ইরানে ‘ব্যর্থ’ আমেরিকা, আধিপত্য রক্ষায় নয়া ‘মিশন’: ট্রাম্পের ‘দৃষ্টিতে’ এবার কিউবা !

ইরানে ‘ব্যর্থ’ আমেরিকা, আধিপত্য রক্ষায় নয়া ‘মিশন’: ট্রাম্পের ‘দৃষ্টিতে’ এবার কিউবা !

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬ । আপডেট ১৭:০০

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্যে কিউবার বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে বহুবার। কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র দীর্ঘদিনের বাসনা কিউবার কমিউনিস্ট শাসন গুঁড়িয়ে দেওয়া। খোদ ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কিউবা দখলের সম্মান আমি পাব।’ এমন পরিস্থিতিতে কিউবার সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ইরানের পর কিউবাই হয়তো মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে। ইতোমধ্যেই কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে দুইজন মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র, চারটি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯৬ সালে দুটি মার্কিন বিমান ভ‚পাতিত করার অভিযোগ এনেছে আমেরিকা। এছাড়াও কিউবাকে ‘উদীয়মান হুমকি’ হিসেবে দাবি করছে মার্কিন কর্মকর্তারা। তাতে এটা স্পষ্ট যে, ইরানে ‘ব্যর্থ’ ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট কিউবা। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য নিছক এক ‘অছিলা’

আরাফাত রহমান : আমেরিকা এখন কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে দুইজন মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র, চারটি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯৬ সালে দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করার অভিযোগ এনেছে। এ ঘটনা ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করায়। সেসময় আমেরিকার সামরিক বাহিনী এ পদ্ধতিতে মাদুরোকে অপহরণের আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করেছিল। ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক ওয়েন জোনস ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ লিখেছেন, মার্কিন যুদ্ধযন্ত্র এবার কিউবার দিকে ঘুরেছে। গত সপ্তাহে কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোজাসাপ্টা বলেছেন, কিউবার কমিউনিস্ট শাসন গুঁড়িয়ে দেওয়া তার দীর্ঘদিনের বাসনা। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ওয়াশিংটন এখনো কিউবার সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে তিনি বলতে ভুলেননি-এমন সমঝোতার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। ওয়েন জোনস আরও লিখেন, দুই মাস আগে আমি কাছ থেকে দেখেছি, দশকের পর দশক ধরে মার্কিন অবরোধে কিউবার অর্থনীতি কতটা বিপর্যস্ত। আর জানুয়ারি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তেল অবরোধে দেশটি ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য ছড়াচ্ছে যে কিউবার হাতে তিন শতাধিক সামরিক ড্রোন রয়েছে। সেগুলো দ্বারা দেশটি আমেরিকার গুয়ান্তানামো বে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা কিউবাকে ‘উদীয়মান হুমকি’ হিসেবে দাবি করেছেন। কিন্তু কয়েক দশক ধরে আমেরিকার সঙ্গে নানা টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া কিউবা হঠাৎ করে নিজ উপক‚ল থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে আমেরিকার ওপর হামলা করবে-এ ধারণা আকাশ কুসুম কল্পনা। এরকম পদক্ষেপের মার্কিন প্রতিশোধ কিউবা ভালোভাবেই জানে। তাই পুরো বিষয়টি ইরাক আক্রমণের আগে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস’ গল্পের মতো পুরোনো এক অছিলা মাত্র, বলে মনে করছেন জোনস। ট্রাম্পও নিজ উদ্দেশ্য আর গোপন রাখছেন না। গত মার্চে তিনি বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কিউবা দখলের সম্মান আমি পাব।’ এরকম ভাষা ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর অভিজ্ঞতা মনে করায়। তারা আফ্রিকাকে ফালি ফালি করে কর্তন করে নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ট্রাম্প আরও ব্যক্ত করেন, আমি মনে করি, দেশটির সঙ্গে যা খুশি তা-ই আমি করতে পারি।

সম্প্রতি মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে পুরোনো রণতরী ‘ইউএসএস নিমিৎজ’ ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি সামুদ্রিক মহড়ার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কিউবার সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, ইরানের পর কিউবাই হয়তো মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে। বিশেষ করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্যেও কিউবার বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত বহুবার মিলেছে। কিউবার রাজধানী হাভানায় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোই তাদের লক্ষ্য- এমন মন্তব্যও অতীতে একাধিকবার সামনে এসেছে। তবে ট্রাম্পের সা¤প্রতিক মন্তব্যে কিউবা নিয়ে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। তবু আন্তর্জাতিক ক‚টনৈতিক মহলে এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ ইরান যুদ্ধ চলাকালীনই কিউবা প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প কার্যত ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য ভ‚রাজনৈতিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।

৬৬ বছর ধরে কিউবায় হামলার ছুতা খুঁজছে আমেরিকা, দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

রিন্টু হাসান : ১৯৫৯ সালে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর আমেরিকার সঙ্গে শত্রুতা ও নানান ধরনের অবরোধের কারণে এই দ্বীপের বাসিন্দাদের ওপর নেমে আসে দুর্ভোগ এবং তা চলছে ৬৬ বছর ধরে। এখন সেই দুর্ভোগ যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন সেনারা সব আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটির রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় আসা জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। কিউবার দুরবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা জানায়, দ্বীপটি যেন শিল্পযুগের আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি, শহর-নগর সবকিছু অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। কলকারখানায় স্থবিরতা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়-কিউবায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেশটির একটি বড় অংশ অন্ধকারে। এর প্রায় ১ কোটি জনসংখ্যার অধিকাংশ জীবন চালাতে প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে কর্ম-ঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক এলাকায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের রাস্তায় জড়ো হয়ে থালা-বাটি বাজিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে।

অনেকের কাছে মনে হতে পারে-এপ্রিল নয়, মে যেন কিউবাবাসীদের জন্য ‘নিষ্ঠুরতম’ মাস। ১৯৬০ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে-দীর্ঘ ৬৬ বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ আমেরিকা ছোট্ট দ্বীপদেশ কিউবায় হামলার ছুতা খুঁজে আসছে। বিপরীতে দ্বীপবাসীকে খুঁজে যেতে হচ্ছে ‘হামলা নয়’, ‘প্রতিহামলা নয়’, স্রেফ বেঁচে থাকার পথ। চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যেই আরেকটি ‘সংঘাতের’ ডঙ্কা শোনা যাচ্ছে। তাও আবার খোদ আমেরিকার দোরগোড়ায়। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে অনেকটাই ‘ঢিল ছোড়া দূরত্বে’। ‘কিউবার অভিযোগ সামরিক হামলার জন্য আমেরিকা ছুতা খুঁজছে’-বার্তা সংস্থার এমন শিরোনাম অনেকের মনে অতীত জাগিয়ে তুলতে পারে। কেননা, এ ধরনের সংবাদ বিশ্ববাসী পেয়ে আসছে ৬ দশকের বেশি সময় ধরে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, আমেরিকার কঠোর তেল নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবা চরম জ্বালানি সংকটে ভুগছে। ট্রাম্প প্রশাসন চাপ দিচ্ছে কিউবার সরকারকে চুক্তিতে পৌঁছাতে। বিশ্লেষকরা মনে করেন-৬ দশকের বেশি সময় আগে শুরু হওয়া আমেরিকা ও কিউবার সংঘাতের জেরে ধীরে ধীরে ‘ফোকলা’ হয়েছে এক সময়ের সমৃদ্ধ কিউবা। মহাক্ষমতাধর আমেরিকার চাপে ‘চিড়া চেপ্টা’ কিউবার অর্থনীতি। এক সময়ের ‘আদর্শিক মিত্র’ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বর্তমানের ‘রাজনৈতিক মিত্র’ রাশিয়ার সহায়তায় চলছে ক্যারিবীয় দেশটির সরকার। যতদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকেছিল ততদিন কিউবাকে সমঝেই চলতো আমেরিকা। মূলত দ্বীপটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর মধ্যেই সীমিত ছিল মার্কিন সরকারের ‘চাপ’।

ফিদেল কাস্ত্রো

১৯৯১ সালে সোভিয়েত শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট দেশগুলোয় শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের ‘বান’ বয়ে যেতে শুরু করে। তবে সেই ‘পরিবর্তনের’ হাওয়া ঠেকিয়ে রাখে হাভানা। পৃথিবীতে হাতে গোনা যে কয়েকটি দেশ নিজেদের কমিউনিস্ট বলে দাবি করে, কিউবা তাদের অন্যতম। ইতিহাস বলছে-১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে পতন হয় দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তার। এর মাস ছয়েকের মধ্যে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে পুঁজিবাদী আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। সেসময় কাস্ত্রো তার সরকারের ওপর ‘খড়গহস্ত’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন আসেরিকার বিরুদ্ধে। বিপ্লবের পর ব্যক্তিগত সম্পত্তি জব্দ করার পাশাপাশি শীর্ষ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে কিউবার সরকার। এর ফলে কিউবায় মার্কিন ধনকুবেররা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক বছরের মধ্যে কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা পান তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার। কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দেয় আমেরিকা। পরিস্থিতি এত জটিল হয় যে, ১৯৬১ সালে হাভানার সঙ্গে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ওয়াশিংটন ডিসি।

১৯৬১ সালের ১৫ এপ্রিল কিউবার ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। আবার যেন সেই দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সেই দ্বীপ দেশটিতে। সেদিন আমেরিকায় প্রশিক্ষণ নেওয়া কিউবার কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী একটি দল হামলা চালিয়েছিল কিউবার কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে। এর দুদিন পর বিরোধীদের কয়েকটি দল মার্কিন সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে দ্বীপের কয়েকটি অংশে অবতরণ করেছিল। ব্রিটানিকার তথ্য বলছে: ১৯৬০ সালের মে মাস থেকেই কিউবায় আক্রমণের পরিকল্পনা করে আসছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। পরের বছর ১৫ এপ্রিল হাভানার কাছে দ্বীপটির মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলীয় ‘বে অব পিগস’ এলাকায় একদল প্রবাসী কিউবান কমিউনিস্ট ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। কাস্ত্রোর হাতে ক্ষমতাচ্যুত বাতিস্তুার সমর্থকদের একটি অংশকে সিআইএ সেই হামলাকারীদের দলে রেখেছিল। হামলাকারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই কিউবার সরকারি বাহিনীর হাতে পরাজিত হন। পরে, মুক্তিপণের মাধ্যমে কাস্ত্রো সরকার আটক ব্যক্তিদের আমেরিকায় ফেরত পাঠায়। বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, প্রবাসী কিউবানদের মার্কিন সরকার যথাযথ সহায়তায় না দেওয়ায় সেই ‘বে অব পিগ’ অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কারও মতে, কিউবার সরকারি বাহিনীর তুলনায় হামলাকারীদের সংখ্যা অনেক কম থাকায় অভিযানটি ব্যর্থ হয়।

সিআইএ সমর্থিত অভিযান ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটেই জন্ম দিয়েছিল কিউবার আমেরিকা-কাঁপানো ‘ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবার নিরাপত্তার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বীপটিতে আমেরিকার দিকে তাক করে পরমাণু বোমা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করলে দুই পরাশক্তি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ব্রিটানিকার তথ্য অনুসারে-পরিস্থিতি এত জটিল হয়েছিল যে, সেই বছর ২৮ অক্টোবর সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকিতা ক্রশ্চেভ তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডিকে জানান, মস্কো কিউবাতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন বন্ধ রাখবে। যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে সেগুলো ফেরত আনা হবে। বিনিময়ে, কেনেডি কথা দেন যে আমেরিকা কখনই কিউবায় হামলা চালাবে না। তবে বর্তমান মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন তা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।

রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, নয়া চাপ ওয়াশিংটনের

মহোসু : কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে খুনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছে আমেরিকা। দেশটির এ পদক্ষেপকে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের আরও চাপ বৃদ্ধির চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনার মাধ্যমে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের দুই পুরোনো প্রতিদ্ব›দ্বীর সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কিউবার বর্তমান সরকারে বদল আনতে চাইছেন। ১৯৫৯ সালে রাউল কাস্ত্রোর বড় ভাই ফিদেল কাস্ত্রো কিউবা বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার পর থেকেই দেশটিতে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় রয়েছেন।

রাউল কাস্ত্রো

১৯৯৬ সালের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাউল কাস্ত্রো ও কিউবার সামরিক বাহিনীর পাঁচ বিমানচালকের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। সে সময় কিউবার যুদ্ধবিমান নির্বাসিত কিউবানদের সংগঠন ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’-এর দুটি বিমান গুলি করে ভ‚পাতিত করেছিল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ও গোয়েন্দারা এ হামলায় কাস্ত্রোর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্রের একটি, খুনের চারটি ও উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত করার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে। মে মাসের শুরুর দিকে তাকে কিউবায় দেখা গেছে। তবে তিনি দেশ ছেড়েছেন বা তাকে আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া হবে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সাধারণত বিদেশি কোনো নেতার বিরুদ্ধে আমেরিকার এমন ফৌজদারি মামলা করার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে বেশ জোরাল পদক্ষেপ নিচ্ছে। রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এ মামলা তারই একটি উদাহরণ।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল বলেন, নিজেদের এলাকা রক্ষায় কিউবা তখন বৈধভাবেই ওই উড়োজাহাজগুলো ভ‚পাতিত করেছিল। দিয়াজ-ক্যানেল আরও বলেন, কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অজুহাত হিসেবেই এ অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। একে একটি ‘ভুল পদক্ষেপ’ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কিউবায় অভিযান মার্কিন সেনাদের জন্য সহজ হবে নাকি ঝুঁকির ?

সাদিত কবির : ভেনেজুয়েলা ও ইরানে অভিযানের আগে আমেরিকাকে বড় আকারের সামরিক প্রস্তুতি নিতে দেখা গিয়েছিল। কিউবার কাছাকাছি বর্তমানে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিউবা উপক‚লে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা উড়োজাহাজের চলাচল বেড়েছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলায় হামলার আগেও এ ধরনের তৎপরতা বাড়তে দেখা গিয়েছিল। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো, নতুন কোনো সামরিক অভিযানের পক্ষে তার রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ খুবই কম। সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য গণমাধ্যমের সা¤প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের বিরোধী। অনেকেই ট্রাম্পের নীতিকে সরাসরি তাদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে মেলাতে শুরু করেছেন।

জরিপগুলোয় আরও দেখা গেছে যে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কিউবা নীতিরও বিপক্ষে। এদিকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনীর আকস্মিক অভিযানের চেয়ে কিউবায় যেকোনো মার্কিন অভিযানে অনেক বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে। মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঝুঁকিও তৈরি করবে। কিউবার সামরিক বাহিনীতে সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। অনেক সরঞ্জাম পুরোনোও। তা সত্তে¡ও তারা মার্কিন সেনাদের ক্ষতি করতে সক্ষম। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক লি শ্লেনকা বলেন, কিউবা এমন একটি প্রতিরক্ষামূলক নীতি অনুসরণ করে, যেখানে বিদেশি আগ্রাসন হলে পুরো জনগণকে সাড়া দিতে হয়। আমেরিকা সেখানে কোনো হামলা চালালে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনা ঘটবে। তবে কিউবা সরকারের আমূল কোনো পরিবর্তন দেখা যাবে না। বড়জোর যা হবে, তা হলো—দেশটিতে নিপীড়ন বৃদ্ধি পাবে এবং গণতন্ত্র ও মুক্তবাজারের দিকে খুব সামান্য অগ্রগতি হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। জুন ০১, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা

ট্রাম্প সম্ভবত কিউবাকে নিজের ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য এক লাভজনক খাত ভাবেন। ফলে দেশটির অর্থনীতি মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা হবে। বিশেষ করে কিউবার বিখ্যাত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা ইতোমধ্যে নানা সংকটে দুর্বল। কিউবায় কোনো বিরোধী দল বা শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র অবধারিতভাবে কিউবার ক্ষমতায় একজন হাতের পুতুল বসাবে। আর নিজ দেশ দখল হওয়ায় ক্ষুব্ধ কিউবানরা হয়তো মার্কিন গোলাবর্ষণে ইরাকি ও আফগান বেসামরিক নাগরিকদের মতো নির্মম সহিংসতার শিকার হবে। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যে গুণটি ছিল না, ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন এক মহান গুণ রয়েছে। অন্য জাতিকে মুক্ত করার বেহুদা ভং তিনি ধরেন না। মানবমুক্তির কোনো মহা বয়ানে তার একবিন্দু আগ্রহ নেই। ফলে কিউবার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ মার্কিন অপমানের প্রতিশোধস্পৃহা ও ব্যবসায়িক লোভ দিয়ে পরিচালিত হবে। যে যুদ্ধের লাভের গুড় খাবে মার্কিন অভিজাতরা, কিন্তু মূল্য চুকাবে কিউবার নিরীহ জনগণ।

ইউডি/এজেএস

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading