মার্কিন অস্ত্রে কি রাশিয়া কাবু হবে?

মার্কিন অস্ত্রে কি রাশিয়া কাবু হবে?

শফিকুল ইসলাম । মঙ্গলবার, ০৪ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৬:৩০

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিশ শান্তির জন্য কলঙ্কজনক দিন। এইদিন ইউক্রেনে আকস্মিক হামলা চালায় রাশিয়া। এরপর কেটে গেছে প্রায় আড়াই বছর। উভয় দেশই বিপুল সংখ্যক সেনা হারিয়েছে। প্রাণ গেছে বেসামরিক নাগরিকদেরও। ধ্বংস হয়েছে অনেক স্থাপনা। যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে উভয় দেশই। তবে ইউক্রেনের যে বেশি ক্ষতি হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু এই যুদ্ধ কি শুধু রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ? না। এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে বিশে^র অন্যতম পরাশক্তি আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ। তারা সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ নিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও রসদ দিয়ে তারা সাহায্য করছে। এ কারণে রাশিয়াকে কিছুটা বেশি বেগ পেতে হচ্ছে।

তবে এই যুদ্ধ নিয়ে বারবার নীতি পরিবর্তন করছে আমেরিকা। আগে দেশটি অস্ত্র দিয়ে এর ব্যবহারে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতো। যেমন ওই অস্ত্র রাশিয়ার ভেতরে কোনো স্থাপনায় হামলা করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।

এতদিন পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবহার করে শুধু ক্রিমিয়া উপদ্বীপ ও ইউক্রেনের ভেতরে শত্রুদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছিল কিয়েভের সামরিক বাহিনী। পশ্চিমাদের ভয় ছিল, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের ওপারে তাদের অস্ত্র ব্যবহার করা হলে চলমান সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সম্প্রতি এই বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে আমেরিকা। এখন এই অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে যেকোনো স্থাপনায় হামলা চালাতে পারবে ইউক্রেন। এখন একটি প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। ওয়াশিংটনের এই অনুমতি কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো পরিবর্তন আনবে? আমার কাছে মনে হয়, রাশিয়া আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে।

দেশটির সামরিক বাহিনী হামলার তীব্রতা ও সংখ্যা বাড়াবে। এতে ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি কেবল বাড়বেই। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকা ও পশ্চিমাদের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা বহু গুণ বেড়ে যাবে। এই কথা বলা বাহুল্য যে আমেরিকা-পশ্চিমাদের ফাঁদে পড়েছে ইউক্রেন।

কারণ আমেরিকার চিরশত্রু হলো রাশিয়া। তাদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে যুগের পর যুগ। ইউক্রেনে হামলার অজুহাতে রাশিয়াকে ‘শায়েস্তা’ করার একটা সুযোগ পেয়েছে আমেরিকা।

এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে ন্যাটো। কিন্তু কিয়েভ বুঝতে পারছে না যে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধে তাদের জয়ের কোনোও সম্ভাবনা নেই। বরং দিনদিন তাদের স্থাপনা ধ্বংস হচ্ছে। সেনারা প্রাণ হারাচ্ছে। দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি ইউক্রেনের উত্তর-পূর্ব খারকিভ অঞ্চলে রুশ বাহিনীর বেশ অগ্রগতি হয়েছে। গত মাসে খারকিভ অঞ্চলে ব্যাপক স্থল অভিযান চালায় রাশিয়া। এ সময় বেশ কয়েকটি গ্রাম তারা দখল করে নেয়।

এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে এ অঞ্চলের রাজধানী খারকিভ শহর। ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহর রুশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে। এই সীমান্ত রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের একটি সম্মুখসারিও।

কিয়েভের মিত্রদেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে, নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইউক্রেনকে এখন সীমান্তের ওপারের সামরিক স্থাপনাগুলোও ধ্বংস করতে হবে। এতদিন অনুমতি না পাওয়ায় সীমান্তের ওপারে রুশ বাহিনীর ওপর পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারছিল না ইউক্রেন।

ফলে সেখান থেকে একপ্রকার নিরাপদেই ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন রাশিয়ার সেনারা। এমনই এক পরিস্থিতিতে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপের মধ্যে নিজেদের সরবরাহ করা অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালানোর অনুমতি দেয় আমেরিকা।

শুক্রবার পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর একটি বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এই অনুমতির বিষয়টি খোলাসা করেন। কিছুদিন আগেই এ নিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভাদিমির পুতিন।

তিনি বলেছিলেন, ন্যাটো দেশগুলোকে এটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে তাদের দেশগুলোর আয়তন কম; কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ।

পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালানোর আগে তাদের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। এর মধ্যদিয়ে কিন্তু রাশিয়া ন্যাটোর অন্য দেশগুলোকে হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে।

রাশিয়ার এসব হুমকির কথা মাথায় রেখেই হয়তো দেশটির ভেতরে নিজেদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ রেখেছে আমেরিকা। যেমন তাদের তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘এটিএসিএমএস’ দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালাতে পারবে না ইউক্রেন।

৩০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়ে রাশিয়ার বেশ ভেতরের সেনা ও বিমানঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো সম্ভব। এ ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে ইউক্রেনের সামনে একটি পথই খোলা- রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে হামলা চালানো।

কিয়েভের হাতে থাকা হাইমার্সের মতো সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে রুশ সেনাদের চলাচল এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহ কার্যক্রমে বাধা দিতে পারে। এতে করে রাশিয়ার যেকোনো হামলার গতি কমে যেতে পারে।

খারকিভের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ইউক্রেনের সামরিক অভিযান সমন্বয়কারী দলের সদস্য ইউরি পোভখ। এই সমরবিদ বলেন, এখন ইউক্রেনের সেনারা ওই সব এলাকায় আঘাত হানতে পারেন, ইউক্রেনে হামলা চালানোর জন্য যেখানে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জড়ো করে রেখেছে শত্রুপক্ষ। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, আরেকটি হামলা চালানোর জন্য খারকিভ থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে সেনাসদস্যদের জড়ো করছে মস্কো।

আর স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা চিত্র বিশ্লেষণ করে মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর স্টাডি অব ওয়ার’ জানিয়েছে, ওই এলাকায় রুশ বাহিনীর তৎপরতা দেখা গেছে।

তাই সেখানে যদি পশ্চিমা অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো যায়, তাহলে খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার নতুন কোনো হামলা ঠেকিয়ে দিতে সফল হবে ইউক্রেন। কিন্তু কথা হচ্ছে অস্ত্র ও সামরিক কৌশলে রাশিয়া এখনো অনেক দূর এগোনো। তাদের রয়েছে ‘গ্লাইড বোমা’।

এই বোমা থেকে ইউক্রেনকে সুরক্ষা দিতে পারবে না মার্কিন অস্ত্র। সোভিয়েত আমলের পুরোনো বোমা উন্নতি প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করা এই বোমাগুলো স্থানীয়ভাবে কেএবি নামে পরিচিত।

খারকিভসহ ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী অন্যান্য অঞ্চলে নিয়মিত এই বোমা ফেলছে রাশিয়া। এতে ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে ব্যাপক। গ্লাইড বোমা থেকে রক্ষা পেতে হলে কিয়েভকে এসব বোমাবাহী যুদ্ধবিমানগুলোতে হামলা চালাতে হবে।

বোমাবাহী এই যুদ্ধবিমানগুলোকে থামাতে সক্ষম একটি অস্ত্রই ইউক্রেনের হাতে আছে। সেটি হলো আমেরিকার তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘প্যাট্রিয়ট’। এর দামও কিন্তু অনেক। খারকিভের কাছাকাছি এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনে বড় ঝুকি রয়েছে।

রাশিয়ার ড্রোনগুলো নিমেষেই সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে এবং ইস্কান্দারের মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করতে পারে।

অন্যদিকে, ইউক্রেনকে নিজেদের তৈরি ‘স্টর্ম শ্যাডো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এই যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আড়াইশ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালাতে এই অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই।

অর্থাৎ রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালাতে দেশ দুটি অনুমতি দিয়েই রেখেছে। ফলে স্টর্ম শ্যাডো ব্যবহার করে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী শহর কুরস্ক ও বেলগোরোদে হামলা চালাতে পারে ইউক্রেন। তবে পথটা কিন্তু মসৃণ নয়। এখানেও কিছু ঝামেলা আছে। ইউক্রেনের হাতে থাকা স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেশটির সু-২৪এস যুদ্ধবিমানে যুক্ত করা আছে। হামলা চালাতে হলে ওই ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যুদ্ধবিমানগুলোকে রুশ সীমান্তের কাছে যেতে হবে।

ফলে খুব সহজেই সেগুলো রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার টার্গেট হতে পারে। তবে এ ধরনের হামলার জন্য সু-২৪এস’র চেয়ে বেশি সক্ষমতা রয়েছে আমেরিকার তৈরি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের। এ বছরের শেষ দিকে ইউক্রেন এই যুদ্ধবিমান হাতে পেতে পারে। হাতে পেলেই যে এটা দিয়ে রাশিয়ার ভেতরে হামলা চালাতে পারবে কিয়েভ, তার গ্যারান্টি নেই।

কেননা, এখানে আমেরিকার অনুমতি দরকার। তবে ইউক্রেন যে গালে হাত দিয়ে বসে আছে, তা নয়। রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালানোর অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন বাহিনী। তাদের তৈরি বেশ কিছু ড্রোন এরই মধ্যে সীমান্তের কয়েকশ কিলোমিটার ওপারে রাশিয়ার সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোয় হামলা চালিয়েছে।

এমন হামলা হয়েছে রাশিয়ার ওরস্ক শহরের একটি রাডার স্টেশনে। সেটির অবস্থান ইউক্রেন সীমান্ত থেকে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরে। সুতরাং ইউক্রেনকে একেবারে ‘গোনায় ধরছি না’ ভাবা যাবে না। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সহসা থামার কোনো লক্ষণ নেই। লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

ইউডি/এআর

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading