অটোমেশনে ৩১% পোশাক শ্রমিক কাজ হারিয়েছে
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪, আপডেট ১০:০০
তৈরি পোশাক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বা অটোমেশনের কারণে আশীর্বাদ হয়ে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। অটোমেশন বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে কারখানা পর্যায়ে গড়ে ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ শ্রমিক এ কারণে কাজ হারিয়েছেন, যাদের বড় একটা অংশই ‘হেলপার’ পদে কাজ করতেন। নারী, কিছুটা বয়স্ক, অদক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে অটোমেশন।
‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব’ শিরোনামে এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রোববার রাজধানীর গুলশানে হোটেল আমারিতে জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন এবং আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ সংস্থা সলিডারিডাড এর আয়োজন করে। জরিপ এবং গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহিদুর রহমান। গত আগস্ট থেকে অক্টোবর– তিন মাসে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। মিশ্র পদ্ধতিতে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের ৪২৯ জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার, ২৬ জন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও চারটি দলীয় আলোচনার মাধ্যমে জরিপে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জরিপের ফলাফলে অটোমেশনের কারণে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়, পোশাক খাতের মধ্যে কাজ হারানোর ঘটনা সবচেয়ে বেশি সোয়েটার কারখানায়। এ ধরনের কারখানায় ৩৭ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। শার্ট-প্যান্ট তৈরির ওভেন খাতে কাজ হারানোর হার ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। পোশাক উৎপাদনে বেশ কয়েকটি ধাপে কাজ হয়। এর মধ্যে কাপড় কাটা একটি। এ কাজেই সবচেয়ে বেশি ৪৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ সেলাই কাজের শ্রমিক কাজ হারান। এ ফলাফলকে উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক খাতের এই রূপান্তর কতটা ন্যায্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এত বড় সংখ্যক শ্রমিক তাহলে গেল কোথায় এবং তারা কি এখন বেকার– এ বিষয়ে প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেননি অধ্যাপক শাহিদুর রহমান। আলোচনায় এ ধরনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবারের জরিপে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেননি তারা। এ জন্য আলাদা গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে আলোচনায় তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সহায়ক কমিটির সদস্য এবং সংগঠনের সাবেক সহসভাপতি মিরান আলী বলেন, শ্রমিকরা আসলে বেকার হয়নি। প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের অন্য বিভাগে কাজে লাগানো হয়েছে। অটোমেশনে কাজ হারানোর ঘটনা যেমন আছে, আবার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সস্তা দর, উচ্চ ক্রয়’– এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। এই প্রক্রিয়ায় অটোমেশন বাড়ছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শতভাগ অটোমেশন নয়, আংশিক অটোমেশনই নিরাপদ।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে অটোমেশনের কোনো বিকল্প নেই। তবে কীভাবে অটোমেশেনর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। অটোমেশনে দক্ষতা শ্রমিকদের অভাবকে পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে শ্রম সচিব বলেন, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে দক্ষতার উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে।
আলোনচায় শ্রম সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডি-বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভিয়েতনামসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় দক্ষতায় পিছিয়ে আছে বাংলদেশ। এ জন্য একতরফা শ্রমিকদের দায়ী করা হয়। তবে এ দায় সব পক্ষের। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। শ্রমিক সংগঠন বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে দায়িত্ব কিছু বেশি নিতে হবে। কারণ, এর সঙ্গে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। শ্রমিক সংগঠনগুলোকে যুক্তিসংগত বক্তব্য নিয়ে সোচ্চার হতে হবে।
আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ওমর মো. ইমরুল মহসিন, সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর সেলিম রেজা হাসান, বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন প্রমুখ।
ইউডি/কেএস

