দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর সংকট, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গভীর সংকট, দ্রুত সংস্কারের তাগিদ বিশ্বব্যাংকের

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০

টানা তিন বছর ধরে মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তারওপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক প্রতিকূলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বুধবার (০৮ এপ্রিল) আগারগাঁওয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, প্রবৃদ্ধি টেকসই করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অবিলম্বে সাহসী ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিস্তারের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে;

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য: জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪% এ দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে আরও ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।

উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

রাজস্ব সংকট: ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (৭ শতাংশের নিচে) পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণের বোঝা দেশের আর্থিক খাত বর্তমানে বেশ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩০.৬% এ পৌঁছেছে। মূলধন পর্যাপ্ততা বা ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও নিয়ন্ত্রক সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক লোকসান সামাল দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম থাকায় এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে এই ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য সীমিত।

এই সংকট থেকে উত্তরণের বিষয়ে সংস্থাটির, বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসম বলেন, স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। কিন্তু রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাত এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে সুদূরপ্রসারী সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিশীলতা স্থায়ী হতে পারে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের দ্রুত অগ্রগতি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে, রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো, আর্থিক খাতের সুরক্ষায় ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা।

বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’ অনুযায়ী, বৈশ্বিক অস্থিরতায় পুরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৬.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে দক্ষিণ এশিয়া এখনও বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল বলে মনে করে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট এবং প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসোর্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাজারভিত্তিক সংস্কার এবং দক্ষ শিল্পনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading