আমেরিকায় রাখা স্বর্ণ কেন সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো, নেপথ্যে কী?

আমেরিকায় রাখা স্বর্ণ কেন সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো, নেপথ্যে কী?

উত্তরদক্ষিণ। শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৮:২০

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমেরিকা ও কানাডায় সংরক্ষিত ৮৬ টন স্বর্ণ সরিয়ে লন্ডনে নিয়েছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় সংকটের সময় স্বর্ণ যাতে দ্রুত ব্যবহার করা যায়, সে জন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকা ও কানাডায় তাদের মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণ সংরক্ষিত ছিল। এর মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্বর্ণের মজুত এমন জায়গায় রাখা হচ্ছে, যেখানে সংকটের সময় তা সহজে ব্যবহার করা যাবে।

এ পদক্ষেপের পর প্রশ্ন উঠেছে, নেদারল্যান্ডস কি সামনে বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, বিষয়টি তেমন নয়। বরং বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণের মজুত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে।

চলতি বছরের শুরুতে ফ্রান্সও আমেরিকা থেকে তাদের স্বর্ণের কিছু মজুত দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্ডেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ দেশে স্থানান্তর করে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে ১১১ টন এবং প্যারিস থেকে ১০৫ টন স্বর্ণ আনা হয়।

বিশ্বে অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণের মজুত স্থানান্তরের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেনের মতে, শীতল যুদ্ধের সময় ইউরোপের কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিউইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা স্বর্ণ স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তবে এটি সব ক্ষেত্রে প্রধান কারণ নয়। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায়—এমন জায়গায় স্বর্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।’

কাভাতোনির মতে, কোনো আসন্ন বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং নিজেদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করা যায় এবং সংকটের সময় কীভাবে তা কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি সচেতন।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বর্ণ এখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে রাখা হয়েছে।

ব্যাংকটির গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন, ‘কখনো এসব স্বর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন না পড়াই তাদের প্রত্যাশা। তবে স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি বাড়ানোর জন্য এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় স্বর্ণ সংরক্ষণের জন্য লন্ডনকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে দেখা হয়। কোনো সংকটের সময় দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচার প্রয়োজন হলে লন্ডন থেকে তা করা তুলনামূলক সহজ। এ কারণেই ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়।

মধ্য লন্ডনে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে প্রায় চার লাখ স্বর্ণের বার রয়েছে। এসব স্বর্ণের মোট মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বলে জানা যায়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের শিল্পখাতভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখনো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বর্ণ সংরক্ষণকেন্দ্রগুলোর একটি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন স্বর্ণ কোথায় রাখবে, সে ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি বৈচিত্র্য আনছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের মতে, কোনো দেশের স্বর্ণ কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

স্বর্ণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে সব সময় শারীরিকভাবে তা পরিবহন করতে হয় না। নেদারল্যান্ডসও এর একটি অংশ করেছে হিসাবের মাধ্যমে।

ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে একই পরিমাণ স্বর্ণ কিনেছে। ফলে ওই স্বর্ণকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পরিবহন করতে হয়নি।

অন্যদিকে, ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ আমেরিকা ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে নেওয়া হয়েছে। পরে একই পরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়।

স্বর্ণ পরিবহনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রকাশ করে না। তবে এ ধরনের বিপুল মূল্যবান সম্পদ স্থানান্তরে কঠোর নিরাপত্তা ও ব্যাপক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

স্বর্ণ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান ব্রিংকস গ্লোবাল সার্ভিসেস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে স্বর্ণ স্থানান্তরের চাহিদা বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ার কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা বাড়ার আরেকটি কারণ হলো, তারা আগের তুলনায় বেশি স্বর্ণ কিনছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে প্রায় ১ হাজার টন স্বর্ণ কিনেছে। এর আগের দশকে বার্ষিক গড় কেনাকাটা ছিল প্রায় ৫০০ টন।

এই প্রবণতার শিকড় বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পর্যন্ত বিস্তৃত। আগামী বছরগুলোতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাণিজ্যিক ও সামরিক সংঘাত, মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার- সবই স্বর্ণের চাহিদা ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষকদের পূর্বাভাস, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আগস্টের দামের তুলনায় যা প্রায় ৩০০ ডলার বেশি।

গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষক থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বাড়তি স্বর্ণ কেনা দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading