দেশে বাতের কষ্টে ভোগা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৩ মে, ২০২৪, আপডেট ১৫:০০
দেশে বাত-ব্যথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, কেননা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে রোগীর সংখ্যা। সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেওয়ায় এসব সমস্যায় ‘অল্প’ বয়সেই ‘বৃদ্ধ’ হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে সাদিত কবির’র প্রতিবেদন
‘অল্প’ বয়সেই ‘বৃদ্ধ’ হচ্ছেন মানুষ: দেশে ক্রমেই বাড়ছে বাতের কষ্টে ভোগা মানুষের সংখ্যা। শুরুতে সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি নিয়মমাফিক জীবনযাপন করা গেলে বাতের যন্ত্রণা থেকে অনেকটা স্বস্তি পেতে পারেন রোগীরা। উদ্বেগের বিষয় হলো সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেওয়ায় এসব সমস্যায় ‘অল্প’ বয়সেই ‘বৃদ্ধ’ হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, এমনকি এতে করে ঝুঁকিতে পড়ছে অসংখ্য রোগীর জীবন। চিকিৎসকদের মতে, বাতের রোগীদের ওপর গবেষণা বাড়ানো গেলে আরও সুনির্দিষ্ট করে এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও দেশে বাত-ব্যথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সম্প্রতি বাত-ব্যথা রোগীদের জন্য কাজ করা সংগঠন প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অষ্টমবারে মতো আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। বাত-ব্যথা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস। তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে দেশভেদে ২৫-৫০ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন গিরা/পেশির ব্যথায় ভুগছেন। নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি ভুগে থাকেন। গিরা-ব্যথার কারণে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কাজ করতে অক্ষম হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, আর্থ্রাইটিস কোন একক রোগ নয়; এটি অনেকগুলো রোগের প্রধান লক্ষণ। ২০১৩ ও ২০১৬ সালে আলাদাভাবে দুটি গবেষণা চালানো হয় যেখানে আর্থ্রাইটিসের ১০০ প্রকার উল্লেখ করা হয়। প্রদাহের কারণভেদে এ রোগটিকে সাধারণত অস্টিও আর্থ্রাইটিস, ইনফ্লামেটরি বা ওটোইম্যুন আর্থ্রাইটিস যার মধ্যে রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস, গাউট, সংক্রমণজনিত আর্থ্রাইটিস, জুভেনাইল আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি শ্রেণিভুক্ত করা হয়ে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বে রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিসবেশি দেখা গেলেও বাংলাদেশে অস্টিওআর্থাইটিস এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়, যা পুরুষদের চেয়ে নারীদের ক্ষেত্রে চারগুণ বেশি। সর্বোপরি ইনফ্লামেটরি বা ওটোইম্যুন আর্থ্রাইটিস নারীদের বেশি আক্রান্ত করে থাকে। ইনফ্লামেটরি বা ওটোইম্যুন আর্থ্রাইটিসের প্রধান লক্ষণগুলো হলো অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যথা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া ও শক্ত হয়ে যাওয়া।
এ ছাড়া এ রোগের অন্য উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাতঃকালীন জড়তা, চলাফেরায় জড়তা, মাংসপেশিতে ব্যথা, জয়েন্টের ফ্লেক্সিবিলিটি কমে যাওয়া। প্রকারভেদে ভিন্ন ভিন্ন আর্থ্রাইটিস বিভিন্ন জয়েন্টকে আক্রান্ত করে থাকে। রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস প্রধানত দুই হাত বা পায়ের ছোট ছোট পাঁচ বা তার অধিক জয়েন্টকে আক্রান্ত করে থাকে। এ ছাড়া যেসব সন্ধিতে এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, সেগুলো হল হাঁটু, কনুই, রিস্ট ও শোল্ডার জয়েন্ট। আর্থ্রাইটিসে চিকিৎসা না নিলে কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে জয়েন্ট ডিফরমিটি বা বিকৃতি হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন কত মানুষ : ২০২২ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে যে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ ১১ কোটি। সেই হিসাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ভুগছেন (৭ দশমিক ৩ শতাংশ)। তথ্য অনুযায়ী, হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে নারীরা বেশি ভুগছেন। পাশাপাশি শারীরিক স্থূলতা ও হাঁটুতে আগে আঘাত পাওয়া ব্যক্তিদের এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে কোমর ব্যথা বাতের (লাম্বার স্পনডাইলাইটিস) প্রকোপও অনেক বেশি। বাত নিয়ে দেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১৮.৬ শতাংশ (২ কোটি ৫ লাখ বেশি) এ সমস্যায় ভুগছেন। অন্যদিকে, যৌবন বয়সের বাত রোগীদের স্পনডাইলো আর্থ্রাইটিসে আক্রান্তের হারও উদ্বেগজনক। গবেষণার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের ১.২ শতাংশ (সাড়ে ১৩ লাখ) মানুষ এ সমস্যায় ভুগছেন। এর বাইরে যেকোনো ধরনের ব্যথায় ভোগা মানুষ নিজেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে গাউট রোগের চিকিৎসা নেন। যেখানে ইউরিক অ্যাসিডসহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। তবে তথ্য বলছে, গাউট সমস্যায় ভুগছেন দেশের মাত্র ০.৫ শতাংশ (সাড়ে ৫ লাখ) মানুষ। তবে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে ৩৩ শতাংশ মানুষের। তবে তারা গাউটের রোগী নন। কিন্তু গাউটের ওষুধ সেবন করেন, যা একটা সময় শারীরিক অন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। গবেষণা বলছে, দেশের প্রায় ১১ লাখ মানুষ সোরিয়েটিক আর্থ্রাইটিস রোগে ভুগছেন। এটি গিঁটের এক ধরনের প্রদাহ, যা সোরিয়াসিস বা চর্ম রোগীদের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। আক্রান্ত গাঁটগুলো ফুলে যায় এবং প্রায়ই যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। প্রবন্ধে অন্যান্য দেশের বাত ব্যথা রোগীর পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। বলা হয়, একসময় এশিয়ায় প্রতি লাখে ৩০-৫০ জন মানুষ এসএলই বা লুপাস রোগে ভুগতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
১৯৯৩ সালে প্রতি লাখে ১৪-৬০ জন মানুষ লুপাস সমস্যায় ভুগতেন। তবে ভালো চিকিৎসার কারণে এই রোগীর সংখ্যা কমছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ায় প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয় রোগে ভুগছেন। ২০২২ সালের গণশুমারি অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৫০ উর্ধ্ব বয়সী মানুষ প্রায় ৩ কোটি। সেই হিসেবে দেশের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় এই হাড়ক্ষয় রোগে মেরুদন্ডের হাড় ভাঙার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি এবং এই রোগের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি প্রায় ৮ গুণ বেড়ে যায়। অবশ্য আশার কথা ওষুধ সেবন করে ৬-১২ মাস চিকিৎসা করলে এই রোগ থেকে হাড় ভাঙার ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে কমে আসে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট উদ্বেগ বাড়াচ্ছে: চিকিৎসকরা জানান, দেশে বাতের কষ্টে ভোগা মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং নিয়মমাফিক জীবন পরিচালনা করা গেলে বাতের যন্ত্রণা থেকে অনেকটা স্বস্তি পেতে পারেন রোগীরা। কিন্তু সঠিক সময় উপযুক্ত চিকিৎসা না করা গেলে রোগীরা খুবই ঝুঁকিতে পড়বেন। তারা বলছেন, বাতের রোগীদের ওপর গবেষণা বাড়ানো গেলে আরও সুনির্দিষ্ট করে এ বিষয়ে তথ্য উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও দেশে বাত ব্যথা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংকট দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে বাতজনিত রোগের চিকিৎসক বা রিউমাটোলোজিস্টদের সংখ্যা খুবই কম বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এজন্য দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রিউমাটোলোজি বিভাগ খোলা উচিত বলে জানান তারা। জানা যায়, দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে রিউমাটোলোজিতে এমডি কোর্স করার সুযোগ নেই। তাই সরকারি বড় বড় হাসপাতালে এ কোর্স চালু করা প্রয়োজন। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে কিছু কিছু সরকারি হাসপাতালে বহির্বিভাগে রিউমাটোলোজি বিভাগের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসায় কি বাত সারে? : আর্থ্রাইটিস রোগীর বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে যেমন- ওষুধপত্র, ব্যায়াম, অকুপেশনাল থেরাপি, মানসিক পরামর্শ, সার্জারি। কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে কোনো চিকিৎসায় আর্থ্রাইটিস সম্পূর্ণ সারে না, বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কিংবা অস্ট্রিও আর্থ্রাইটিস। ইনফেকশাস আর্থ্রাইটিস ভিন্ন কথা। চিকিৎসকরা বলছেন, মেডিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথামুক্ত থাকা যায় ও প্রদাহ কমানো যায়। এ রোগের অগ্রসরণ মন্থর করে দেয়া যায় এবং অস্থিসন্ধিকে স্থায়ী ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে রক্ষা করা যায়, প্রয়োজনে সার্জারির মাধ্যমে অস্থিসন্ধির কাজকর্মের উন্নতি ঘটানো যায় এবং সারা জীবন রোগীকে ও রোগীর অস্থিসন্ধিগুলোকে সচল রাখা যায়। একজন রোগীর জন্য কোনো একক চিকিৎসা নেই। বেশির ভাগ রোগীর সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দেখা গেছে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন, ব্যায়াম ও ভিটামিটই ভালো কাজ করে, অন্য অন্য রোগীর ক্ষেত্রে গোল্ড মল্ট, হট বাথ ও মাছের তেল ভালো কাজ করে; আবার অন্যদের ক্ষেত্রে কোনো ওষুধই কোনো কাজ করে না। অস্থিসন্ধি বা মাংশপেশির ব্যথার ক্ষেত্রে কখন ডাক্তার দেখাবেন। যদি আপনার ব্যথা তীব্র না হয় এবং তা কয়েক দিনের বেশি না থাকে তাহলে আপনার আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু যদি আপনার ব্যথা কয়েক দিনের চেয়ে বেশি থাকে, কয়েক সপ্তাহ পর আবার দেখা দেয় কিংবা ব্যথা এত তীব্র হয় যে তা আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায় তাহলে বুঝতে হবে চিকিৎসক দেখানোর সময় হয়েছে। এক বা একাধিক অস্থিসন্ধিতে ফোলা থাকলে বুঝতে হবে সেখানে কোনো সমস্যা আছে। একইভাবে শরীরের দুই পাশের অস্থিসন্ধিগুলোতে একই সময়ে ব্যথা হলে কিংবা অস্থিসন্ধির ব্যথার সাথে অবসন্নতা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। বর্তমানে বেশির ভাগ চিকিৎসক মনে করেন যদি আপনি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন তাহলে আপনার অস্থিসন্ধিতে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এটা জানা গেছে যে অস্থিসন্ধির স্থায়ী ক্ষতি বেশ আগেই ঘটে, কখনো কখনো উপসর্গ দেখা দেয়ার কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে। বিস্তারিত সাইনোভিয়াল টিস্যু অস্থিসন্ধির মধ্যে কার্টিলেজকে আক্রমণ করে, এর ফলে কার্টিলেজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। একবার এই ক্ষতিসাধন হলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। এ জন্য বর্তমানে অনেক চিকিৎসক বিশ্বাস করেন রোগের শুরুতেই চিকিৎসা করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে রোগীকে পরবর্তীতে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় না।
বাতের ব্যথার যত প্রকারভেদ: আর্থ্রাইটিস হচ্ছে এমন একটি রোগ, যেটিতে হাড়ে বা হাড়ের জয়েন্টে প্রদাহ হয়। এটিকে বাংলায় বাতের ব্যথাও বলা হয়ে থাকে। আর এ সমস্যাটি যে কোনো ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেকেই মনে করেন যে, বাতের ব্যথার সমস্যা বয়স বেশি হয়ে গেলে হয়। কিন্তু এ সমস্যাটি ৩০ বছরের মধ্যেও হতে পারে। আর এমনটি হয়ে থাকলে তাকে কিশোর বাত বলা হয়। আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যার বিষয়ে আমরা অনেকেই কমবেশি শুনে থাকি। এ রোগের ব্যথা পা, হাত, নিতম্ব, হাঁটু, পিঠের নিচে এবং শরীরের অন্যান্য অংশেও হতে পারে। কিন্তু এই রোগটির কারণ ও করণীয় সম্পর্কে আমরা অনেকেই তেমন কিছু জানি না। এ কারণে আজ জানুন চার কারণে হতে পারে আর্থ্রাইটিস রোগ শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র যখন নিজের শরীরকেই ভুল করে আক্রমণ করে তখন তাকে অটোইমিউন রোগ বলে। এটি হলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম সংক্রমণের পরে বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং শরীরের টিস্যুতেই আক্রমণ করে।
আর এর ফলে জয়েন্টগুলোতে প্রদাহ হয়। পরে এটি শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর্থ্রাইটিস রোগের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ প্রকারের মধ্যে একটি হচ্ছে অস্টিওআর্থ্রাইটিস। হাড়ের জয়েন্টগুলো অতিরিক্ত ব্যবহার করা হলে হতে পারে। আর এটি সাধারণত বার্ধক্যের ফল হিসেবে এবং অতিরিক্ত স্থূলতার কারণেও হতে পারে। শরীরে হাড়ের জয়েন্টগুলোতে বারবার চাপ বা আঘাতের ফলে আর্থ্রাইটিস হতে পারে। যদিও বয়স বৃদ্ধির কারণে এটির ঝুঁকি বেশি হয়ে থাকে। তবে নির্দিষ্ট জয়েন্টের আঘাতের কারণে তরুণাস্থি টিস্যুর ক্ষতি হলে অস্টিওআর্থ্রাইটিস হতে পারে। আর তরুণাস্থি চচ্ছে একটি নমনীয় সংযোগকারী টিস্যু, যা জয়েন্টগুলোকে অতিরিক্ত বাহ্যিক চাপ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। ধূমপানের কারণে এবং আসীন জীবনধারার কারণে বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। আর তার মধ্যে একটি হচ্ছে বাতের সমস্যা। ধূমপান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে আর এ কারণে অনেকের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে।
হৃদরোগের সঙ্গে সম্পর্ক আছে?: বুকে কষ্ট, সারা দেহে প্রচণ্ড যন্ত্রণা, দরদর করে ঘাম হচ্ছে! এমন সব উপসর্গ হৃদরোগ তথা হার্ট অ্যাটাকের হতেই পারে। তবে তা কিন্তু সাইলেন্ট অ্যাটাক নয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, হার্টে রক্তের জোগান পর্যাপ্ত না থাকলে হৃদ্যন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে ‘টিউডর ডিজিজ’ বলা হয়। আবার অনেকেই এই রোগকে ‘ইংলিশ সোয়েটিং সিকনেস’ও বলে থাকেন। টিউডর ডিজিজ-এর নেপথ্যে রয়েছে গাউট। এই গাউট আসলে এক ধরনের আর্থ্রাইটিস। যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। প্রথমে শরীরে বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়। লাল হয়ে ফুলেও যেতে পারে। তার পর এই ব্যথা হাত, পায়ের বিভিন্ন অংশে সঞ্চারিত হয়। কারো আবার হাত, পা অবশ হয়ে যেতে পারে। যদি কারো হঠাৎ বাতের ব্যথা বেড়ে যায়, তা হলে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এই গাউট-ই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। ‘জামা’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে তেমনটাই বলা হয়েছে।
কর্মক্ষমতা হারায় ৫.৫% রোগী: প্রতি তিনজনে একজন যে কোনো বাত বা আর্থ্রাইটিস রোগে ভোগেন। অস্থিসন্ধি বা হাড়ের গিরায় ব্যথা, গায়ে ব্যথা, মাংসে ব্যথা ইত্যাদি আর্থ্রাইটিসের প্রধান লক্ষণ হলেও এই রোগ শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দেশে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ বাতজনিত রোগের কারণে কর্মক্ষমতা হারান। গত বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ‘জয়েন্ট পেইন’ নিয়ে মাসিক সেন্ট্রাল সেমিনারে এ তথ্য দেন বিশেষজ্ঞরা। সেমিনারের আয়োজন করে বিএসএমএমইউ সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটি। সেমিনারে বলা হয়, পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি বাত রোগে ভোগেন। শহরের চেয়ে গ্রামের লোকজনের মধ্যে এই রোগের প্রভাব বেশি। তবে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা নিলে কার্যক্ষমতা হারানো থেকে মুক্ত হওয়া যায়। তথ্য বলছে, ১০-২০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন ধরনের মাংসপেশি, হাড় ও অস্থিসন্ধির রোগে আক্রান্ত।
শিশুদের সমস্যা বর্তমানে ক্রমবর্ধমান। অস্থিসন্ধির প্রদাহ বলতে বোঝায় ফুলে যাওয়া, তরল পদার্থ নিঃসরণজনিত অবস্থা। এর লক্ষণগুলোর মধ্য রয়েছে অস্থিসন্ধি নাড়াতে না পারা, নাড়ানোর সময় ব্যথা অনুভ‚ত হওয়া, অস্থিসন্ধি গরম হয়ে যাওয়া। এ রোগ হলে রোগীদের ব্যবস্থাপনায় বয়স, লিঙ্গ, রোগভোগের কাল, ব্যথার ধরণ, গিরা জমে যাওয়া, অন্যান্য প্রয়োজনীয় ইতিহাস গ্রহণ করার প্রয়োজন। পাশাপাশি রোগটি প্রদাহজনিত কি না তা সুস্পষ্টরূপে নির্ধারণ করা, সম-অসম প্রদাহ কি না, অস্থিসন্ধির বিকৃতি, অস্থিসন্ধি ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ও আক্রান্ত অস্থিসন্ধির সংখ্যা অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এ রোগ হলে অস্থিসন্ধি প্রদাহের ৮০ শতাংশ নির্ণয় হয় রোগের ইতিহাস থেকে, আর ১৫ শতাংশ শারীরিক লক্ষণ ও মাত্র ৫ শতাংশ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় হয়। একক কোনো পরীক্ষা এ ধরনের রোগ নিশ্চিত করতে পারে না।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১৩ মে ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, দরকার সচেতনতা: রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ। যা রোগীর জয়েন্টের ক্ষতি করে। এই কারণে ভুক্তভোগীকে শুধু অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথার সম্মুখীন হতে হয় না। সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ভুক্তভোগীর অক্ষমতাও হতে পারে। ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞ ডা. হেম জোশি ব্যাখ্যা করেন যে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন প্রদাহজনক রোগ যেখানে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা জয়েন্টগুলির চারপাশে ঝিল্লির স্তরকে আক্রমণ করতে শুরু করে। যার কারণে তাদের ফুলে যাওয়া, শক্ত হওয়া, ব্যথা এবং শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা শুরু হয়। হাত ও পা-সহ শরীরের প্রায় সব জয়েন্টের ক্ষতি করার পাশাপাশি, বাতজ্বর কখনও কখনও শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম এবং অঙ্গ, ত্বক, চোখ, ফুসফুস এবং হার্টের ক্ষতি করতে পারে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের শুরুতে, আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমাগত ক্লান্তি, জয়েন্টের চারপাশের পেশীতে দুর্বলতা, হালকা জ্বর এবং খিদে হ্রাসের সঙ্গে জয়েন্টগুলিতে ব্যথা এবং হালকা ফোলাভাব দেখায় ।
কিন্তু গুরুতর অবস্থায়, এই রোগটি শুধুমাত্র শিকারের জয়েন্টে অসহনীয় ব্যথা সৃষ্টি করে না বরং তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন রুটিনে ক্রমবর্ধমান সমস্যা এবং অসুবিধার কারণ হয় । শুধু তাই নয় সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করলে জয়েন্ট ডিফরমিটি বা বিকলাঙ্গতাও হতে পারে । তিনি ব্যাখ্যা করেন যে কিন্তু রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস যে কারওই হতে পারে । এর মধ্যে ১৬ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে যে বাত হয় তাকে বলা হয় ইয়ং-অনসেট রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং ৬০ বছর বয়সের পর যে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয় তাকে লেট-অনসেট রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বলে । ডাঃ জোশি ব্যাখ্যা করেন যে বাতজ্বরের সমস্যা সাধারণত মহিলাদের বেশি প্রভাবিত করে । একই সঙ্গে বংশগতিও এর জন্য দায়ী হতে পারে অন্যতম কারণ । তিনি বলেন, যদিও এই রোগের প্রভাবে আসার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর ১০০% নিরাময় সম্ভব হয় না, তবে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের পর সময়মতো ওষুধ, চিকিৎসা ও থেরাপি শুরু করে এবং সঠিকভাবে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চললে । এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এর মারাত্মক প্রভাব এড়ানো যায় ।
ইউডি/এজেএস

