লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার দিন কী ঘটেছিল, কী করেছিল খুনি হিশাম
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার (২৭ এপ্রিল) ২০২৬, আপডেট ২৩:৩০
আমেরিকার ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির সন্ধানে নেমে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পেয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ। দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) এই দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে তাদেরই এক রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর সংশ্লিষ্টতার জোরালো প্রমাণ মিলেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং বাসায় পরিচালিত ফরেনসিক পরীক্ষায় উঠে এসেছে এক বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত। বিশেষ করে নিখোঁজের আগে ও পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির কাছে অভিযুক্তের করা বিভিন্ন অদ্ভুত প্রশ্ন এবং ফ্ল্যাটে পাওয়া রক্তের দাগ এই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।
গত ১৭ এপ্রিল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ইউএসএফ শিক্ষার্থী ওমর হোসাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ বিভাগে গিয়ে তার দুই বন্ধু লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ জানান। তিনি জানান, ১৬ এপ্রিল সকাল ১০টার পর থেকে বৃষ্টির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টির ফোন বন্ধ পেয়ে ওমর তাদের আরেক বন্ধু লিমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু লিমনের ফোনটিও বন্ধ ছিল। এরপর তিনি লিমনের ফ্ল্যাটে গিয়ে জানতে পারেন, লিমনের রুমমেট ঋষিত রাজ মাথুরও তাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেননি। লিমনের শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলেও কোনো সাড়া মেলেনি। আরেক বন্ধু নিশাত তাসনিম জানান, ১৬ এপ্রিল বিকেলে বৃষ্টির সঙ্গে তার দেখা করার কথা থাকলেও তিনি আসেননি।
তদন্তে নেমে পুলিশ ইউএসএফ ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ভবনে বৃষ্টির কার্যালয় থেকে তার আইপ্যাড ও টিফিন বক্স উদ্ধার করে। ক্যাম্পাসের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল দুপুরে বৃষ্টি ভবন থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে হেঁটে যাচ্ছেন এবং রোদের কারণে তার মাথায় একটি ছাতা ছিল। অন্যদিকে, লিমনের ফোনের সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখা যায়, সেদিন বিকেলে ফোনটি ক্যাম্পাসেই ছিল, তবে দিনের শেষ ভাগে সেটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ের কাছাকাছি এবং পরবর্তীতে ক্লিয়ারওয়াটার বিচের উত্তরে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় অবস্থান করছিল।
তদন্তের ভার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের গোয়েন্দা দলের হাতে যাওয়ার পর তারা লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। গোয়েন্দারা লক্ষ্য করেন, আবুঘরবেহর বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ এবং কাটার দাগ রয়েছে। যদিও তিনি দাবি করেন পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে এমনটি হয়েছে, কিন্তু তদন্তে অন্য চিত্র বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে তার গাড়িটি কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ে এলাকায় ছিল, ঠিক যখন লিমনের ফোনের সিগন্যালও ওই একই জায়গায় পাওয়া গিয়েছিল। প্রথমে শিক্ষার্থীদের তার গাড়িতে থাকার কথা অস্বীকার করলেও পরে লিমনের ফোনের তথ্য শুনে তিনি বয়ান বদলে ফেলেন এবং দাবি করেন যে তিনি তাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, আবুঘরবেহর ব্যবহৃত হুন্দাই গাড়িটি পরীক্ষা করে পুলিশের মনে হয়েছে সেটি সম্প্রতি অত্যন্ত গভীরভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ১৬ এপ্রিল রাতে তিনি অনলাইনে বিভিন্ন পরিষ্কারক সামগ্রী যেমন লাইজল ওয়াইপস, ফিব্রিজ এবং বডি ওয়াশ অর্ডার করেছিলেন, যা সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের রেকর্ডে নিশ্চিত হওয়া গেছে। লিমনের শোবার ঘরে বৃষ্টির পার্স, পরিচয়পত্র, জুতা ও সেই ছাতাটি পাওয়া যায় যা নিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। এছাড়া ফ্ল্যাটের ডাস্টবিনের ভেতর থাকা রক্তমাখা ডাক্ট টেপ এবং ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরের ভেতরে লিমনের চশমা, মানিব্যাগ ও বৃষ্টির আইফোন কেস পাওয়া যায়।
ফরেনসিক পরীক্ষায় ফ্ল্যাটের ভেতর শিউরে ওঠার মতো তথ্য পাওয়া গেছে। রান্নাঘর থেকে আবুঘরবেহর শোবার ঘর পর্যন্ত রক্তের ফোঁটার দাগ এবং রাসায়নিক পরীক্ষায় মেঝেতে মানুষের আকারের দুটি আলাদা ছাপ ধরা পড়েছে। রান্নাঘর, বসার ঘর ও বারান্দাতেও বড় পরিসরে রক্তের উপস্থিতি মিলেছে। এছাড়া ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরে রক্তমাখা পোশাক ও ঘর থেকে গায়েব হওয়া বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী পাওয়া যায়। ফোনের রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতের পর আবুঘরবেহ দ্বিতীয়বারের মতো সেন্ট পিটার্সবার্গ সংলগ্ন ব্রিজের দিকে গিয়েছিলেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি বেরিয়ে আসে আবুঘরবেহর চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ইতিহাসে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন কীভাবে একজন মানুষকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়। এরপর যখন নিখোঁজের খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি ‘বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজ’ হওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান করেন। বর্তমানে এই লোমহর্ষক ঘটনার তদন্ত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ইউডি/এবি

