‘এক ছটাক ধানও বাড়ি নিয়া যাবার পামু না’

‘এক ছটাক ধানও বাড়ি নিয়া যাবার পামু না’

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৪, আপডেট ০৯:০০

আট বিঘা জমিতে আমনের উন্নত জাতের হাইব্রিড ধান লাগিয়েছিলেন মনিরুজ্জামান মনির। এক মাস গেলে তাঁর ধানক্ষেত পেকে যেত। পুরো জমি ১৩ দিন ধরে পানির নিচে তলিয়ে আছে। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার উত্তর নাকশী গ্রামের এই কৃষক বলেন, ‘স্বপ্নেও ভাবিনি এমন সময় এত বড় বন্যা হবে। সব ধান শেষ আমার। এক ছটাক ধানও বাড়ি নিয়া যাবার পামু না। এখন সামনের দিনগুলিতে কেমনে চলব। বোরো আবাদই বা কীভাবে করব– সেই চিন্তায় ঘুম আসে না।’

দুই সপ্তাহ আগেও পুরো জেলার ফসলি মাঠগুলোতে ছিল সবুজের সমারোহ। বাতাসে দোল খেত সবুজ ধানের পাতা। সেই সঙ্গে দোল খেত কৃষকের স্বপ্ন। ফসলের নিবিড় পরিচর্যায় কৃষক যখন স্বপ্নবোনা শুরু করেন, ঠিক তখনই অসময়ের বন্যা তাদের সব স্বপ্ন পানিতে তলিয়ে দেয়। ধানক্ষেতে এখন পানি আর পানি।

মনিরুজ্জামানের একার নয়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় শেরপুরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান। এ ছাড়া ১ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে ৫০ হাজার হেক্টর হতে পারে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এবারের বন্যায় জেলার কৃষিখাতে ক্ষতি ৫০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা কৃষি বিভাগের।

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর জেলার মহারশি, সোমেশ্বরী, ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয় শেরপুর সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। তীব্র স্রোত ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায় কয়েক হাজার কৃষকের ফসলি জমি। এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দাবি সরকারি প্রণোদনার।

নালিতাবাড়ীর কৃষক ছামেদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যায় সব ফসল তলিয়ে গেছে। কী করে আমরা খাবো? এই ধান, চাল নিয়েই আমরা চলতাম। জেলা প্রশাসক এবং কৃষি অধিদপ্তর যদি আমাদের এই ক্ষতিটা না পুষিয়ে দেয়, তাহলে সামনের দিনগুলোতে আমাদের পক্ষে আবাদ করা সম্ভব নয়।’

পিপুলেশ্বর গ্রামের কৃষক লিটন মিয়া বলেন, ‘আমি সংসারে একাই রোজগার করি। ধারদেনা করে দেড় একর জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। সব ডুবে পচে গেছে। এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব আর সংসার কীভাবে চালাব?’

ঝিনাইগাতী উপজেলার ঝুলগাঁও গ্রামের কৃষক কবির হোসেন জানান, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন তিনি। বন্যায় সব শেষ। এখন ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন আর সংসার কীভাবে চালাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

সবজি ও আমন চাষিরা বলছেন, বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। এখনও ফসলের ক্ষেতে পানি আছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যদি সহযোগিতা করে তাহলেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার একটা সম্ভাবনা রয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হচ্ছে। সব ধরনের সহায়তায় পাশে আছেন তারা।

জেলা খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. সুকল্প দাসের ভাষ্য, বন্যায় চলতি মৌসুমে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবজি আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার হেক্টর। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে তাদের সার-বীজ দেওয়া হবে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading