ইন্ডিয়ার সবচেয়ে ধনী শহর করোনায় বেশি বিপর্যস্ত!

ইন্ডিয়ার সবচেয়ে ধনী শহর করোনায় বেশি বিপর্যস্ত!

উত্তরদক্ষিণ বুধবার ২৭ মে ২০২০। ২২:৩০

ইন্ডিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে পাঁচ ভাগের এক ভাগেরই বাস মুম্বাইয়ে। শহরটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩১ হাজারের বেশি। ইন্ডিয়ার অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত ওই শহরটির এমন অবস্থার পেছনে কারণ কী?

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মুম্বাই হচ্ছে এমন একটি শহর যেটি কখনো থেমে থাকে না। বিবিসির সাংবাদিক যোগিতা লিমাই বলেছেন, এখানকার একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি বলতে পারি যে, এটা খুবই সত্য কথা। এমনকি ২০০৮ সালে যখন শহরটির এক অংশে হামলা হয়েছিলে, দক্ষিণ মুম্বাইয়ে অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি বন্দুকধারীরা, তখনও শহরের অন্য অংশে ট্রেন চলেছে, লাখ লাখ মানুষ কাজে বেড়িয়েছে, খোলা ছিল রেস্তোরা আর অফিসগুলোও। কিন্তু কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ এতো ব্যস্ত একটি শহরকে ভুতুড়ে শহরে পরিণত করেছে। কোনও ধরণের শিথিলতা না মেনে কঠোর লকডাউন চলছে শহরটিতে। কোভিডের কারণে ভেঙে পড়তে বসেছে এর স্বাস্থ্যগত অবকাঠামোগুলোও।

“গত রাতে মাত্র ৬ ঘণ্টায় আমি ১৫-১৮ জনকে কোভিড জনিত সমস্যায় ভুগে মারা যেতে দেখেছি। এর আগে একদিনে আমি কখনো এতো মৃত্যু দেখিনি,” বলছিলেন কেইএম হাসপাতালের এক চিকিৎসক। করোনাভাইরাসের চিকিৎসা দেয়ার জন্য ইন্ডিয়ায় নির্ধারিত অনেকগুলো হাসপাতালের মধ্যে সেটি একটি। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ভয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি ওই চিকিৎসক।

বিবিসিকে ওই চিকিৎসক বলেন, “এটা যুদ্ধের ময়দানের মতো। প্রতিটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন করে রোগী। কেউ কেউ মেঝেতে, বারান্দায়ও আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের পর্যাপ্ত অক্সিজেন দেয়ার ব্যবস্থা নেই। তাই অনেকের প্রয়োজন হলেও আমরা দিতে পারছি না।”

আরেক সরকারি হাসপাতাল- সিওন হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, তারা একটি অক্সিজেন ট্যাঙ্ক দুই থেকে তিনজন রোগীর মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। বেশি রোগীকে সেবা দিতে দুই বেডের মাঝখানে জায়গা কমিয়ে আনা হয়েছে। তিনি জানান, যেখানে পিপিই বা ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক বদলানো হয়, সেখানে সঠিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। আর মুম্বাইয়ের মতো জায়গায় যেখানে প্রচণ্ড গরম এবং আদ্র আবহাওয়া সেখানে পিপিই পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘামে ভিজে যান চিকিৎসকরা।

সিওন এবং কেইএম হাসপাতালে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মৃতদেহের পাশেই সেবা দেয়া হচ্ছে রোগীদের। ওয়ার্ডে রোগীদের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। এমন অবস্থার ভিডিও নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। “মুম্বাইয়ে অনেক নামকরা চিকিৎসক এবং ভালো স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। কিন্তু এগুলো মহামারির জন্য তৈরি ছিল না,” মুম্বাইয়ের একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সোয়াতি রানে বলেন। তার মতে, “স্বপ্নের শহর দুঃস্বপ্নের শহরে পরিণত হয়েছে।”

ইন্ডিয়ার অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত মুম্বাই ছোট ছোট কতগুলো দ্বীপ একসাথে নিয়ে গঠিত, যার বেশিরভাগ অংশই আরব সাগরে দিয়ে বেষ্টিত। বছরজুড়েই কাজ আর ভাগ্যের সন্ধানে সারা ইন্ডিয়ার লাখ লাখ বাসিন্দা যান সেখানে। তবে করোনা মহামারি যুদ্ধে শহরটির এমন বেহাল দশার অন্যতম বড় একটি কারণ হচ্ছে এর জনসংখ্যার ঘনত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী- এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জন ঘনত্বের শহর।

ওই হাসপাতালগুলোর এক চিকিৎসক বলেন, “মুম্বাইয়ের স্বাস্থ্যসেবার দুরাবস্থা দীর্ঘেদেনর। দুঃখজনকভাবে করোনা মহামারি মানুষকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা খারাপের/অব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।”

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে ৭০টি সরকারি হাসপাতালে ২০ হাজার ৭০০ শয্যা এবং ১৫০০ বেসরকারি হাসপাতালে ২০ হাজার শয্যা রয়েছে। সেই হিসাবে শহরে প্রতি তিন হাজার মানুষের জন্য মাত্র একটি শয্যা রয়েছে, যা কিনা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি ৫৫০ জন মানুষের জন্য একটি হাসপাতাল শয্যা থাকতে হবে। গত ১০ বছরে মুম্বাইয়ের জনসংখ্যা ব্যাপকহারে বেড়েছে। কিন্তু সেই হারে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো বাড়েনি।

কোভিড-১৯ এর জন্য সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছেন সরকারি চিকিৎসকরা। কারণ তারাই সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সামাল দিচ্ছেন। “পুরো ধাক্কাটাই আসে পঙ্গু প্রায় সরকারি খাতের ওপর। বেসরকারি খাত এতে জড়ায় না। তাদের অল্প কিছু সংখ্যক শয্যা শুধু কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের জন্য রাখা হয়েছে,” বলেন ডা. রানে।

গত সপ্তাহে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে, সব বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তাদের ৮০ভাগ সক্ষমতা কোভিড-১৯ এর রোগীদের চিকিৎসায় কাজে লাগাতে হবে, নির্ধারণ করা হবে ব্যয়ও। “শুরুর দিকে কিছুটা সঙ্কোচ ছিল। কারণ সংক্রমণের ধরণটাই আলাদা,” বলেন ডা. অভিনাশ ভন্ডে, যিনি ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহারাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ওই সংস্থাটি ইন্ডিয়ার বেসরকারি চিকিৎসকদের একটি সংগঠন।

তিনি বলেন, “এখন প্রায় তিন হাজার চিকিৎসক স্বেচ্ছায় সেবা দেয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এর জন্য আমাদের মানসম্মত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে মানসম্মত পিপিই দরকার, যা এখনো আমাদেরকে দেয়া হয়নি।” কিন্তু এসব চিকিৎসককে এখনো নিয়োগ দেয়া হয়নি এবং যার কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য এখনো কোনও স্বস্তি আসেনি।

“জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা দরকার। আমরা কোওি ধরণের ছুটি ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছি। নিজেদের কোয়ারেন্টিনে রাখার মতো সুযোগও আমরা পাই না,” একথা বলেন সিওন হাসপাতালের এক চিকিৎসক। মাঠ পর্যায়ে হাসপাতাল তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে প্রায় চার হাজারের বেশি রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব। সাথে একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দেখানো হয় যে, কোন হাসপাতালে শয্যা খালি রয়েছে। কিন্তু অনেক পরিবারের জন্যই এসব সুবিধা অনেক দেরিতে এসেছে।

মুম্বাইয়ের মিউনিসিপাল কমিশনার ইকবাল চাহাল বলেন, এই সপ্তাহে তারা একটি কর্মসূচি চালু করেছেন, যার নাম দেয়া হয়েছে “ভাইরাস শনাক্ত কর”। এর লক্ষ্য হচ্ছে- সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ট্রেস করা বা খুঁজে বের করা। “বস্তি এলাকায় আমরা এখন একজন কোভিড রোগীর সংস্পর্শে আসার পর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৫ জনকে কোয়ারেন্টিনে রেখেছি। এ পর্যন্ত মুম্বাইয়ের ৪২ লাখ মানুষের স্ক্রিনিং করেছি।”

কিন্তু আরো একটি হুমকি আসছে। বর্ষাকাল আসছে। আর সাথে করে নিয়ে আসছে ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, গ্যাস্ট্রিক সংক্রমণ আর লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগ। বর্ষাকালে জরুরি সেবা দেয়াটাও আরো কঠিন হয়ে পড়বে! সূত্র: বিবিসি।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading