আমেরিকায় করোনা রোগী ৩ লাখ, মৃত্যু সাড়ে ৮ হাজার
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন ০৫ এপ্রিল ২০২০। ১৭:১০
হিল্লোল বাউলিয়া: মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসে ইতালি ও স্পেনে মৃত্যু হার আগের দিনগুলোর চেয়ে কমতে শুরু করেছে। তবে এই সংখ্যা ভয়াবহ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মার্কিন আমেরিকায়। এরই মধ্যে দেশটিতে ৩ লাখ ১২ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক করোনায় বা কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন সাড়ে ৮ হাজারের বেশি। সামনের দিনগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশবাসীকে সামনের ‘কঠিন দুই সপ্তাহের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। শনিবার (৪ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অনেক অনেক মৃত্যু হতে যাচ্ছে।’ এখবর জানিয়েছে বার্তা সংস্থা- রয়টার্স।
সুরক্ষা উপকরণ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা মেটাতে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও হাসপাতালকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেবল নিউইয়র্কেই আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার পেরিয়ে গেছে। দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা অতিক্রম করেছে সাড়ে ৩ হাজার, এ সংখ্যা ভাইরাসটি যে দেশ থেকে উদ্ভূত হয়েছে সেই চীনের থেকে বেশি। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৪ এপ্রিল) পর্যন্ত মার্কিন দেশটিতে কোভিড-১৯ রোগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজারের বেশি; মৃত্যু ছাড়িয়েছে সাড়ে ৮ হাজার। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশে মহামারি দাপিয়ে বেড়ালেও ইতালি ও স্পেনে এ মুহূর্তে মৃত্যুহার কমার চিহ্নও আপাত স্বস্তি মিলছে।
ইতালিতে শনিবার ৬৮১ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগ। ২৩ মার্চের পর দেশটিতে একদিনে এটিই সবচেয়ে কম মৃত্যু, বলছে রয়টার্স। ইতালিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা গুরুতর রোগী সংখ্যাও কমেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এদিন দেশটিতে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চার হাজার ৮০৫ জন শনাক্ত হয়েছে, সংখ্যাটি গত কয়েকদিনের তুলনায় একটু বেশি।
ইউরোপের এ দেশটিতেই কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। শনিবার পর্যন্ত ইতালিতে ১৫ হাজার ৩৬২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজারেরও বেশি বলে জানিয়েছে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য আক্রান্তের সংখ্যায় এ পর্যন্ত আমেরিকার ধারে কাছেও নেই কেনও দেশ। তবে আক্রান্তের দিক থেকে দ্বিতীয় স্পেন ও তৃতীয় অবস্থানে ইতালি রয়েছে। আর মৃত্যুতে ইতালি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হলেও আমেরিকা খুব দ্রুতই সেই অবস্থান টপকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এদিকে আশার খবর পাওয়া যাচ্ছে- ইউরোপের আরেকটি বিধ্বস্ত দেশ- স্পেন থেকে। রয়টার্সের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, মৃত্যু ও আক্রান্তের হার কমছে সেখানে। শনিবার দেশটিতে ৮০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সংখ্যা শুক্র ও বৃহস্পতিবারের তুলনায় কম। অবশ্য মোট আক্রান্তের সংখ্যায় স্পেন ইতালিকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি মানুষের দেহে করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে; মৃতের সংখ্যাও ১২ হাজার ছুঁইছুঁই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে লকডাউনের মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়িয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
আক্রান্তের সংখ্যায় জার্মানির পর থাকা ফ্রান্সে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার পেরিয়ে গেছে। বিভিন্ন নার্সিং হোমগুলোতে পড়ে থাকা মৃতদেহ যোগ করায় গত কয়েকদিনে দেশটিতে মৃতের সংখ্যায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত-মৃতের সংখ্যা বাড়ছে ব্রিটেনেও। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে আগে থেকে অসুস্ত ৫ বছর বয়সী এক শিশুও আছে বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শনিবার পর্যন্ত ব্রিটেনে ও এর নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডে কোভিড-১৯ এ ২ হাজার ৩২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়।
ডিসেম্বরের শেষদিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেও গত কিছুদিন ধরে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকখানি কমে এসেছিল। শনিবার দেশটি করোনাভাইরাসে মৃতদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনে যে আক্রান্তদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই হয় বিদেশফেরত, নয়তো তাদের মাধ্যমে সংক্রমিত হচ্ছেন বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। শনিবারও দেশটিতে নতুন ৩০ জন শনাক্ত হয়েছে; আগের কয়েকদিনের তুলনায় এ সংখ্যা বেশি।
এশিয়ার অন্যতম করোনাভাইরাস আক্রান্ত দেশ ইরানে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাজার ৭৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে, ৩ হাজার ৪৫২ মৃত্যু নিয়ে মৃতের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়েছে দেশটি; সেখানে সুস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যা ১৯ হাজার ৭৩৬ জন। ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ সৌদি আরবে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩৭০ জন, মৃতের সংখ্যা ২৯ এবং সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ৪২০ জন। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা শহরে ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়েছিল আগের দিন। সেটি শেষ হওয়ার পর নতুন কী পদক্ষেপ নেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্বের হাজার হাজার মুসলিম।
মুসলিমদের চীর শত্রু হিসেবে বিবেচিত একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্র- ইসরায়েল আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ১৮ জন, মৃতের সংখ্যা ৪৬ জন ও সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪৭৭ জন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেও আইসোলেশনে রয়েছেন। যদিও তিনি করোনা আক্রান্ত নন বলে দাবি করেছেন।
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেও করোনা ভাইরাস তার ভয়াল থাবা নিয়ে হাজির হয়েছে। আক্রান্ত-মৃত্যু বাড়ছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ইন্ডিয়ায়। এদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৮৩ জন ও সুস্থ হয়েছেন ৯১৫ জন। ইন্ডিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার পর দেশটি লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রবিবার সকাল পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশটিতে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার। পাকিস্তানেও এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮১৬ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্তের তথ্য দিয়েছে ডন; দেশটিতে কোভিড-১৯ এ মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে।
সেই তুলনায় এখনও ভালো আছে বাংলাদেশ। দেশে এ পর্যন্ত ৮৮ জন আক্রান্ত ও ৯ জন মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে সরকারের আইইডিসিআর থেকে। যদিও এই সংখ্যা নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। আর দেশব্যাপী পরীক্ষার কার্যক্রম বৃদ্ধি করার পর দুদিনেই ৩৬ জন করোনা শনাক্ত হয়। এসময় ৩ জন মৃত্যুর তথ্য আসে। ফলে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে কোনো মূল্যে করোনা মহামারি রোধে সরকার আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীনতা দিবসের পর বাংলা নববর্ষ ও শবে বরাতের আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করা হয়েছে। সাধারণ ছুটি বৃদ্ধি করা হয়েছে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে অর্থনৈতিক গতিধারা সচল রাখতে রবিবারই সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, হোম কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা গেলে হয়তো পরিস্থিতি ভয়বহ রূপ থেকে রক্ষা পেতে পারে।

