যায়, সেগুলোও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বের করতে পারে এটি। ডিপমাইন্ডের পণ্য ব্যবস্থাপক ধাভান্থি হারিহারান বলেন, মাত্র কয়েকটি বাটন ক্লিক করার মাধ্যমে অগণিত জৈবিক অণু তৈরি করার ‘ওয়ান-স্টপ সলিউশন’ হল আলফাফোল্ড সার্ভার।

প্রোটিন কীভাবে অন্যান্য অণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটায়, সে বিষয়টি অনুমান করার জন্য এ মুহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল এআই টুল এটি। স্যার ডেমিস বলেন, এর পূর্বসূরী ‘আলফাফোল্ড ২’ কাঠামোগত জীববিজ্ঞানে যে ‘বড় মাইলফলক’ অর্জন করেছিল, তার ভিত্তিতেই নতুন মডেলটি তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, মানবদেহে তৈরি প্রায় সকল প্রোটিনের কাঠামো অনুমান করেছিল এর আগের মডেলটি। এদিকে, আলফাফোল্ড ৩-এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এর সর্বশেষ সংস্করণে।
প্রসঙ্গত, জীববিজ্ঞানের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ প্রোটিনের আকার-আকৃতি আগে থেকে বলে দেয়ার ব্যাপারটি একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এলগোরিদম কতটা ভালভাবে কাজ করে তার দ্বারা নিরুপিত হয়। এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল এ্যাসেসমেন্ট অব প্রোটিন স্ট্রাকচার প্রেডিকশন (সিএএসপি)। এটা হলো দ্বিবার্ষিক গবেষণা ও প্রতিযোগিতা যা শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। একে কৌতুক করে নাম দেয়া হয়েছে ‘অলিম্পিক অব প্রোটিন ফোল্ডিং।’ এতে বেশ কিছু প্রোটিনের আকার-আকৃতির পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষমতা এলগোরিদমগুলোর আছে কিনা তা অন্ধভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়।

সিএএসপিতে ডিপমাইন্ডের প্রথম প্রবেশ ঘটে দু’বছর আগে। তখন এর নাম দেয়া হয়েছিল আলফাফোল্ড। তখনকার অন্য আর সব প্রোগ্রামের তুলনায় এটি অনেক ভাল ফল দিয়ে সাড়া ফেলেছিল। আলফাফোল্ড-২ সেই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এর আগ পর্যন্ত ‘ডিপমাইন্ড’ গেমস বিশেষ করে ‘গো’ গেম খেলতে কম্পিউটারকে শেখানোর কাজে তার সাফল্যের জন্য সর্বাধিক পরিচিত ছিল। ‘গো‘ খেলার কৌশল বাহ্যত সহজ দেখালেও আসলে তা ছিল জটিল। ২০১৬ সালে ‘ডিপমাইন্ড’ আলফা গো’ নামে এক প্রোগ্রাম বিশ্বের সেরা ‘গো’ খেলোয়াড়দের অন্যতম লী সিডলকে হারিয়ে দিয়েছিল। বাহ্যিকভাবে দেখলে এর তেমন তাৎপর্য নেই মনে হলেও ‘ডিপমাইন্ড’-এর প্রধান ড. ডেমিস হাসাবিসের মতে প্রোটিনের ভাঁজ খাওয়া এবং ‘গো’ খেলাÑএই দুইয়ের মধ্যে অধিকতর সাদৃশ্য আছে। একটি সাদৃশ্য হলো এই যে কম্পিউটারের পাশবিক বল দিয়ে উভয়ের সমস্যার সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। ১০ কে ১০ দিয়ে ১৭০ বার গুণ করলে যে সংখ্যা দাঁড়ায় গো বোর্ডে প্রায় সমসংখ্যক স্টোনের বিন্যাস আছে। মহাবিশ্বে যত সংখ্যক এটম আছে এটা তার চেয়েও অনেক বেশি। এই সংখ্যাটা যে কোন কম্পিউটারের আওতার বাইরে যদি না কম্পিউটেশনাল কোন শর্টকাট পথ বের করা যায়।

ডিপমাইন্ড

প্রোটিনের কাঠামো রহস্যে আলফাফোল্ড-২: প্রোটিন জীবনের জন্য অপরিহার্য। জীবনের কার্যত সমস্ত কাজ এই প্রোটিনের সহায়তায় হয়। প্রোটিন হলো এ্যামাইনো এ্যাসিডের শৃঙ্খল দিয়ে গঠিত মলিকুলের বিশাল কমপ্লেক্স। প্রোটিন কি করে তা বহুলাংশে নির্ভর করে এর অনন্য থ্রি-ডি বা ত্রিমাত্রিক কঠোমোর ওপর। প্রোটিন কোন্্ আকারে ভাঁজ নেয় সেটাই প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যা হিসেবে পরিচিত। গত ৫০ বছর ধরে এটাই জীববিজ্ঞানের এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রোটিনের আকার তার কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই কাঠামোর পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষমতার দ্বারাই উন্মোচিত হতে পারে প্রোটিন কি করে এবং কিভাবে কাজ করে সেই রহস্য। বিশ্বের সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জগুলোর অনেকগুলোই প্রোটিন এবং সেগুলোর ভ‚মিকার সঙ্গে মৌলিকভাবে যুক্ত। যেমন রোগ-ব্যাধির চিকিৎসা উদ্ভাবন কিংবা শিল্পবর্জ্য ভেঙ্গে দিতে পারে এমন এনজাইম খুঁজে বের করা। এক দশক আগে ডিপমাইন্ড চালু হওয়ার সময় বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিন বিজ্ঞানের মৌলিক সমস্যাবলী অনুধাবনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। আলফাফোল্ডের বিস্ময়কর নির্ভুল মডেলগুলোর বদৌলতে এখন প্রোটিনের কাঠামো রহস্য সমাধানের সুযোগ ঘটেছে। কোষের পর্দাগুলোর মধ্য দিয়ে সিগন্যাল কিভাবে পরিবাহিত হয় তা জানতে বিজ্ঞানীরা এর মাধ্যমে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কারণ প্রোটিন কাঠামোর পূর্বাভাস সুনির্দিষ্ট কিছু রোগ-ব্যাধি পুরোপুরি অনুধাবনে অবদান রাখতে পারে। সেই প্রোটিনগুলোকে ঠিকমতো চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

এতে করে ওষুধ উদ্ভাবনে আরও সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করা সম্ভব হবে। পরিচিত রোগ-ব্যাধি অনুধাবনের কাজ ত্বরান্বিত করা ছাড়াও আলফাফোল্ড-২ এলগোরিদমের সহায়তায় আরও কোটি কোটি প্রোটিন খুঁজে বের করা, সেগুলোর ভেতরের রহস্য উন্মোচন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এ হলো জীববিজ্ঞানের অজ্ঞাত জগতের সুবিশাল পরিমণ্ডল। এতে কয়েক দশক ধরে ল্যাবের পরীক্ষা-নিরীক্ষাই ছিল প্রোটিন কাঠামোর একটা ভাল চিত্র পাওয়ার প্রধান উপায়। ১৯৫০-এর দশক থেকে প্রোটিনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ণয়ের কাজ শুরু হয়। এতে ব্যবহার করা হয় এমন এক কৌশল যেখানে এক্স-রে রক্ষী কেলাসিত প্রোটিনের গায়ে ফেলে প্রোটিনের আণবিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। একে বলে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। এর সাহায্যেই এতদিন বেশিরভাগ প্রোটিনের কাঠামো উন্মোচন করা হয়েছে। তবে বিগত দশকে সাইরো-ইএম কৌশলটা অনেক-স্ট্রাকচারাল-বায়োলজির ল্যাবগুলোতে পছন্দের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে আলফাফোল্ড-২ এলগোরিদম।

নির্ভুলতার দিক দিয়ে আগের কৌশলগুলো যেখানে ১০০তে ৭০ কি ৭৫ ভাগ ফল দিত সেখানে আলফাফোল্ড দিচ্ছে ৯০/৯৫ ভাগ নির্ভুল ফল। আলফাফোল্ডের পূর্বাভাস এমন একটি ব্যাকটেরিয়াল প্রোটিনের কাঠামো নির্ণয়ে সহায়ক হয়েছে যা লুপাস ল্যাব বহু বছর ধরে উন্মোচনের চেষ্টা করে আসছিল। আলফাফোল্ড-২ এলগোরিদম মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে এই কাঠামোটি উন্মোচন করে ফেলে যে কাজটা করতে এক দশক ধরে যথাসাধ্য প্রয়াস পাওয়া গিয়েছিল। এমন লক্ষণও দেখা গেছে যে প্রোটিন কাঠামোর পূর্বাভাস ভবিষ্যতে মহামারী মোকাবেলার উদ্যোগে সহায়ক হতে পারে।

নানাবিধ মেডিক্যাল গবেষণায় নতুনত্ব: অন্য সব ক্ষেত্রের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবদান প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ওষুধ গবেষণা এবং রোগ নির্ণয়ে এআইভিত্তিক টুলসের ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এগিয়ে দিয়েছে। এআই রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, চিকিৎসাপ্রক্রিয়া এবং চিকিৎসা গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসার মান উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে এআইয়ের ব্যবহারের সঙ্গে কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে। মেশিন লার্নিং মানুষের চেয়ে বহু গুণ নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় করতে সক্ষম। রোগীর শরীরে কী হচ্ছে সেটা জানার জন্য ডাক্তাররা নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন, যেমন—এক্স-রে, এমআরআই বা নানাবিধ রক্ত পরীক্ষা। রোগীর উপসর্গ, তার পারিবারিক ইতিহাস, বয়স, ওজন ও অন্যান্য ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করেই এআই সম্ভাব্য সমস্যাগুলো নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু উপসর্গ বিশ্লেষণ করেই হৃদরোগ বা মৃগী রোগের মতো জটিল রোগও এআই মডেলগুলো ধরে ফেলতে পেরেছে। সাধারণত একজন ডাক্তারের পক্ষে তথ্যের এরূপ গভীর বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না। নতুন সব ওষুধ আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজন রোগ ও সেটির চিকিৎসার তথ্যগুলোর বিশ্লেষণ। সেই কাজে মেশিন লার্নিং খুবই কার্যকর। একই গবেষণার জন্য যেখানে নতুন ওষুধ তৈরির উপায় বের করা, পরিশোধন ও পরীক্ষার জন্য লেগে যেত কয়েক দশক; সেটাকে মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে কয়েক বছরে নামিয়ে আনা যাচ্ছে। তার বড় উদাহরণ কভিড-১৯-এর প্রতিষেধক। এ ছাড়াও নানাবিধ রোগ ছড়িয়ে পড়া ও মহামারির ঐতিহাসিক তথ্য ও বর্তমান মানবসভ্যতার প্রসার এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের তথ্য নিয়ে গবেষণা করে ভবিষ্যতের মহামারির পূর্বাভাসও এআই দিতে সক্ষম। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে রোগ বিস্তারের আগেই সেটা করা যাবে প্রতিরোধ।

বহুভাবেই চিকিৎসায় এআইয়ের ব্যবহার করা গেলেও, সেটি ব্যবহারের নানাবিধ ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়াও অনেক বিশেষজ্ঞই এআইয়ের ওপর এর ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছেড়ে দিতে একেবারেই নারাজ। ফলে কাটছে না বিতর্ক। এআইয়ের নিজস্ব কোনো বায়াস নেই। তবে সেটা ট্রেইন করার জন্য যে ডাটাসেট ব্যবহার করা হয়, সেটা যদি গোড়া থেকেই বৈষম্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এআইয়ের অ্যালগরিদমেও সৃষ্টি হবে বৈষম্যে। যথাযথ ডাটাসেট তৈরি করা এবং সেটার মধ্যে বৈষম্য আছে কি না সেটা পরীক্ষা করা অতীব জরুরি। যেমন—যদি রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ সুস্থ দেহে কতটুকু থাকে, সেই ডাটাসেটে পুরুষের পাশপাশি নারীদের তথ্যও না দেওয়া হয়, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এআই প্রত্যেক নারীকেই অসুস্থ বিবেচনা করবে, কেননা নারীদের স্বাভাবিকভাবেই হিমোগ্লোবিন পুরুষদের চেয়ে কম থাকে।

আবার অ্যালগরিদমকে যদি দ্রুত ডাটা প্রসেস করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে বলা হয়, তাহলে হয়তো সেটি অ্যাকুরেসি কমিয়ে প্রসেস করবে। মেশিন লার্নিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—ডাটাসেট দিয়ে এআই ট্রেনিং করার পর সেটা কিভাবে কাজ করে, সেটা কেউই পরিষ্কারভাবে জানতে পারবে না। এআইয়ের তৈরি নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতরের যুক্তিতর্ক সরাসরি দেখার কোনো উপায়ও নেই। তাই সৃষ্ট ফলাফল অনেকবার ম্যানুয়ালভাবে পরীক্ষা করে তবেই নির্ভরযোগ্য হিসেবে ধরে নিতে হয়।

নতুন রেনেসাঁর যুগ আনবে এআই: বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিপ্লব আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এরমধ্যেই বিজ্ঞানীরা এআই এর সাহায্যে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান থেকে শুরু করে ব্যাটারি ও সৌরকোষ তৈরির নতুন উপাদান তৈরি, এমনকি পারমাণবিক ফিউশন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন। আগামীর পৃথিবীর জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ এসব গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যুক্ত করে গবেষণায় নবগতি আনা গেছে। লন্ডন-ভিত্তিক এআই ল্যাব গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস মনে করেন, আবিষ্কারে নতুন রেনেসাঁর যুগ আনবে এআই। মানুষের সৃজনশীলতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলার বাহনের কাজ করবে। এআই’কে তিনি টেলিস্কোপের সাথে তুলনা করেন। কারণ টেলিস্কোপ যেমন বিজ্ঞানীদের দূর মহাকাশের অজানাকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনিভাবে এআই-ও আরো দূরদর্শী গবেষণায় সাহায্য করবে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, মহাকাশ বিজ্ঞান, চিকিৎসা-সহ গবেষণার প্রায় সব খাতে নতুন যুগ আনছে এআই। বিদ্যমান গবেষণার সাথে কম্পিউটারের তথ্য বিশ্লেষণ সক্ষমতার যোগসূত্র স্থাপন করেছে এআই, এভাবে নতুন আবিষ্কারকে সে পথ দেখাচ্ছে।

অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের ড. মার্ক জিরোলামি একথাই স্মরণ করিয়ে দেন যে, মানুষের মৌলিক গবেষণার বিকল্প নয় এআই। বরং বিদ্যমান তথ্যের মধ্যে থাকা শূন্যস্থানগুলোকে পূরণ করতে পারে। এ হিসেবে এআই বর্তমানে সংযোগ স্থাপনের ভালো মাধ্যম। কিন্তু, আগামীতে হয়তো এর চেয়েও বেশি উন্নত হবে। ১৯৬০ এর দশক থেকেই গবেষণায় খাতে এআই ব্যবহার হয়েছে। তবে এর বেশিরভাগ সময়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সীমিত ছিল-কম্পিউটার কোডিং এ দক্ষতা থাকা বিজ্ঞানীদের মধ্যে। যেমন গণিত বা কণা পদার্থবিদ্যার- মতো খাতেই তা ছিল সীমাবদ্ধ। তবে সা¤প্রতিক সময়ে ডিপ মেশিন লার্নিয়ের বিকাশ ঘটেছে অপকল্পনীয় গতিতে। ২০২৩ সাল নাগাদ গবেষণার প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই এআই এর মাধ্যমে ফলাফল অর্জন করা হচ্ছে। এ তথ্য জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞান সংস্থা- সিএসআইআরও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বহুল প্রচলনকে প্রযুক্তিটির ‘গণতান্ত্রিকায়ন’ বলে অবিহিত করেন লন্ডনের অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক মার্ক জিরোলামি।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১২ মে ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা

তার মতে, আগে এআই টুলস ব্যবহার করতে কম্পিউটার-বিজ্ঞানের ডিগ্রীধারী হতে হতো গবেষককে। জটিল প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ লিখতে- এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, সহজে ব্যবহারযোগ্য (ইউজার ফ্রেন্ডলি) এআই টুলস দিয়েই এখন প্রোগ্রামিং ভাষা লেখা যাচ্ছে। ওপেনএআই এর তৈরি চ্যাটবট-চ্যাটজিপিটি যার অন্যতম উদাহরণ। ফলে বিজ্ঞানীরা নিরলস ও একনিষ্ঠ এক গবেষণা-সহকারী হিসেবে পাচ্ছেন এআইকে, বিপুল পরিমাণ তথ্য চোখের নিমিষে বিশ্লেষণ করে দিচ্ছে এসব প্রোগ্রাম। তথ্যগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক যোগসূত্রও খুঁজে দিচ্ছে। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স (উপাদান বিজ্ঞান)- এর কথাই ধরুন, ওষুধ আবিষ্কারের মতোন এখাতেও অগণিত ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক গঠনের উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয় বিজ্ঞানীদের। তাই উন্নত ব্যাটারি তৈরির জন্য উপযুক্ত উপাদান খুঁজে পেতে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ‘অটোএনকোডার’ নামক একটি এআই মডেল ব্যবহার করেন। ইনঅর্গানিক ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার ডেটাবেজে-দুই লাখ রকম স্থিতিশীল স্ফটিক-সদৃশ উপাদানের রাসায়নিক গঠনের তথ্য রয়েছে।

অটোএনকোডার এই সমস্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে সঠিক উপাদানের সন্ধান করেছে। ব্যাটারির নতুন উপাদানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কোন বস্তুগত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, এর আগে এআই’টিকে সেবিষয়ে প্রশিক্ষিত করেছিলেন বিজ্ঞানীরা, অনুসন্ধানের সময় এই জ্ঞানকে কাজে লাগায় এনকোডার। এভাবে সে পাঁচটি উপাদান শনাক্ত করে যে ফলাফল দেয়– তাতে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা ও শ্রম বেঁচে গেছে বিজ্ঞানীদের। এগিয়েছে গবেষণার মেয়াদ। নাহলে গবেষণাগারে লাখো ধরনের উপাদান তাদের একে একে বিশ্লেষণ করতে হতো।

ইউডি/এজেএস

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading