হরমুজ থেকে মালাক্কা: প্রণালীই কেন আধিপত্যের হাতিয়ার?

হরমুজ থেকে মালাক্কা: প্রণালীই কেন আধিপত্যের হাতিয়ার?

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, আপডেট ১০:০০

বর্তমান বিশ্ব ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির মানচিত্রে সমুদ্রপ্রণালীগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যকার উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই সংকীর্ণ জলপথগুলো কেবল দুই বিশাল জলরাশিকে সংযুক্ত করে না বরং এগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহনের প্রধান ধমনী হিসেবে কাজ করে। ভৌগোলিকভাবে কোনো কোনো প্রণালী অত্যন্ত ছোট মনে হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এগুলোর প্রভাব অপরিসীম।

একটি প্রণালী মূলত দুটি বড় সমুদ্র বা মহাসাগরকে সংযুক্তকারী একটি প্রাকৃতিক সরু জলপথ, যা দুই পাশে স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত থাকে। এই জলপথগুলো জাহাজ চলাচলের জন্য সংক্ষিপ্ত এবং সাশ্রয়ী পথ তৈরি করে দেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সময় ও খরচ উভয়ই কমে আসে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলগুলো কৌশলগত সামরিক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী থাকা মানেই বিশ্ব রাজনীতিতে সেই দেশের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাওয়া।

বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালী। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটা বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, যার ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই প্রণালীটি তাই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে এশীয় বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মালাক্কা প্রণালী। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই জলপথটি আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরকে সংযুক্ত করেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম জাহাজ চলাচলের পথ হিসেবে স্বীকৃত, যা এশিয়ার সাথে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। চীন এবং জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই পথটি তাদের বাণিজ্যিক টিকে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী বাব-আল-মানদেব প্রণালীটি ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝে অবস্থিত। সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অবশ্যই এই পথ অতিক্রম করতে হয়, যা একে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্যের এক অপরিহার্য করিডোর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একইভাবে তুরস্কের বসফরাস প্রণালী ইউরোপ ও এশিয়াকে বিভক্ত করার পাশাপাশি কৃষ্ণ সাগরকে মারমারা সাগরের সাথে যুক্ত করেছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্তকারী জিব্রাল্টার প্রণালী স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক প্রবেশদ্বার। হাজার বছর ধরে এটি ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের সাথে যোগাযোগের একমাত্র প্রাকৃতিক পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া আমেরিকার আলাস্কা ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালী এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশকে পৃথক করার পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগর ও উত্তর মহাসাগরকে যুক্ত করে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বজায় রেখেছে।

প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই প্রণালীগুলো হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি হয়েছে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে স্থলভাগের মাঝখানে এই সংকীর্ণ জলপথের সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির এই বিস্ময়কর সৃষ্টিগুলো আজ বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বর্তমানে অনেক দেশ এই কৌশলগত জলপথগুলোর আশেপাশে নৌঘাঁটি স্থাপন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সূত্র: দ্য সানডে গার্ডিয়ান

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading