ইতালির ভুয়া ভিসা দিয়ে কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৪ জুন, ২০২৪, আপডেট ১৫:০০
ইভান খালাসী। দেড় বছর আগেও ছিলেন সৌদি আরবে। মোবাইল ফোনে কথা হয় মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হরিদাসদি এলাকার বেলায়েত হাওলাদারের সঙ্গে। পরে সৌদি থেকে দেশে আসেন ইভান। কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে এমন শর্তে দালালের হাতে তুলে দেন ১২ লাখ টাকা।
এজন্য পাসপোর্টে দেওয়া হয় ইতালির ভিসা, একই সঙ্গে টিকিটও কাটা হয় বিমানের। কিন্তু গত ৩ এপ্রিল ইতালির উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন প্রতারণার শিকার তিনি। শুধু ইভান খালাসীই নন, তার মতো একইভাবে প্রতারণার শিকার পাঠানকান্দির নাইম হাওলাদার, হরিদাসদির সফিকুল ইসলাম নয়ন, রায়হান হোসেনসহ অনেক যুবক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনার মূল অভিযুক্ত নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার আবুল বাশার সুমন। তার সহযোগী বেলায়েত হাওলাদার। প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা অভিযুক্তরা। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, লোভে পড়েই বারবার প্রতারিত হচ্ছে যুবকরা।
এ বিষয়ে জানতে বেলায়েতের বাড়ি গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগের কিছুই জানেন না বলে দাবি অভিযুক্ত বেলায়েতের বাবা মোতালেব হাওলাদারের। প্রশাসন বলছে, এমন ঘটনা থামাতে জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিবারেরও সচেতনতা বৃদ্ধি।
টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও এসেছে দৈনিক উত্তরদক্ষিনের প্রতিবেদকের হাতে। তাতে দেখা যায়, বেলায়েতের শাশুড়ি আসমিনা বেগম গুনে গুনে লাখ লাখ টাকা নিচ্ছেন। সে টাকা বেলায়েতকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ইভান খালাসীর বাড়িতে বসেই লেনদেনের এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ইভান খালাসী বলেন, ‘আমাকে ইতালি পাঠাবে এ প্রলোভনে পড়ে আমি প্রতারিত হই। আগে বুঝতে পারিনি, তাহলে এ ফাঁদে পা দিতাম না। আমার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়েছে বেলায়েত ও তার শাশুড়ি। আমি আমার টাকা ফেরত চাই, আর এ দালাল চক্রের বিচার চাই।’
আরেক ভুক্তভোগী রায়হান হোসেনের দুলাভাই মাদারীপুরের রাজৈরের বদরপাশার দারাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘বেলায়েত ও সুমনের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অনেক যুবক সর্বস্বান্ত হয়েছে। কেউ সুদে টাকা এনে, কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ এনে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়েছে এ প্রতারকদের হাতে।
এখন ইতালিও নিতে পারছে না, টাকাও ফেরত দিচ্ছে না। এর একটা প্রতিকার দরকার। এ দালালদের বিচারও হওয়া দরকার। প্রশাসনের কাছে জোর দাবি, এ চক্রকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।’
অভিযুক্ত বেলায়েত হাওলাদারের বাবা মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে দুই বছর ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। বেলায়েত কাকে কীভাবে কোথায় নেবে আমি জানি না। বেলায়েতের শাশুড়ি আসমিনা বেগম বলেন, ‘আমার জামাই টাকা নিতে বলেছে, আমি সেই টাকা ইভানদের বাড়িতে গিয়ে গ্রহণ করেছি।
ইভান আমাদের আত্মীয় হয়। টাকা নিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমার জামাই অন্য এক লোকের মাধ্যমে কথা বলেছিল, মূলত সেই লোকই প্রতারণা করেছে। এ ঘটনায় ইভান আদালতে মামলা করেছে, এখন আমরা আদালতেই সবকিছুই বুঝব।’
মাদারীপুর আদালতের আইনজীবী মামুন খান বলেন, ‘লোভে পড়েই যুবকরা বারবার প্রতারণার শিকার হচ্ছে। পরে বিচারের আশায় আদালতে মামলা করে। যুবকরা যদি দালালদের কাছে না যায়, তাহলে প্রতারিত হওয়অর কোনো সুযোগ নেই।’
মাদারীপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, এমন ঘটনায় মাদারীপুর আদালতে দায়ের করা একাধিক মামলা তদন্ত করছেন গোপালগঞ্জ পিবিআই কর্মকর্তারা। এ ছাড়া প্রতিটি মামলা পুলিশ নিখুঁতভাবে তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অনেকেই গ্রেপ্তারও হয়েছে। বেকার যুবকরা সচেতন হলে প্রতারকদের থেকে রক্ষা পেতে পারে। সচেতনতার বিকল্প কিছুই নেই।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মারুফুর রশিদ খান বলেন, বেকার যুবকদের মধ্যে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার একটি স্বপ্ন থেকেই বারবার প্রতারিত হচ্ছে তারা। অল্প টাকায় ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রবণতায় একদিকে প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে দালালদের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেকেই। এর থেকে বাঁচতে প্রয়োজন পরিবার ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
ইউডি/এআর

