কিডনি বেচাকেনা: রমরমা বাণিজ্য

কিডনি বেচাকেনা: রমরমা বাণিজ্য

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১০ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১৩:৪৫

দরিদ্রদের টার্গেট করে কৌশলে প্রতারণা: বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দরিদ্র মানুষকে চাকরির প্রলোভনসহ নানা প্রতারণার মাধ্যমে ইন্ডিয়ায় নিয়ে যায় একটি চক্র। পররর্তীতে তাদের জিম্মি করে পরে বিভিন্ন কৌশলে কিডনি বের করে নেয় চক্রটি। ইন্ডিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশটির কলকাতা, বনগাঁ, বারাসাত, দিল্লি, জয়পুর, গুরগাঁও ও ফরিদাবাদ এবং বাংলাদেশের ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জে কিডনি পাচারের সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে; যারা আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের মাধ্যমে দেদারসে মানবদেহের এ মূল্যবান অঙ্গটি পাচার করছে। ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যে জানা যায়, মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে কিডনি কিনে নেওয়া হচ্ছে ৪-৫ লক্ষ ইন্ডিয়ান টাকায়৷ এর পরে সেই কিডনিই বিক্রি হচ্ছে ১৪-১৫ লক্ষ ইন্ডিয়ান টাকায়! ইন্ডিয়ার গোয়েন্দারা ইতিমধ্যেই এমন ৪৫ জন বাংলাদেশির সন্ধান পেয়েছেন, যাদের বড় অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে কিডনির অস্ত্রোপচার করা হয়েছে৷ এদের কয়েকজন বাংলাদেশের বাড়িতে ফিরেও গিয়েছেন৷ ধারাবাহিক তল্লাশি চালিয়ে দিল্লি ও রাজস্থান পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে কিডনি পাচার চক্রের কয়েকজন সদস্য। এরই সূত্র ধরে, দিল্লি পুলিশের এক অভিযানে গত সপ্তাহে দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের ৫০ বছর বয়সী এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসক ড. বিজয়া কুমারী বর্তমানে বরখাস্ত অবস্থায় আছেন। একইসঙ্গে গ্রেপ্তার হন তিন বাংলাদেশি। সেখান থেকে দিল্লি পুলিশ নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। জানা যায়, ইন্ডিয়ার রাজস্থানে একটি কিডনি চক্র ধরা পড়ে। সেখান থেকে তথ্য পায় পুলিশ। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ প্রায় তিন মাস আগে কাজ শুরু করে। চক্রটি প্রতিটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য চিকিৎসককে দু-তিন লাখ রুপি করে দিত। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বেআইনিভাবে অঙ্গ প্রতিস্থাপন চক্রের পর্দা ফাঁস করে ইন্ডিয়ার পুলিশ। কিডনি সহ মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ অবৈধভাবে বিক্রি এবং প্রতিস্থাপনের অভিযোগ বাংলাদেশের ৫ নাগরিককে গ্রেফতার করে দেশটির গুরুগ্রাম পুলিশ। হরিয়ানা এবং রাজস্থানে মানব অঙ্গ পাচারের তদন্তে নেমে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরমধ্যে ৩ জন গ্রহীতা এবং দু’জন হলেন দাতা। হাসপাতাল বা ডাক্তারদের কিডনি পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটেছে। ইন্ডিয়ার মেডিকেল ট্যুরিজম ভিসা সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ চক্রটি সাধারণ মানুষদের ইন্ডিয়া নিয়ে গিয়ে কিডনি বিক্রি করে দেয়। এশিয়া প্যাসিফিক জার্নালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বাড়ছে মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের সংখ্যা। অনেক মানুষ উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ পাড়ি জমিয়ে পাচারচক্রের খপ্পরে নিজের মূল্যবান অঙ্গ থেকে শুরু করে জীবন পর্যন্ত হারাচ্ছেন। তবে এ নিয়ে নেই কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা। প্রতিবছর যে পরিমাণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয় তার মাত্র ২ শতাংশ উঠে আসে নানা গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে। এতে করে বছরান্তে মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের পরিমাণ বাড়লেও, মিলছে না কোনো প্রতিকার।

ইন্ডিয়ায় চলছে একের পর এক অভিযান: বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ায় অবৈধ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইন্ডিয়ার দিল্লি পুলিশের এক অভিযানে গত সপ্তাহে দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের ৫০ বছর বয়সী এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসক ড. বিজয়া কুমারী বর্তমানে বরখাস্ত অবস্থায় আছেন। ২০২১-২০২৩ সাল পর্যন্ত নয়ডাভিত্তিক ইয়াথার্থ হাসপাতালে তিনি প্রায় ১৫-১৬টি কিডনি অবৈধভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন। ইন্ডিয়ার সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ খবর জানিয়েছে। নথি অনুসারে, এই চক্র বাংলাদেশের রোগীদেরকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রতারণার মাধ্যমে দিল্লি ও আশেপাশের বড় বড় হাসপাতালগুলোতে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য নিয়ে আসত। ড. কুমারী ছাড়াও গত মাসে তিনজন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই চক্রে ব্যবহƒত ভুয়া নথিপত্রও জব্দ করা হয়েছে। যেগুলো দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের নাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। ড. কুমারী একজন অভিজ্ঞ কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন এবং প্রায় ১৫ বছর আগে অ্যাপোলো হাসপাতালে জুনিয়র চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তিনি হাসপাতালের স্থায়ী কর্মচারী ছিলেন না। বরং ফি নেওয়ার বিনিময়ে সেবা ভিত্তিতে কাজ করতেন। ইয়াথার্থ হাসপাতালের অতিরিক্ত মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট সুনীল বালিয়ান জানিয়েছেন, হাসপাতালের ভিজিটিং কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করতেন অভিযুক্ত চিকিৎসক। প্রায় তিন মাস আগে একটি সার্জারি করেছিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পুলিশের এই কার্যক্রমের পরপরই ড. কুমারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পূর্বে ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তের জন্য আমাদের কাছে কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল এবং আমরা সেই তথ্য সরবরাহ করেছি। এই চক্রের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আসা রাসেল (২৯), মোহাম্মদ সুমন মিয়ান এবং ইফতি নামের ব্যক্তি জড়িত। ত্রিপুরাভিত্তিক রতিশ পালও এই চক্রের সদস্য। তারা বাংলাদেশ থেকে কিডনি দাতাদের প্রতারণা করে দিল্লিতে নিয়ে আসত এবং প্রতিস্থাপন করার জন্য তাদের ৪-৫ লাখ রুপি নিত। আর কিডনি গ্রহীতাদের কাছ থেকে আদায় করা হত ২৫-৩০ লাখ রুপি। ইফতি বাদে চক্রের অপর সন্দেহভাজন সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার রেকর্ডে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভুয়া নথিপত্র পাওয়া গেছে। এছাড়া ড. কুমারীর সহকারী বিক্রমকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বেআইনিভাবে অঙ্গ প্রতিস্থাপন চক্রের পর্দা ফাঁস করে ইন্ডিয়ার পুলিশ। কিডনি সহ মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ অবৈধভাবে বিক্রি এবং প্রতিস্থাপনের অভিযোগ বাংলাদেশের ৫ নাগরিককে গ্রেফতার করে দেশটির গুরুগ্রাম পুলিশ। হরিয়ানা এবং রাজস্থানে মানব অঙ্গ পাচারের তদন্তে নেমে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এরমধ্যে ৩ জন গ্রহীতা এবং দু’জন হলেন দাতা। জানা যায়, কিডনি বিক্রির জন্য দাতাদের ২ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। তাদের রাখা হয়েছিল গুরুগ্রামের সেক্টর ৩৯-এর একটি হোটেলে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে হানা দেয় পুলিশ। এরপরেই তাদের গ্রেফতার করা হয়। জানা যায়, একজন বাংলাদেশি নাগরিকের একটি কিডনি নেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। এরপর সুস্থ হওয়ার জন্য গুরুগ্রামের ওই হোটেলে রাখা হয়েছিল। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, এভাবেই কিডনি বিক্রি করে অস্ত্রোপচারের পরে গুরুগ্রামের ওই গেস্ট হাউসে গ্রহীতা এবং দাতা উভয়কে রাখত এই চক্র। ধৃতদের নাম হল-কবির এমডি আহসানুল (৩১), নুরুল ইসলাম (৫৬), মাহমুদ সৈয়দ আকব (২৫) এবং দাতা শামীম মেহেন্দি হাসান (৩৪) ও হোসেন এমডি আজাদ (৩০)। তদন্তকারীরা আরও জানতে পারেন, এই চক্রের মূল পান্ডার নাম হল মহম্মদ মুর্তজা আনসারি। তিনি ঝাড়খøের বাসিন্দা। তবে বর্তমানে পলাতক। তার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, জয়পুরের দুটি বেসরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অবশ্য এই দুটি বেসরকারি হাসপাতালের পর্দা ফাঁস আগেই হয়েছিল।

‘মাস্টারমাইন্ড’ বাংলাদেশি বলছে দিল্লি পুলিশ: বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ায় অবৈধ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট চক্রের মূলহোতা বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার অমিত গোয়েল মঙ্গলবার (০৯ জুলাই) এক সংবাদ বিবৃতিতে বলেন, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট চক্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বাংলাদেশি। এছাড়া কিডনি দাতা এবং গ্রহীতাও বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেন তিনি। ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার গোয়েল বলেন, আমরা রাসেল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছি যিনি রোগী ও দাতার ব্যবস্থা করতেন। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের সঙ্গে জড়িত এক নারী চিকিৎসককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতি ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য চক্রটি ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিতেন বলে জানান তিনি। গোয়েলের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, এই চক্রের সবারই বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো না কোনো যোগাযোগ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার চিকিৎসকের সঙ্গে ২-৩টি হাসপাতালের যোগসূত্র আছে। কিডনি দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও, তিনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা করে দিতেন, বলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার অমিত গোয়েল। পুলিশ এখন সংঘবদ্ধ এই চক্রের বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। তদন্ত চলাকালীন সময় বিজয়া কুমারীর সহযোগী বিক্রমকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

যা জানাচ্ছে ডিএমপি: চাকরিপ্রত্যাশীদের দিল্লিতে এখন পর্যন্ত দেশ থেকে ১০ জন ব্যক্তিকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে তাদের কিডনি কেটে নিয়েছে চক্রটি। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি মডেল থানায় চক্রটির বিরুদ্ধে রবিন নামের একজন ভুক্তভোগী মামলা করেন। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানা পুলিশ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। চলতি বছরের ১১ মে রাজধানীর ধানমন্ডি ও বাগেরহাটে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন, মো. রাজু হাওলাদার (৩২), শাহেদ উদ্দীন (২২) ও মো. আতাহার হোসেন বাপ্পী (২৮)। এ ঘটনায় পলাতক রয়েছেন মো. মাছুম (২৭), শাহীন (৩৫) ও সাগর ওরফে মোস্তফা (৩৭)-সহ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন। ধানমন্ডি মডেল থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চক্রটি দেশের দরিদ্র মানুষকে ভালো চাকরি দেওয়ার আশা দিয়ে ইন্ডিয়ায় নিয়ে নানা কৌশলে তাদের কিডনি হাতিয়ে নেয়। ভুক্তভোগী রবিনকে ইন্ডিয়ায় চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রথমে দিল্লির ফরিদাবাদে নেওয়া হয়। পরে তাকে নানা কৌশলে কিডনি বিক্রির জন্য রাজি করানো হয়। প্রথমে চক্রটি তাকে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বললেও তাকে দেয় ৩ লাখ টাকা। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে কাউকে কিছু না বলার শর্তে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গত ৪ মার্চ ভারতের গুজরাটে কিডনি অ্যান্ড স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রবিনের একটি কিডনি নেওয়া হয়। ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, চক্রের টার্গেট হলো যাদের আর্থিক চাহিদা আছে, রবিনের ক্ষেত্রে যেটি ঘটেছে। তাকে কিন্তু খুব সামান্য অর্থ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চক্রটি এসব কিডনি আরও চড়া দামে বিক্রি করে আসছে। চক্রটি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে কলকাতা ও গুজরাটেও কাজ করে।

শত কোটি টাকার রমরমা ব্যবসা!: সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে কিডনি পাচার চক্রটি শুধু দেশে না সংঘবদ্ধ জাল বিস্তার করেছে দেশের বাইরেও। কালোবাজারে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির চক্রগুলোর যোগসাজশ আন্তঃদেশীয় পর্যায়ে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গড়ে উঠেছে এমন সব কালোবাজারি চক্র, যাদের মূল কাজ মানুষ পাচার করে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেয়া। ডিএমপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাজারে বিশেষ করে এশীয় অঞ্চলে এক একটি কিডনির দাম ২৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। যেখানে একটি কিডনির দাম এত, তখন প্রশ্ন জাগে, মানুষের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দাম কেমন এবং কালোবাজারে কিডনির পাশাপাশি আর কী কী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি হয়। দ্য মেডিকেল ফিউচারিস্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ড. বারতালান মেস্কোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কালোবাজারে একজন মানুষের শরীর থেকে মোট ৪৫ মিলিয়ন ডলারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা সম্ভব, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০০ কোটি টাকার ওপরে। সরাসরি কোনো মানুষ বৈধভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করতে না পারলেও, কালোবাজারে সহজেই নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করতে পারেন। তবে ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েবের মতো বিস্তৃত এ কালোবাজারে সাধারণ মানুষের পদচারণা নেই বললেই চলে। এখানে মূলত সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে চলছে রমরমা অবৈধ ব্যবসা। অর্থনৈতিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওডিআইএফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কিডনি না, মানুষের হƒৎপ্লি, ফুসফুস, যকৃৎ, ক্ষুদ্রান্ত, এমনকি চামড়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কালোবাজারে বিক্রি হয়ে থাকে। ওডিআইএফের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে এভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি অবৈধ হলেও, চাহিদার কারণে কালোবাজারে বাড়ছে এ ধরনের বেচাকেনা। শুধু আমেরিকার বাজারে প্রতিবছর ১ লাখ মানুষের হƒৎপ্লি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, যাদের অর্ধেক মারা যান প্রতিস্থাপনের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভাবে। মেডিকেল ফিউচারিস্টের হিসাব অনুযায়ী, কালোবাজারে মানুষের প্রতিটি হƒৎপিøের দাম ১০ লাখ ডলার। হƒৎপিøের পর সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় যকৃৎ। প্রতিটি যকৃতের দাম প্রায় সাড়ে ৫ লাখ ডলার। মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির তালিকায় চাহিদার শীর্ষে কিডনির দাম। কালোবাজারে প্রতি পিস কিডনি বিক্রি হয় আড়াই লাখ ডলারের বেশি দামে।

মেডিকেল পর্যটনের আড়ালে ‘বর্বরতা’ : ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশে সক্রিয় বেশ কয়েকটি মেডিক্যাল ট্যুরিজম সংস্থা এই কিডনি পাচার চক্রের ব্যবসায় যুক্ত বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানে৷ এসব সংস্থাগুলোর কর্ণধারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্ডিয়ার বিভিন্ন রাজ্যের প্রশাসন ও পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। এই চক্রের মধ্যে দালাল, চিকিৎসক, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তি ছাড়া প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। আন্তর্জাতিক এই কিডনি পাচার চক্রের লিড হাতে পেয়ে হরিয়ানা পুলিশের হাতে প্রথমে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শামিম নামে এক বাংলাদেশি যুবক৷ রাজশাহির বাসিন্দা শামিম সেখানে একটি ছোট মোবাইলের দোকান চালাতেন৷ এদেশের কিডনি পাচার চক্রের সদস্যরা শামিমকে মোটা টাকার অফার দেয়৷ ইন্ডিয়ার মেডিকেল ট্যুরিজম ভিসা সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ চক্রটি সাধারণ মানুষদের ইন্ডিয়া নিয়ে গিয়ে কিডনি বিক্রি করে দেয়। এ পুরো চক্রটির সঙ্গে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার হাসপাতাল, ডাক্তার, দালাল ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন ইন্ডিয়ার গোয়েন্দারা। জানা যায়, এই চক্রে সঙ্গে একাধিক আড়কাঠিরা জড়িত রয়েছে। মূলত এই দালালদের মাধ্যমেই সক্রিয় কিডনি পাচার চক্রের লোকজন। এর সঙ্গে চিকিৎসক, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন এমন স্বাস্থ্যকর্মীরাও জড়িত রয়েছে। তবে তাদের হদিশ পাওয়াটা কষ্ট। এমনকী বাংলাদেশের কিছু দালালও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রেক্ষাপট এশিয়া: এক দশক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ঘণ্টায় কালোবাজারে একটি করে কিডনি পাচার হয়। শুধু কিডনির ওপর ভিত্তি করেই অবৈধ এ বাজারের সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে এশীয় অঞ্চলগুলোতে কালোবাজারের মাধ্যমে কিডনি বেচাকেনা রমরমা অবস্থা ধারণ করেছে। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশে অনেকেই কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য যান। এসব দেশে প্রতিস্থাপিত কিডনির বড় একটি অংশ আসে কালোবাজারিদের হাত ধরে, যার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের রবিনের মর্মান্তিক ঘটনায়। সংবাদসংস্থা রয়টার্স ফ্যাক্টবক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার হয় চীনে। প্রতিবছর দেশটিতে ২০ লাখ মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে, যেখানে বৈধপথে কিডনি পাওয়া যায় মাত্র ২০ হাজার। এ বিপুল সংখ্যক কিডনির চাহিদা পুরোটাই কালোবাজারের মাধ্যমে মেটানো হয়। চীনের পর কিডনি পাচারে উঠে এসেছে পাকিস্তানের নাম। এরসঙ্গে প্রতিবছরই কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে কিডনি পাচারের বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের পাঞ্জাবে কিডনি পাচারের সঙ্গে জড়িত ফাওয়াদ মুখতার নামে এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুখতার একাই ৩২৮ জনকে অপারেশন করে কালোবাজারে কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন। মুখতারের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতিটি কিডনি ১ কোটি রুপিতে কালোবাজারে বিক্রি করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এই প্রতিবেদটি লিখেছেন আসাদ এফ রহমান, আরাফাত রহমান , রিন্টু হাসান, আশিকুর রহমান, পারভেজ আহমেদ।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading