এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক!

এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক!

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫, আপডেট ১৬:০৮

অর্থনৈতিক এবং সামাজিক খাতের প্রবৃদ্ধি কাগজপত্রে দেখালেও হলেও সুফল পৌঁছেনি সাধারণ মানুষের কাছে। যার ফলে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।

বিশৃংখল এই অর্থনীতির ওপর ভর করেই নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী বছর এলডিসি থেকে উত্তরণের চ’ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। মোটাদাগে এই প্রক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশ উত্তরণের পক্ষে, তবে ব্যবসায়ীরা আরও সময় চান। কেননা বেশকিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে যা মোকাবিলা করা বেশ কঠিন হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এজন্য অবশ্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী আস্থা রাখতে পারেন।

গত আওয়ামী লীগ সরকারের এলডিসি থেকে উত্তরণ কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। তড়িঘড়ি করে এ আয়োজন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ ছিল বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। মোটাদাগে সেই পথেই হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার। মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উন্নয়নশীল ও উন্নত এই দুই শ্রেণিতে সব দেশকে ভাগ করে থাকে জাতিসংঘ। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে দেশগুলো তুলনামূলক দুর্বল, তাদের নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা হয়।

অবশ্য বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রপ্তানিকারকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর পণ্য রপ্তানিতে বাজার সুবিধা মিলবে না। দেওয়া যাবে না প্রণোদনা। এতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিল, সেটি তাদের বোধগম্য নয়।

গত শনিবার ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বর্তমান সরকার সঠিক পথে আছে’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখনও প্রস্তুত নয়। আগামী বছর উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর দেশের রপ্তানি খাতে বছরে ৮ বিলিয়ন ক্ষতি হতে পারে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনও প্রস্তুত নয়। গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে শুল্ক সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বছরে ৮ বিলিয়ন ক্ষতি হতে পারে।

জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উন্নয়ন সহযোগিতা কমে যাবে জানিয়ে সিপিডি নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে বাংলাদেশকে কমার্শিয়াল রেটে ঋণ নিতে হবে, যা পরিশোধ ও ঋণের শর্তপূরণ করা কঠিন হবে।’

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় যে অর্থনৈতিক তথ্য দেয়া হয়েছিল, তা ছিল গোজামিলনির্ভর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

অর্থনৈতিক ডেটা কীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহার করা যায়, বাংলাদেশ ছিল তার মধ্যে একটা অগ্রগণ্য দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে (বিবিএস) নির্দেশদানের মাধ্যমে তারা মনমতো ডেটা ব্যবহার করতো।’

এলডিসি থেকে বের হলে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত। কারণ, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাজার-সুবিধা পায়। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আমেরিকা, ইন্ডিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানি করা যায়।

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই বাজার-সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ইইউ জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। ব্রিটেনও একইভাবে সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এলডিসি হিসেবে যেকোনো দেশ তার দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার ওপর নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশও পণ্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দেয়। করসুবিধা, ভর্তুকিসহ নানা ধরনের সুবিধা পান দেশীয় উদ্যোক্তারা। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর নগদ সহায়তা না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। তারই প্রস্তুতি হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে দুই দফায় বিভিন্ন খাতের পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা কমানো হয়।

ইউডি/ আরকে

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading