কে হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ট্রাম্প নাকি কমলা: নির্বাচন আমেরিকায়, উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০৫ নভেম্বর , ২০২৪, আপডেট ১৫:৫০
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব প্রকট
আসাদুজ্জামান সুপ্ত : মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে চরম অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ-সংঘাত ছাড়াও বৈষ্ণিক উষ্ণতা ও অর্থনৈতিক সমস্যাসহ নানা সংকট অহরহই দেখা দিচ্ছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার (০৫ নভেম্বর) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আমেরিকানরা তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাকে বেছে নেয় তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মাত্র দুটি দলের আধিপত্য। রিপাবলিকান পার্টি আর ডেমোক্র্যাট পার্টি। বরাবর এই দুই দলের কোনো একটির প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবার রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট পার্টির এবারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। এ নির্বাচনে ট্রাম্প জিতলে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হবে ৭৮ বছর বয়সে। অপরদিকে কমলা হ্যারিসের বয়স ৬০ বছর। ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস কি বাইডেনের দেখানো পথ অনুসরণ করে তার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাবেন? নাকি ‘বিশ্ববাদ নয়, আমেরিকাবাদ’ বিশ্বাস নিয়ে আবারও ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বলবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।
চলমান বিশ্বরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তথা ইসরায়েলের সঙ্গে হামাস, হিজবুল্লাহ,ইরানের সংঘর্ষ, একইসঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সমরাস্ত্র নীতি, ক‚টনীতিক সমন্বিত চুক্তি, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে অস্থিতিশীল এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে এবারের মার্কিন নির্বাচন বিশ্ববাসীর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেবলমাত্র আমেরিকানদের নয়, বিশ্বজুড়ে সব মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি চরিত্র। অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতির যে কোনো মোড় ঘোরানোর সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকেন তিনি।
নির্বাচনে জয়ী হলে কমলা হ্যারিস বা ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধসহ চলমান বৈশ্বিক সংকটগুলো নিয়ে কেমন ভূমিকা পালন করবে এবং মনোভাব পোষণ করবে এগুলো মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাসীর কাছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন নির্বাচনের প্রভাব অনেকখানি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববাসীর কাছে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকৃত এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় কোন দিকে রূপ নেয়। প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল যুদ্ধের কোনো সমাধানের বের হয় কিনা। চীন, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ বাড়ে বা কমে কিনা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকে সেসব মুখ্য বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা কমলা হ্যারিস যেই হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী চার বছরের বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ময়দানের মারপ্যাঁচ।
নির্বাচনের দিন আজ ৫ নভেম্বর অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে ভোটকেন্দ্রগুলো খুলবে স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে। আমেরিকা একাধিক ‘টাইম জোন’-এ বিভক্ত হওয়ায় দেখা যাবে সময়ের এমন পার্থক্য। একইভাবে, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সময় হবে পৃথক। কখনো তা কাউন্টি ভেদেও হবে ভিন্ন। অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ হবে ইস্টার্ন টাইম সন্ধ্যা ৬টা ও মিডনাইট ইস্টার্ন টাইমের (২২:০০-০৪:০০ জিএমটি) মধ্যে। এদিকে, ভোটকেন্দ্র প্রথম বন্ধ হওয়ার (ইস্টার্ন টাইম সন্ধ্যা ৬টা) সঙ্গে সঙ্গে ভোট গণনার কাজ শুরু হবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর থেকে ফলাফল আসতে শুরু করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প-কমলা: পররাষ্ট্রনীতি কার কেমন হতে পারে
শহীদ রানা : আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের জন্য এমন একটি বিশ্ব অপেক্ষা করছে যেখানে শান্তির চেয়ে সংঘাত বেশি। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকগণ বলছেন, এই যুদ্ধ মোকাবেলা করেই নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কাজ করে যেতে হবে। নির্বাচনী প্রচারে কমলা ও ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ নীতির পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। বিশেষ করে দু’জনের পররাষ্ট্রনীতির ওপর বহির্বিশ্বের বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচনে জয়ী হলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা করা কমিয়ে দেবে। ট্রাম্প আরও বলেছেন, তিনি ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাত মেটাতে কিছু একটা বের করবেন। আবার কমলা হ্যারিস ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি জয়ী হলে তার উত্তরসূরি বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মতো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখবেন। অর্থাৎ বাইডেন প্রশাসনের নীতি অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট কমলা হ্যারিস।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও সিইও কমফোর্ট ইরো বলেন, শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকা এখনও সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক শক্তি। তবে দ্ব›দ্ব-সংঘাতের সমাধানে সহায়তা করার শক্তি আমেরিকার কমে গেছে। ট্রাম্প বা কমলা যেই এবারের নির্বাচনে জয়ী হবেন তার জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল সংকটের সমাধানে কাজ করা। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন ইস্যুতে তাদের মধ্যে বড় কোনো ফারাক নেই। এছাড়াও, কমলা নির্বাচনে জয়ী হলে ন্যাটোকে পূর্বের তুলনায় আরও স¤প্রসারিত করতে সেই ধারা অব্যাহত রাখবেন। বিপরীতে ট্রাম্প বলছেন, ন্যাটোর কারণে আমেরিকার সম্পদের অপচয় হচ্ছে। তিনি এই জোট থেকে সরে আসারও হুমকি দিয়েছেন।
বর্তমানে পুরো বিশ্বেই কয়েক দশকের মধ্যে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা চলছে। তার মধ্যে আমদানি করা সব চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় চীন এবং অন্যান্য অনেক বাণিজ্য অংশীদারদের উপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে দিতে নাছোড়বান্দা। চীনের নেতারা মনে করেন, হ্যারিস ও ট্রাম্প উভয়ই কঠোর হবেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ম্যারি রবিনসন বলেন, জলবায়ু ও প্রকৃতি সংকটের কারণে আমেরিকার নির্বাচন কেবল দেশটির নাগরিকদের জন্য নয় বরং গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরে আসবেন, যেমনটি তিনি তার প্রথম মেয়াদে করেছিলেন।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন নির্বাচনের প্রভাব অনেক। ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমেরিকার ক‚টনৈতিক সম্পর্কের কেমন উন্নয়ন হয় তার জন্য নির্বাচনে গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন এরপর আমেরিকার সহায়তা ব্যক্ত করার অভিব্যক্তি এই নির্বাচনকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমাগত উপস্থিতি আমেরিকার জন্য মাথাব্যথার কারণ। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের সঙ্গে আমেরিকার বিরোধ চরমে গিয়ে ঠেকে। আমেরিকার আবাসন ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে চীনা কোম্পানির মালিকানা নিষিদ্ধ করতে চান ট্রাম্প। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তাইওয়ান ও আমেরিকার ক‚টনীতিকদের মধ্যে যোগাযোগ চালু করেছিলেন- যা চীনকে ক্ষুব্ধ করে। একইভাবে কমলা হ্যারিসও চীনের আগ্রাসন বিরোধী জোট তৈরি করতে আগ্রহী এই অঞ্চলে। তাই চীনকে সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করতে বদ্ধপরিকর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে, এই নির্বাচনের ফলাফলে চোখ রাখছে দক্ষিণ এশিয়ার অধিবাসীরা।

কমলার সামনে ইতিহাস গড়ার হাতছানি
আরেফিন বাঁধন : আমেরিকার ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেনের রানিং মেট ছিলেন কমলা হ্যারিস। রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে নিয়ম অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট হন কমলা। তখনই তিনি একসঙ্গে দুটি ইতিহাস গড়েন। তার আগে আর কোনো নারী আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। কোনো কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষও তার আগে এই পদে ছিলেন না। কমলা হ্যারিস যদি এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন, তবে তিনি প্রথম মার্কিন নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনন্য রেকর্ড গড়বেন। বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকায় ১৭৮৯ সাল থেকে কোনো নারী এখন পর্যন্ত এই শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেননি। ৫৯ বছর বয়সী কমলা হ্যারিস জয়ী হলেই তিনি দেশটির ২৩৫ বছরের গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারেন। যা হতে পারে আমেরিকার রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। এছাড়াও তিনি প্রথম ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট ও দ্বিতীয় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইতিহাস গড়বেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড শহরে ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর কমলা দেবী হ্যারিসের জন্ম হয়। ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত মা শ্যামলা গোপালন ছিলেন পেশায় ক্যানসার গবেষক। জ্যামাইকান-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ বাবা ডোনাল্ড জ্যাসপার হ্যারিস ছিলেন অর্থনীতিবিদ।

‘অত্যাশ্চর্য’ প্রত্যাবর্তনের অপক্ষোয় ট্রাম্প
রিন্টু হাসান : মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রার্থী হিসেবে দৌড়ে শামিল হওয়ার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন আমেরিকার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিলিয়নিয়ার।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচিতি এবং ‘অপরিশোধিত’ নির্বাচনি প্রচারশৈলী তাকে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের ভোটে হারিয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কার্যকালে বিতর্কও কম হয়নি। মাত্র একদফাই ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ৭৮ বছরের এই রিপাবলিকান আবারও সব ‘প্রতিক‚লতা’ উপেক্ষা করে ‘অত্যাশ্চর্য’ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটাতে চাইছেন যা তাকে ওভাল অফিসের প্রেসিডেন্টের ডেস্কে ফিরিয়েও নিয়ে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট টাইকুন ফ্রেড ট্রাম্পের চতুর্থ সন্তান। ট্রাম্প পরিবারের কাছে বিপুল পরিমাণে সম্পত্তি থাকা সত্তে¡ও তিনি তার বাবারই মালিকানাধীন সংস্থায় কোনো একটা ছোটখাটো কাজ করবেন বলে এককালে অনুমান করা হয়েছিল।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তবে তিনি গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের পর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, যিনি মেয়াদ শেষে নির্বাচনে হেরে গিয়ে চার বছর পর ফের জয়ী হন। ক্লিভল্যান্ড পরাজিত হওয়ার পর ফের নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরপর নয় বরং দুটি ভিন্ন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নর্থ ক্যারোলাইনায় ২০১৬ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে জিতেছিলেন ট্রাম্প। এখানকার এক সমাবেশে তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নকে আবার তিনি ফিরিয়ে আনবেন।

ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি, শি চিন পিং
বিশ্বনেতাদের সমর্থন ঝুঁকছে কোন পক্ষে?
আশিকুর রহমান : আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কে হতে যাচ্ছেন, তার ওপর নজর পুরো বিশ্বের। কমলা হ্যারিস বা ডোনাল্ড ট্রাম্প যিনিই ক্ষমতায় আসুন, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবছেন বিশ্বনেতারা। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাদের পছন্দের প্রার্থী কে, তা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। এ তালিকায় সবার আগে আসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নাম। তিনি হোয়াইট হাউসে কাকে দেখতে চান? পুতিনের পক্ষ থেকে ‘মজা’ করে কমলাকে পছন্দের কথা বলা হলেও ট্রাম্পের প্রতি অনেক ইঙ্গিত দেখা গেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া এবং ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো টিমোথি অ্যাশ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, পুতিন নানা কারণে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পছন্দ করতে পারেন। প্রথমত, পুতিন মনে করেন ট্রাম্প রাশিয়ার প্রতি নমনীয় এবং ইউক্রেনের সঙ্গে একটি ভালো চুক্তিতে সহায়তা করবেন। এ ছাড়া ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেই জিতুন, মস্কো মনে করে, রাশিয়ার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একই থাকবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং সরাসরি কমলা বা ট্রাম্প কাউকেই সমর্থন দেননি। ট্রাম্পের সময় চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। তাই আবার ট্রাম্প জিতলে সে পরিস্থিতি তৈরি হবে। ডেমোক্র্যাটরাও এখন বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব কমাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে বাণিজ্যযুদ্ধ থাকলেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চেয়েছেন ট্রাম্প। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কাউকে সরাসরি সমর্থন না করলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্পের প্রতিই ঝুঁকে রয়েছেন তিনি।
ইউরোপের নেতাদের মধ্যে অনেকেই এবার কমলা হ্যারিসকে সমর্থন দিয়েছেন। কারণ, ট্রাম্প পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ কমলাকে সমর্থন করে বলেছেন, আমি তাকে ভালোভাবে চিনি। তিনি দারুণ প্রেসিডেন্ট হবেন।ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। কিছুদিন আগেও ট্রাম্প মোদিকে প্রশংসা করে টুইট করেছেন। তবে চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়ার জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো চৈতজ্ঞ বাজপেয়ী বলেন, আমি মনে করি না, মোদির কোনো পছন্দের প্রার্থী আছেন। ইন্ডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে দুই দলেরই মত রয়েছে।
এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল কাউকেই সরাসরি সমর্থন দেননি। তবে বাইডেন প্রশাসনের অধীনে দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ট্রাম্পের সময় কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় খরচ না বাড়ানোর অভিযোগ করা হয়েছিল। জাপানের পক্ষে ট্রাম্প জয়ী হলে তাদের সঙ্গে আমেরিকার সহযোগিতা কমবে। ট্রাম্প শুল্ক বাড়াবেন এবং জাপানকে সামরিক বাজেট বাড়াতে বলবেন। কমলা প্রেসিডেন্ট হলে তাদের নীতি ধারাবাহিকভাবে চালু থাকবে। অস্ট্রেলিয়ার জন্য ট্রাম্প জয়ী হলে নানা প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাই ট্রাম্পের পক্ষে তাদের না যাওয়াই স্বাভাবিক।

ইলেকটোরাল কলেজ ভোট কী
আরাফাত রহমান : আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থীই যে জয়ী হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একজন প্রার্থী তুলনামূলক কম ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। এর মূলে আছে দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থায় ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ নামের ২০০ বছর পুরনো একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই ইলেকটোরাল কলেজে যিনি ভালো ফল করেন তার হাতেই যায় হোয়াইট হাউসের চাবি। এ নির্বাচন ব্যবস্থায় ভোটারদের সরাসরি ভোটে না বরং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন পরোক্ষ ভোটে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হতে প্রার্থীকে সাধারণত দুই ধরনের ভোটে জিততে হয়। এর একটি নাগরিকদের সরাসরি ভোট, যা ‘পপুলার ভোট’ হিসেবে পরিচিত; আরেকটি হচ্ছে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। এই দুটির মধ্যে ইলেকটোরাল কলেজের ভোটেই প্রার্থীর চ‚ড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ (ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া) দেশটিতে মোট ইলেকটোরাল কলেজ ৫১টি। সাংবিধানিকভাবে আমেরিকার কংগ্রেসের দুই কক্ষে থাকা আসনের (প্রতিনিধি পরিষদে ৪৩৫, সেনেটে ১০০) বিপরীতে রাজ্যগুলো তাদের জন্য নির্ধারিত ইলেকটর পায়। কংগ্রেসে রাজধানী অঞ্চল ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার কোনো প্রতিনিধি না থাকলেও সেখান থেকে আসেন তিনজন ইলেকটর। নির্বাচনের দিন ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিলেও আসলে তারা ৫১টি ইলেকটোরাল কলেজের ৫৩৮ জন ইলেকটর নির্বাচিত করে তাদের হাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দায়িত্ব তুলে দেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে একজন প্রার্থীকে এই ৫৩৮ ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে অন্তত ২৭০টি নিশ্চিত করতে হয়।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ০৫ নভেম্বর ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
কোন রাজ্যে কত ইলেকটোরাল ভোট: ২০২০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এবারও সবচেয়ে বেশি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, ৫৪টি। এরপর রয়েছে টেক্সাস ৪০, ফ্লোরিডায় ৩০, নিউ ইয়র্ক ২৮, ইলিনয় ও পেনসিলভানিয়ায় ১৯টি করে।এছাড়া ওহাইওতে ১৭, জর্জিয়ায় ১৬ ও নর্থ ক্যারোলাইনায় ১৬, মিশিগান ১৫, নিউ জার্সিতে ১৪, ভার্জিনিয়াতে ১৩, ওয়াশিংটনে ১২, আরিজোনা, টেনেসি, ম্যাসাচুসেটস ও ইন্ডিয়ানায় ১১, মিনেসোটা, উইসকনসিন, ম্যারিল্যান্ড, মিজৌরি ও কলোরাডোতে ১০, অ্যালবামা ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ৯, কেন্টাকি, অরেগন ও লুইজিয়ানায় ৮, কনেটিকাট ও ওকলাহোমায় ৭, মিসিসিপি, আরকানস, ক্যানজাস, আইওয়া, নেভাডা ও ইউটায় ৬; নিউ মেক্সিকো ও নেব্রাস্কায় ৫; ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, মেইন, রোড আইল্যান্ড, আইডাহো ও হাওয়াইতে ৪; মন্টেনা, নর্থ ডেকোটা, ভার্মন্ট, ডেলাওয়ার, ওয়াইওমিং, সাউথ ডেকোটা, আলাস্কা ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ায় ৩টি করে ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে।
ইলেকটোরাল ভোট সমান হলে কী হবে: নির্বাচনে কোনো প্রার্থীই যদি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, অর্থাৎ প্রতিদ্ব›দ্বী দুই প্রার্থী ২৬৯-২৬৯ ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পান কিংবা তৃতীয় কোনো প্রার্থী ইলেকটোরাল ভোট জেতেন, সে ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। এটি ‘কন্টিনজেন্ট ইলেকশন’ নামে পরিচিত। এ ঘটনা মাত্র একবারই হয়েছে, ১৮২৪ সালে। সে বছর ইলেকটোরাল কলেজ ভোট চার প্রার্থীর মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ায় কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি।
ইউডি/এজেএস

