বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন, ক্ষমা করবেন
উত্তরদক্ষিণ মূদ্রিত সংস্করন ২৭ অক্টোবর ২০১৯ ০০:০০
মোহম্মাদ শিহাবঃ স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ’৭৫ পরবর্তী সরকারগুলোর সময় মুক্তিযোদ্ধারা পদে পদে অপমানিত হয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন, বঞ্চিত হয়েছেন। বিপরীতে স্বাধীনতাবিরোধী- একাত্তরের প্রেতাত্মারা ফুলে ফেঁপে এসময় কলা গাছ, বট গাছ কিংবা তাল গাছ হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার চোখের সামনে দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা গাড়িতে লাল-সবুজের পতাকা বহন করে দম্ভের সঙ্গে চলতেন। সেখান থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীনও দেশে মুক্তিযোদ্ধার অপমান কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ৮০ উর্ধ্ব মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের শেষ বক্তব্যটি ছিল ঠিক এরকম, ‘..যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম/স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’ সেই স্যালুট ছাড়া নিজ গ্রামের বাড়িতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। বিষয়টি হয়তো এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে। নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে অভিযুক্তরা কোনো পাড় পাবে না- সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন যে দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা কিংবা যন্ত্রণা হূদয়ে বহন করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তার সেই অপমানের কী শোধ দিতে পারবে জাতি? যে শাস্তিই হোক অভিযুক্তদের, তাতো আর কোনো দিনই জানবেন না জাতির গৌরাবের প্রতীক মৃত ইসমাইল হোসেন। তার ইচ্ছে অনুযায়ী গার্ড অব অনার ছাড়াই তার লাশ দাফন হয়েছে। এটি জতির জন্য লজ্জার ইতিহাস বৈকি! তার বিদেহী আত্মার কাছে বিনীতভাবে বিবেকবান মানুষের আবেদন, ‘আমাদের ক্ষমা করবেন ইসমাইল হোসেন’। পাশাপাশি অপমানকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা এবং তার সন্তানের চাকরি সম্মানের সঙ্গে পুনর্বহাল করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলেই বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেক বাঙালির। জানা গেছে, এরই মধ্যে চাকরিচ্যুত সন্তানের চাকরি পুনর্বহালের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তদের শাস্তি না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের সন্তান ‘ডিসির চাকরি নেবেন না’ বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি: বার্তা সংস্থা বিডিনিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার নিতে অস্বীকার করা দিনাজপুরের সেই মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের চাকরিচ্যুত ছেলে জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবিত চাকরি নেবেন না বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। তারা সাংবাদিককে একথা বললেও জেলা প্রশাসককে (ডিসি) চাকরি নিতে অনীহার বিষয়টি অবহিত করেননি বলে জানান। গত শুক্রবার দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলামকে চাকরি দেওয়ার কথা জানান। ওই সময় চাকরি না নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি পরিবারের সদস্যরা। এদিকে, দেশব্যাপী সমালোচনার মধ্যে গতকাল শনিবার রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন প্রয়াত এই মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন।
সদর উপজেলার যোগিবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন তার গাড়িচালক ছেলেকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করাসহ মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে একটি চিঠি লেখেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে। হাসপাতাল থেকে লেখা ওই চিঠিতে তিনি মৃত্যুর পর প্রশাসনের গার্ড অব অনার নিতে অনীহার কথা বলেন। তারপর গত বুধবার রাতে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। পরিবারের আপত্তির কারণে পরের দিন বৃহস্পতিবার তাকে গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন করা হয়। এর পর শনিবার সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বড় ছেলে নুরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জেলা প্রশাসক তার কার্যালয়ে ছোট ভাই নুর ইসলামকে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু এতকিছু ঘটনার পর তার পক্ষে আর চাকরি করা সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাকে চাকরির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। চাকরি প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানাননি বলে নিশ্চিত করেছেন।
নুর ইসলামের চাচাত ভাই স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের অধীনে চাকরির নিরাপত্তা কে দিবে! আবারও কোনো মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত করলে অবাক হবার কিছু থাকবে না।’ রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন শনিবার দুপুরে দিনাজপুরের সদর উপজেলার যোগিবাড়ী গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, বড় ছেলে, চাকুরিচ্যুত ছেলে নুর ইসলামের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের মৌখিক অভিযোগ শোনেন। পরে পরিবারের কাছে লিখিত চেয়ে বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। এ সময় সেখানে থাকা সাবেক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লোকমান হাকিম ও দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল বলেন, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের লেখা চিঠিসহ চিঠিতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান। প্রসঙ্গত, মক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছোট ছেলে নুর ইসলাম দিনাজপুর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়িচালক ছিলেন। গাড়িচালক হলেও সহকারী কমিশনারের স্ত্রীর কথামতো রান্না করতেও হতো তাকে। আর রান্নার পর তা ভালো না হওয়ার অজুহাতে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং তাকে দেওয়া সরকারি বাড়িটিও কেড়ে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে নুর ইসলামের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিমসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরেও কোনো ফল পাননি। শেষে অসুস্থ অবস্থায় গত মঙ্গলবার তিনি হাসপাতালের বেডে বসে একটি চিঠি লেখেন সাংসদ ইকবালুর রহিমের কাছে। সেখানে তিনি বলেন, তাকে যেন মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়া না হয়। এরপর দিনই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর যথারীতি জেলা প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার দল তাদের বাড়ি গেলে স্বজনদের বাধার কারণে গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের মুক্তিবার্তা নম্বর- ০৩০৮০১১০০২। চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বক্তব্য হলো, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) গাড়ি চালক হিসেবে চাকরি হয় ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। এরপর থেকে নুর ইসলাম দিনাজপুর সদর উপজেলা এসি ল্যান্ডের [সহকারী কমিশনারের (ভূমি)] গাড়ি চালাতেন। এক পর্যায়ে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলামের স্ত্রী- নুর ইসলামকে শৌচাগার পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন। এরপর ছেলেকে সরকারি বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। চিঠিতে আরও লেখেন, পরে স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়াকে নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও তার ওপর রাগ করেন। এরপর নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপায় না পেয়ে ইসমাইল ও তার ছেলে নুর সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু এরপরও কোনো প্রতিকার হয়নি। হুইপকে উদ্দেশ্য করে সবশেষে ইসমাইল হোসেন লেখেন, ‘আমার বয়স প্রায় ৮০ বত্সরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাত্ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙ্গে পড়েছি। জীবণ মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাত্ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি- যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম/স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’

